বনি দে
মাঝরাতে হঠাৎ করে ঘুমের মধ্যে চেঁচিয়ে ওঠে সৌগত। একটা দুঃস্বপ্ন দেখে প্রচণ্ড ঘেমে গেছে। বালিশের পাশটা হাতড়াতে হাতড়াতে চশমাটা খুঁজে নেয়। মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি অনুভব করছে সে, এই অস্বস্তির সূত্রপাত কবে কেমন করে ঠিক বুঝে ওঠার আগেই ঘটনাটা ঘটে গেছে। ঘুম থেকে উঠেই সারা ঘরে অকারণ পায়চারি করছে। ডাক্তার বলেছিলেন এটাও এক প্রকার মানসিক রোগের লক্ষণ। ডাক্তারের পরামর্শে নিয়মিত ডিপ্রেশনের ওষুধ খাচ্ছে, অফিসের পর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে, মন খারাপ হলে একাই ঘুরে আসছে। এই তো কিছুদিন আগেই আন্দামান ট্রিপে গিয়েছিল অফিস থেকে ছুটি নিয়ে। অতীতকে মেনে নিয়েই বেশ একরকম কেটে যাচ্ছিল জীবন, অথচ হঠাৎ সব যেন এলোমেলো করে দিয়ে চলে গেল কেউ।
রান্নাঘরে গিয়ে ঢক ঢক করে এক গ্লাস জল খেল সৌগত। ঘামে ভিজে গেছে সুতির রাত পোশাক। আজকাল রাতে ভালো করে ঘুম আসে না তার, ঘুমের ওষুধ খেয়েও তাকিয়ে থাকে সিলিং ফ্যানের দিকে। কীভাবে ঘটে গেল ঘটনাটা! আর ঘটেই যখন গেল তখন কয়েক বছর আগে কেন ঘটল না! বুকের মধ্যে চাপা একটা ব্যথা অনুভব করে সৌগত। জল খেয়ে বাথরুমে গিয়ে কল খুলে ইচ্ছে মতো নিজেকে ভিজিয়ে নিল, শিরদাঁড়া দিয়ে যেন শীতল স্রোত বয়ে গেল। ভেজা চুল মুছে, জামা বদলে আবার বিছানায় আসে। আজ রবিবার, অফিস ছুটি, ফলে বেশ কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেওয়া যায়। কবে থেকে যে সে রাতে ভালো করে ঘুমোতে পারে না মনে নেই। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে তার জীবনটা কেমন যেন পাল্টে গিয়েছিল। যে বয়সে ছেলেমেয়েরা কলেজের ক্লাস বাদ দিয়ে সিনেমা দেখে, আড্ডা মেরে, খুচরো প্রেম করে নিজেদের স্বাধীনতা উপভোগ করে; ঠিক সেই সময়ে সৌগত কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে এসেই টিউশন পড়াতে যেত, কেউ কেউ বাড়িতেও আসত পড়তে। ভোগ কি বস্তু তার জানা নেই, ত্যাগের মধ্যে দিয়েই নিজের জীবনকে সাজিয়ে নিয়েছিল ওইটুকু বয়স থেকে। মায়ের একমাত্র অবলম্বন সে, সংসারে বৈভব ছিল না ঠিকই কিন্তু নিভারানি দেবীর শক্ত আটুনি সংসারের ভিত্তিকে মজবুত করে রেখেছিল।
চাকরিটাও খুব কম বয়সে পেয়েছিল সৌগত, ইচ্ছে ছিল আরও পড়াশোনা করার কিন্তু সংসারের কথা ভেবে চাকরিটা নিতে বাধ্য হয়েছিল সে। বেশ মোটা মাইনের সরকারি চাকরি, ফলে খুব বেশি দেরি করেনি জয়েন করতে। তারপরের ঘটে যাওয়া ইতিহাসকে আর মনে করতে চায় না সে, জীবনের সব অতীত সুখকর হয় না, সব অতীত থেকে মুক্তি পাওয়া সহজে সম্ভবও হয় না। বন বন করে সিলিং ফ্যানটা ঘুরছে মাথার ওপরে, ওটা দেখে কতবার যে মনে হয়েছে একটা শক্ত দড়ি বেঁধে মনের মধ্যেকার সেই পৈশাচিক ব্যাপারটাকে ঘটিয়ে ফেলার। নাহ্ এইভাবে বেশিদিন চলতে থাকলে নিজেকে বাঁচাতে পারবে না সৌগত। একটু একটু করে ভোরের আলো দরজার নীচ থেকে উঁকি দিচ্ছে। বিছানা ছেড়ে সে জানালার কাছে দাঁড়ায়, পর্দা সরিয়ে দিতেই কাঁচের জানালা ভেদ করে গায়ে এসে লাগে ভোরের নীল আলো। ঠিক ওই মেয়েটার সেদিনের নীল শাড়ির মতো। এই আর একটা নতুন অস্বস্তিতে মাস তিনেক ধরে ভুগছে সৌগত।
-কী রে বাবান, আজ এত ভোরে উঠেছিস?
মায়ের প্রশ্নে চমক ভাঙে সৌগতর। পুজোর ফুল হাতে নিয়ে উপর তলায় উঠে এসেছেন মা।
-তেমন কিছু না, ঘুম ভেঙে গেল তাই…
দায়সারাভাবে কয়েকটি শব্দ বলে গেল সৌগত, যেন নিজের কান অবধিই ঠিক করে পৌঁছল না।
-চা খাবি? একটু চা করে দেব তোকে?
মা একটু উদ্বিগ্ন হয়েই জিজ্ঞেস করলেন।
-থাক, পরে করে নেবো।
আজকাল আর খুব বেশি কথা বলতে ইচ্ছে করে না তার। কথাও যেন জীবন থেকে অবসর নিতে চাইছে।
২
ঘরের বাকি জানালাগুলো খুলে দেয় সৌগত। যে নীলাম্বরী আলো এতক্ষণ তাকে আবৃত করেছিল সেই আলো এখন সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। আলোর মতো ওই মেয়েটাও যেন ঢুকে পড়েছে ওর শোবার ঘরে, বারান্দায়, রান্নাঘরে, পুজোর ঘরে। কোন ধাতু দিয়ে তৈরি মেয়েটা! কেন জড়িয়ে পড়তে চাইছে সৌগতর অনিশ্চিত জীবনের সঙ্গে! সারা ঘরে যেন একটা কস্তুরির গন্ধ অনুভব করে সৌগত। ধীরে ধীরে আলমারির কাছে গিয়ে দাঁড়ায়, জামা-কাপড়ের মাঝখান থেকে বের করে আনে খুব যত্ন করে রাখা এক টুকরো কাগজ। এই ক’মাসের মধ্যে হাজারবার করে লেখাটা পড়েছে সে, খুব ছোট্ট করে লেখা, ‘আমি যদিও খুব খারাপ রান্না করি না, তবু ইচ্ছে না হলে খেও না।’
ব্যস এটুকুই। টিফিন ক্যারিয়ারের ভেতরেই ছিল এই এক লাইনের চিঠিটা। সেদিন থেকেই সৌগত চ্যাটার্জির জীবনটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। পুতুল পুতুল দেখতে এই মেয়েটা ঝড়ের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। তার সাদা-কালো জীবনের মধ্যে যেন একটু একটু করে আলো ঢেলে দিচ্ছিল মেয়েটা। সৌগতর জীবনে আসা এই নতুন অস্বস্তির নাম ‘তিস্তা’। কয়েক মাস আগেই জয়েন করেছিল সৌগতদের অফিসে। পরিচয় ধীরে ধীরে গড়িয়েছে সম্পর্কের গভীরতায়। সৌগত কোনওভাবেই চায়নি তার মনের ভেতরের অংশের খবর মেয়েটার কাছে পৌঁছে দিতে, অথচ কী অদ্ভুতভাবেই সে পড়ে নিয়েছিল সৌগতর মন। সেদিন দুপুরেও মেয়েটা আরেকটা কাণ্ড ঘটিয়ে বসলো, উপন্যাসের নায়িকাদের মতো নীল শাড়ি পরে হাতে একটা টিফিন বাক্স নিয়ে একেবারে সৌগতর টেবিলের সামনে এসে বলল-
-তোমার জন্য বানিয়েছি সেই সকাল থেকে, খেয়ে নিও।
কণ্ঠে দৃঢ়তা, অথচ কত মধুর। তিস্তা কথা বললেই মনে হয় কেউ যেন হৈমন্তী শুক্লার গান চালিয়ে দিয়েছে।
-কেন করেছো এসব? আমার একদম ভালো লাগে না, আর এসব করবে না।
সৌগত মুখে এতো কথা বললেও এর কোনওটাই সত্যি নয়, সে কোনওদিন নিজের জীবনে এত ভালোবাসা পায়নি। যা পেয়েছিল তার সঙ্গে এই মেয়েটাকে মেলাতে পারে না। তিস্তাকে নিয়ে অফিসের উচ্চপদস্থ কর্মচারী থেকে শুরু করে সাধারণ ক্লার্ক সহ প্রত্যেক পুরুষই মনে মনে স্বপ্ন বোনে। এসব জানতে খুব বেশি সময় লাগে না সৌগতর মতো বিচক্ষণ পুরুষের, অথচ তিস্তা সব বৈভব ছেড়ে তাকে, শুধুমাত্র তাকেই ভালোবাসে। অফিসের বস যখন আড়চোখে তিস্তার দিকে তাকায়, সৌগতর গায়ে জ্বালা ধরে যায়। কীভাবে যেন মেয়েটা একটু একটু করে ঢুকে পড়ছে তার জীবনে। মনের দরজা বন্ধ করে রেখেও নিজের সঙ্গে এই যুদ্ধটা কিছুতেই জিততে পারছে না। যেই ভালোবাসা নিয়ে সে গর্ব করতে পারতো, ভাগ্যের পরিহাসে সেই ভালোবাসার গলাটিপে মেরে ফেলা ছাড়া তার কাছে আর কোনও রাস্তা নেই। নিজের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সঙ্গে তিস্তাকে কোনওভাবেই সে জড়াতে চায় না। তিস্তা সৌগতর কাছে মুক্তির স্বাদ, আঁধারের আলো, তার প্রাণ ভ্রমরা, খরায় খরস্রোতা নদী। এমন মেয়েকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে, সংসার পাততে ইচ্ছে করে। কিন্তু অতীত থেকে সে পালিয়ে যাবে কোথায়! তার অতীত যদি তিস্তা জানতে পারে তবে কী করবে মেয়েটা! নিশ্চয়ই তাকে ছেড়ে চলে যাবে, যাবে যাক, এতে ওরই মঙ্গল হবে। এসব ভাবতে ভাবতে সৌগতর অস্বস্তিটা আরও বাড়তে থাকে। নাহ আর নয় এইবার মেয়েটাকে সব কিছু বলে দিতেই হবে। ঘড়িতে সকাল আটটা, এখন তবে একটা ফোন করা যেতে পারে। হাতে ফোনটা নেওয়া মাত্রই তিস্তার নামটা ভেসে উঠল স্ক্রিনে। মেয়েটা ইদানীং আরেকটা কাণ্ড ঘটাতে শুরু করেছে, রোজ সকালে সৌগতকে ঘুম থেকে ডেকে দেওয়া ওর নতুন অভ্যাস। নাহ আর মেঘ রৌদ্রের খেলা নয়, এবার নিজের জীবনের কালো অতীতটার সম্পর্কে ওকে জানাতেই হবে।
-হ্যালো…
শুনছো?
উঠেছো ঘুম থেকে? তোমার তো শরীর খারাপ ছিল, আজ তো রবিবার, আরেকটু ঘুমিয়ে নাও বুঝলে।
ঝড়ের গতিতে কথাগুলো বলে গেল তিস্তা।
-আজ একবার দেখা করবে?
সৌগত গম্ভীর গলায় বলল।
-সে কি! ভূতের মুখে রাম নাম! তুমি আমার সঙ্গে নিজে থেকে দেখা করতে চাইছ! ব্যাপারটা কী বলো তো?
তিস্তার গলায় আশ্চর্যের সুর।
-হ্যাঁ, সন্ধে ছ’টায় বসন্ত কেবিনে এসো।
বলেই টুক করে ফোনটা কেটে দিল সৌগত। তিস্তা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, সেসব শোনার প্রয়োজন অনুভব করেনি সে। নিজের মনকে শক্ত আটুনিতে বাঁধতে চেষ্টা করে সৌগত। আকাশে এখন ঝলমলে রোদ। ফোনটা কেটে দিয়ে একটা ঘোরের মধ্যে ডুবতে থাকে সৌগত। সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায় ছাদে। বাড়ির বড় রাস্তার সামনে তীব্র গতিতে চলা বাস, হু-হু বইতে থাকা হাওয়া, রোদের তাপ, হট্টিটি পাখির পালকের মতো কোমল নীল আকাশ কোনওটাই তার মনকে স্পর্শ করে না। ছাদের এক কোণে টবের ওপর লাগানো সাদা নয়নতারা গাছটার কাছে এসে দাঁড়ায় সৌগত।
অফিসের কাজে তিস্তা একবার এসেছিল তাদের বাড়িতে, তখন সৌগতর সঙ্গে ছাদে এসেছিল এই ছাদ বাগান দেখতে। খুব দামি গাছ নয়, সাধারণ দেশি ফুলের আড়ম্বরই বেশি। বাবা চলে যাওয়ার পর মায়ের সময় কাটে ছাদ বাগান, ঠাকুর ঘর এসব নিয়েই। হাই সুগার, ব্লাড প্রেসারে আক্রান্ত হয়ে বেশিরভাগ সময় নিজের ঘরেই কাটান। বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন করেছেন সৌগতর জীবনের সেই বিপর্যয়ের পর, এখন ঘরই তার জগৎ। সারাজীবন মাথা উঁচু করে বেঁচেছেন নিভারানি দেবী, তাই সমাজের কানাঘুষো সব বানানো কথা তার বুকে তীরের মতো আঘাত করে। একমাত্র ছেলের জীবনের এই অতীতকে মুছে ফেলবেন এমন সাধ্য তার আঁচলে নেই, তাই দিন রাত ছেলের জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেন। আকাশের দিকে তাকায় সৌগত। আটত্রিশ বছর বয়সেই চূড়ান্ত অবসাদের রোগী, জীবনের সবকিছুতেই সম্পূর্ণ নিস্পৃহ হেরে যাওয়া এক পুরুষ। আকাশ নয়, এই মুহূর্তে সাদা নয়নতারা ফুলগুলো তাকে যেন একটু শান্তি দিচ্ছে। তিস্তার লম্বা, কোঁকড়ানো চুলের জন্য ওর কান দুটো সবসময় দেখা যায় না। সেদিন ছাদ বাগানে এসে একটা নয়নতারা ফুল ছিঁড়ে লাগিয়েছিল কানের পাশে। হাওয়ায় শাড়ির আঁচল দুলিয়ে সৌগতর খুব কাছে এসে জিজ্ঞেস করেছিল তিস্তা,
-এই দেখো তো, ভালো লাগছে?
-ইস্, যক্ষিণীর মতো লাগছে, এবার কি রক্ত চুষে খাবে নাকি!
-খেতেও পারি।
বলেই চোখ নাচিয়ে দুই ভুরু দুলিয়ে হেসে গড়িয়ে পড়ে তিস্তা।
সত্যিই মেয়েটা হাসতেও পারে সারাদিন, ওর ওই হাসিমুখ দেখলে সৌগতর আরও বেশি অস্বস্তি হয়। আজ রেস্তোরাঁয় তিস্তার সামনে যখন সব অতীতের পাতা মেলে ধরবে তখন কী ভাববে তাকে মেয়েটা! নিশ্চয়ই ছেড়ে চলে যাবে সারা জীবনের মতো, আর কোনওদিন সৌগতর সামনে এসে দাঁড়াবে না। চলে গেলেও যাবে, কিন্তু সত্যিটা আজ জানাতেই হবে তিস্তাকে।
৩
সময়ের চেয়ে দশ মিনিট আগেই রেস্তোরাঁয় পৌঁছে গেছে সৌগত। মনের মধ্যে ছক কষছে কীভাবে সব কথা বলবে তিস্তাকে, এতগুলো মাস কেটে গেছে কিন্তু যখনই সবটা বলবার কথা ভেবেছে, তখনই তিস্তাকে হারিয়ে ফেলার ভয় তীব্র যন্ত্রণা দিয়েছে ওকে। তিস্তার চোখে সে বারবার নিজের জন্য শুধু ভালোবাসা দেখেছে, কিন্তু এভাবে আর নয়, আজ ওকে বলতেই হবে। কিন্তু কেমন করে বলবে জীবনের সবচেয়ে অপ্রিয় সত্যিগুলো! বছর তিনেক আগে নবনীতার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল সৌগতর। দুই পরিবারের সম্মতিতে সামাজিকভাবে বিয়ে, কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পরই বুঝতে পারে নবনীতার জীবনের গাঁটছড়া কোনওদিন গাঁথা হয়নি সৌগতর সঙ্গে। এমন উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করা সম্ভব হয়নি সৌগতর। বর্তমানে স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্সের মামলা চলছে কোর্টে, স্ত্রীর নিষেধে একমাত্র সন্তানের মুখ পর্যন্ত দেখতে যেতে পারে না সে। বাবা মারা যাবার পর খুব কেঁদেছিল সৌগত, নিজে যখন পিতৃত্বের স্বাদ পেলো তখন ভেবেছিল মেয়েকে নিয়ে আবারও নতুন করে বাঁচবে। সব পুরোনো দাগ ভুলে গিয়ে শুধুমাত্র মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আবারও সংসার করবে। ভালোবেসে মেয়ের নাম রেখেছিল ‘তন্নিষ্ঠা’, তার আদরের তনু। নিজের জন্য নয়, এবার বাঁচবে সন্তানের জন্য, অথচ মেয়ে বড় হয়ে উঠছে নিজের বাবাকে ছাড়াই। সুখের সংসারের বদলে তার জীবনে এসেছে মানসিক অবসাদ, ওষুধ, ডাক্তার, প্রেসক্রিপশন, অপযশ, গ্লানি আর দহন। সৌগত ভালোবেসে যা কিছু আঁকড়ে ধরেছে সবটাই যেন তার হাত থেকে কেউ ছিনিয়ে নিয়ে গেছে, তাই ভালোবাসায় ওর এত ভয়। তাছাড়া ডিভোর্সের কেস কতদিন চলবে জানা নেই, ফলে তিস্তার মতো মেয়েকে কোনওভাবেই সে নিজের অনিশ্চিত জীবনের সঙ্গে জড়াতে চায় না। চোয়াল শক্ত করে সৌগত, যেভাবেই হোক নিজের কক্ষপথ থেকে ছিটকে দূরে সরিয়ে দিতে হবে তিস্তাকে। জীবনের এই ভাঙনের পথে কেমন করে যেন পুতুলের মতো নরম মনের এই মেয়েটি তার হৃদয়ে অবচেতনে জায়গা করে নিল। এখন কীভাবে বলবে এত সব কথা তিস্তাকে! সময় হয়ে গেছে, মনে মনে সব কথা গুছিয়ে নেয় সৌগত।
-অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করেছিলে না?
যেন একটা ঝড় ঢুকে এল ছোট্ট কেবিনটায়। খোলা চুলে, লাল শাড়ি পরে, কপালে লাল টিপ আর চোখে সামান্য কাজল পরে যেই মেয়েটা ওর সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে, তাকে এই মুহূর্তে সবচেয়ে দামি মনে হচ্ছে সৌগতর। নিজের স্ত্রীর মধ্যে যা যা দেখতে চেয়েছিল, সবটাই যেন এই মেয়েটা নিজের আঁচলে নিয়ে ঘোরে। তিস্তার চোখের দিকে তাকাতে পারে না সৌগত, যেই চোখে মায়া থাকে সেই চোখের দিকে সহজে তাকানো যায় না। নাহ এবার সবটা বলবে সৌগত… সবটা…।
বাইরের আকাশটা ধূসর হতে হতে কালো হয়ে যায়, আজ আকাশে কোনও তারা নেই। গড়গড় করে সব কথাগুলো বলে ফেলে সৌগত। তিস্তা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে থাকে দূরের আকাশে। বাইরের বিরাট অন্ধকার যেন ওদের দুজনের মনের মধ্যেই নেমে এসেছে। আকাশে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সৌগত অনুভব করে তার চোখের পাতা ভিজে ঝাপসা হয়ে আসছে দৃষ্টি, পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে হৃৎপিণ্ড। তিস্তার মুখে আজ হাসি নেই, মুখে কোনও কথা নেই, একটু পর পর আঙুলে জড়িয়ে নিচ্ছে নিজের ঢেউ খেলানো চুলগুলোকে। তারপর দীর্ঘ নীরবতা কাটিয়ে সৌগতর ডান হাতটা নিজের দু-হাতের মধ্যে জোরে চেপে ধরে, তিস্তা বলে-
-বৃষ্টিটা ধরেছে, এবার আমায় ফিরতে হবে।
-ভালো থেকো তিস্তা।
বলতে গিয়ে গলাটা ধরে আসে সৌগতর।
তিস্তা টেবিল ছেড়ে উঠে গেলেও, সৌগত যেন এখনও উঠতে পারছে না। বুকের ভেতরে সব যেন কেমন ভেঙে দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে।
-স্যর আপনার জন্য একটা চিঠি দিয়ে গেছে একজন।
রেস্তোরাঁর বেয়ারার হাতে লাল রঙের একটা খাম।
-কে?
অবাক হয়ে প্রশ্ন করে সৌগত।
-লাল শাড়ি পরে যিনি এতক্ষণ এখানে বসে ছিলেন, উনি আপনাকে চিঠিটা দিতে বলে গেলেন।
বেয়ারা ছেলেটি উত্তর দেয়।
বেয়ারার হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে টেবিলের সামনে মেলে ধরে সৌগত, চিঠিতে লেখা
-এখনও ভালোবাসি।
সঙ্গে রয়েছে একটি কবিতা-
‘ভালোবেসে সুখ,
ভালোবেসে শোক,
যাই দাও ;
মুঠোয় ভরে নেবো তোমার সব দান।
আমার চোখে যতটুকু তুমি
আমার ভক্তিতে ততটুকু ঈশ্বর।
-ইতি, তোমার যক্ষিণী’
কাগজটা মুড়ে বুক পকেটে ভরে নিল সৌগত। প্রতিদিনের রাতের অন্ধকার আকাশটাকে তার নতুন মনে হচ্ছে। অতীতের আবরণ খসে পড়ছে, গুটি থেকে প্রজাপতির মতো জন্ম নিচ্ছে এক নতুন সৌগত চ্যাটার্জি। এই রাতের আকাশেও সে অনুভব করে নরম নীল আলো, ঠিক যেন তিস্তার শাড়ির আঁচলের মতো। ঢেউ খেলানো চুল আর গাঢ় বাদামি চোখের মেয়েটাকে বুক পকেটে রেখে সৌগত এগিয়ে যায় বাড়ির পথে।
The publish গাঁটছড়া appeared first on Uttarbanga Sambad.
