সেই সুনীল সময়

শিক্ষা
Spread the love


সুধাভ্রমে বিষ খাই, বিষ এত মিষ্টি বুঝি?

টিপলু বসু

জীবনের সঙ্গে যার গোপনীয় সুড়ঙ্গলালিত সম্পূর্ণ সম্বন্ধ; সম্বন্ধের ধূসরতা ও নতুনতা, তাই কবিতা। গ্রিসদেশে কবিতার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে একটি গল্প আছে। এক ভাস্কর এক অপূর্ব নারীমূর্তি দীর্ঘসময় ধরে গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর দাবি, কবিতা নয়, ভাস্কর্যই শ্রেষ্ঠ শিল্প। পাথরের প্রতিটি দানা কেটে অবশেষে সত্যিই যখন মূর্তিটি সম্পূর্ণ হল, ভাস্কর নিজের শিল্পে নিজেই মুগ্ধ হয়ে বললেন ‘আহা কবিতা!’ এই যে অসাধারণ সব শিল্পমুহূর্তের সামনে দাঁড়িয়ে কবিতার মতো মনে হওয়া, প্রমাণ করে আমাদের অনুভূতির সর্বোচ্চ প্রকাশকে আমরা কবিতার সঙ্গে তুলনা করেই সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই।

যিনি নিজেকে গদ্যকার, ঔপন্যাসিক বা সম্পাদক কোনও পরিচয়ে পরিচিতির অপেক্ষা নিজের ‘কবি’ পরিচয়কে সর্বোপরি রাখতে চান, সেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লেখেন,

‘শুধু কবিতার জন্য এই জন্ম,

শুধু কবিতার জন্য আরও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে লোভ হয়।

মানুষের মতো ক্ষোভময় বেঁচে থাকা,

শুধু কবিতার জন্য আমি অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছি।’

কবিতার প্রতি এই অসামান্য ভালোবাসায় কবি সুনীল হয়ে উঠেছেন একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, সংশয়, প্রেম, বিদ্রোহ এবং একাকিত্বের ভাষা। কবিতার সুনীল একাধারে প্রেমিক, নাগরিক, স্বপ্নদ্রষ্টা, বিদ্রোহী এবং গভীরভাবে আহত আধুনিক এক মানুষ। তাই সুনীল শুধু ‘প্রেমের কবি’ বা ‘কৃত্তিবাস প্রজন্মের কবি’ নন, তাঁর কাব্যিক বিস্তৃতি তাঁর কবিতার অন্তরে নিহিত রয়েছে।

সুনীলের প্রথম কবিতা ‘একটি চিঠি’ ১৯৫১ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তখন তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’ বন্ধু সমীর রায়চৌধুরীর প্রকাশনা ছিল। কাব্যগ্রন্থটির সম্পর্কে সুনীলের বক্তব্য, ‘অত্যন্ত কাঁচা লেখা, না বের হলেই ভালো হত।’ তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে ‘আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি’, ‘হঠাৎ নীরার জন্য’, ‘রাত্রির রঁদেভু’, ‘স্মৃতির শহর’, ‘যুগলবন্দী’ (শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে), ‘সোনার মুকুট থেকে’, ‘সোনালি দুঃখ’ ইত্যাদি আরও কিছু।

সুনীলের কবিতাগুলির মধ্যে এক নাগরিক কণ্ঠস্বর অনুরণিত। তাঁর ভাষা অলংকারের ভারে নত নয়। কথ্য অথচ কাব্যময় এক স্বাভাবিক ভাষার তিনি জন্মদাতা, যা কখনও অন্তরঙ্গ, কখনও দুঃসাহসী। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে মানবিক অভিজ্ঞতায় পর্যবসিত করেছে তাঁর কবিতাগুলি। প্রেম, শরীর, যৌবন, স্মৃতি, ব্যর্থতা, রাজনীতি, শহর, নিঃসঙ্গতা সবকিছুই তাঁর কাব্যের অন্তর্গত। ভাষার এই সহজ কাব্যময়তা এবং কবিতায় বহির্জগৎ ও অন্তর্জগতের মেলবন্ধন তৎকালীন তরুণ প্রজন্মকে কবিতা লিখতে প্রাণিত করেছে। কবিদের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পাঠকের সংখ্যাও হয়তো বৃদ্ধি পেয়েছে।

এভাবেই ১৯৫০-এর দশকের বাংলা কবিতায় একটি নতুন প্রজন্মের আবির্ভাব ঘটে, সুনীল ছিলেন সেই পরিবর্তনের প্রধান মুখ। ‘কৃত্তিবাস’ শুরুর কথা প্রসঙ্গে সুনীল বলেন, ‘আমরা কয়েকজন বন্ধু ঠিক করেছিলাম, এমনভাবে কবিতা লেখার চেষ্টা করতে হবে, যা পূর্ববর্তী কবিদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর হবে… কথ্য ভাষাই আমাদের কবিতায় ব্যবহৃত হবে। সচরাচর সাধারণ মানুষ যে সমস্ত শব্দ পথে-ঘাটে ব্যবহার করে সেগুলো আমরা চয়ন করে ব্যবহার করব। কবিতার প্রয়োজনে কোনও শব্দই অপবিত্র নয়। আমাদের কবিতা স্বীকারোক্তিমূলক।’ ‘কৃত্তিবাস’কে ঘিরে এক তরুণ কবিগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল।

সুনীলের কবিতার প্রধান স্বর ‘প্রেম’। সেই প্রেমে ওতপ্রোত রয়েছে শরীর, আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি, বিচ্ছেদ, অপরাধবোধ, অনিশ্চয়তা এবং না পাওয়ার যন্ত্রণা। তাঁর ‘ভালোবাসার কোনও জন্ম হয় না/ মৃত্যু হয় না’। ভালোবাসা তাঁর ‘জন্মকবচ’। সেই ভালোবাসাকে ভালোবেসে তিনি এক অসামান্য ভয়হীন রোমান্টিকতার জন্ম দেন। তাঁর কবিতার প্রতিটি ‘অপূর্ব নির্মাণ থেকে উঠে আসে ভোরের কোকিল।’

সুনীল জীবনে প্রথম যে নারীর মুখ চুম্বন করেন সে রক্তমাংসের নারী নয়, অথচ পরিপূর্ণ নারী। সুনীলের ভাষায়, ‘সরস্বতীর মূর্তির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার একসময় রোমাঞ্চ হয়। কী অপূর্ব গড়ন। নিখুঁত কোমরের খাঁজ, মসৃণ উরু, সুমেরু পর্বতের চূড়ার মতো দুই বক্ষ… মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে যাই এবং সেই বরবর্ণিনীর কুচযুগে আমার হাত রাখি। যেন একটা বিদ্যুতের তরঙ্গ টের পাই। এখানে কেউ নেই, কেউ দেখবে না, আমি সেই বিম্বাধরে চুম্বন করি। আমি সেই মূর্তির প্রেমে পড়ে যাই,… দু’দিন পর প্রতিমা বিসর্জনের সময় আমার চোখে জল এসেছিল।’

তাঁর অন্বেষণ শুরু হয় প্রিয় নারীর জন্য। তাঁর কবিতায় ‘নীরা’র উন্মেষ ঘটে। ‘হঠাৎ নীরার জন্য’ তাঁর স্বপ্নের জাল বোনা শুরু হয়,

‘বাসস্টপে দেখা হল তিন মিনিট অথচ তোমায় কাল

স্বপ্নে বহুক্ষণ….’

নীরা কবির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, তাঁর অধরা প্রেম ও রহস্যময় সৌন্দর্যের প্রতিমা। তিনি জানেন, ‘নীরার অসুখ হলে কলকাতায় সবাই বড় দুঃখে থাকে।’ নীরার প্রতি ভালোবাসায় তিনি অঙ্গীকারবদ্ধ,

‘এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ আমি কি এ হাতে

কোনও পাপ করতে পারি।’

কবিতা তাঁর ও নীরার মধ্যে মিলনের মাধ্যম,

‘এই কবিতার জন্য আর কেউ নেই শুধু তুমি নীরা।’

নীরাকে হারাতে তিনি ভয় পান। ‘নীরা হারিয়ে যেয়ো না’ তাঁর এক দীর্ঘ কবিতা। কবি অমিত চৌধুরী কবিতাটির পাঠপ্রতিক্রিয়াতে জানিয়েছেন, এটি তাঁর একটি দীর্ঘ চলচ্চিত্রের মতো মনে হয়েছে যেখানে প্রেম, যৌনতা, জনজীবন ও ষাট-সত্তরের দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা একসঙ্গে মিশে আছে। এভাবে নীরা প্রেমিকা থেকে একটি সময়ের চরিত্র হয়ে উঠেছে। নীরা চিরযৌবনা এক মানবী, যাকে কবি রক্তমাংসের মানবী করেই রাখতে চান, তবু হঠাৎ হঠাৎ সে শিল্প হয়ে ওঠে। নীরা ‘অমৃত খুকি’, যাকে নিয়ে কবির চিরন্তন যাত্রা।

সুনীলের কবিতায় ‘আমি’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই আমি আত্মম্ভরিতা নয়, আত্মসমালোচনা মাত্র। তাঁর দুর্বলতা ও অপরাধবোধ, কামনা ও ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি। কবির জীবনে ‘কেউ কথা রাখেনি’। এই ব্যক্তিগত আক্ষেপ শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পথে মানুষের বিশ্বাস হারানোর বেদনা।

সুনীল দু-একটি কবিতায় পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন। ‘জ্বলন্ত জিরাফ’, ‘পাপ ও দুঃখের কথা ছাড়া কিছুই থাকে না’ ইত্যাদি। আধুনিক কবিতার দুর্বোধ্যতাকে কৌতুক করে তিনি লেখেন, ‘বিলিবিলি খাণ্ডাগুলু বুম্ চাক ডাবাং ডুলু/ হুড়মুড় তা ধিন্‌না উসুখুসু সাকিনা খিনা/ মহারাজ মনে পড়ে না?’ মানবিক বোধের কবিতা তিনি লিখেছেন, মানবতার অবমাননা তাঁকে অস্থির করেছে। কবির কথায়, ‘আজীবন আমি প্রেমের কবিতা লিখতেই বেশি ভালোবাসি।’

সুনীল প্রজন্মের কবিদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্ব, প্রতিযোগিতা, মতভেদ এবং সাহিত্যিক সহাবস্থানের। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত প্রমুখ আরও অনেকে এবং আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে অনুবাদকের কাজ করার সময় সুনীল বিদেশি কবিদেরও কাছাকাছি এসেছিলেন। অ্যালেন গিন্সবার্গ তাঁর বন্ধুপ্রতিম ছিলেন। শুধুমাত্র বাংলায় কবিতা লিখবেন বলে তিনি দেশে ফিরে এসেছিলেন।

সুনীলকে অনেক সমালোচনাও সহ্য করতে হয়েছে। নারীবাদীরা বলেন, তাঁর নীরা পুরুষতান্ত্রিকতার ফসল। সে স্বাধীন নারী নয়। সে অর্ধেক মানবী, অর্ধেক কল্পনা। তাঁকে অশ্লীল কবিও বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত কবিরা বলেছেন, তিনি ছন্দকে ভেঙে ফেলেছেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলতেন, সুনীল অকবিদেরও পত্রিকায় স্থান দিয়ে বাংলা কবিতার সর্বনাশ করছেন। সুনীল অবলীলায় এসব সমালোচনা অতিক্রম করেছেন। তিনি বেঁচে থাকার জন্য গদ্য লিখেছেন।

সাংস্কৃতিক অগ্রগতিতে কবিদের ভূমিকাকে সুনীল প্রাধান্য দেন। কারণ তিনি মনে করেন কবিরা কেবলমাত্র স্রষ্টা নন, তাঁরা ভবিষ্যৎদ্রষ্টাও। কিন্তু কবিতা লেখা ছেলেখেলা নয়, কবিতা লিখতে গেলে ২৪ ঘণ্টা কবি হতে হবে… ওই কবিতা নিয়েই থাকতে হবে। কবিতা কীভাবে রচিত হবে সেখানে কবির স্বাধীনতাই সর্বোচ্চ। ভাষার প্রতি সচেতন থাকতে হবে। প্রচুর পড়তে হবে।

তিনি লিখেছেন, ‘মেষপালকের গানে এ পৃথিবী/ বহুদিন ঋণী’, আদিযুগে মেষপালকরা যে গান গাইত তার থেকেই তো কবিতার জন্ম। তাই ঐতিহ্যকে জানতে হবে। তাঁর মতে, কবিরা কখনও খারাপ মানুষ হতে পারেন না, কবিমাত্রেই দুঃখী। দুঃখ মানে অতৃপ্তি। কবি কখনও কোনওকিছুর মধ্যেই তৃপ্ত হতে পারে না। সকল কবিরই আলাদা একটা নিজস্ব জগৎ আছে।

সবশেষে কবিজীবনের অনন্ত আনন্দ ও যন্ত্রণা, অসমাপ্ত আত্মকথা নির্মাণ করেন সুনীল,

‘সুধাভ্রমে বিষ খাই,

বিষ এত মিষ্টি বুঝি?

তবে যে সকলে বলে লোনা?

আমাকে মৃত্যুর হাতে ফেলে ওরা চলে যায়, বারবার

ওরা মানে কারা?

কই, কেউ তো ছিল না!’

 

সংবাদের নিতলছায়ায়

মধুময় পাল

মালকানগিরির পুলিমেটলা থেকে মাঝে মাঝে ফোন করতেন নির্মলকান্তি ঢালি৷ বলতেন, দাদা, আমাদের বাংলা থেকে খেদিয়ে দিলেন৷ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি থেকেও তাড়ালেন৷ আমাদের সন্তানরা আর বাংলা বলে না৷ আমরা আর বাঙালি থাকতে পারলাম না৷ শুধু বাংলার বাইরে নয়, বাঙালির বাইরে আমাদের সদগতি হল৷

শুনে যেতাম৷ নির্মলকান্তিকে বলবার কিছু ছিল না৷

দাদা, আমরা পূর্ববঙ্গ থেকে তাড়া খেয়েছি৷ ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া দেশ পাকিস্তানে ছিলাম সংখ্যালঘু৷ সেখানে আমাদের কথা শোনার লোক কম ছিল৷ স্বাধীন সার্বভৌম ধর্মনিরপেক্ষ হিন্দুস্থানে কেন আমাদের উচ্ছেদ করা হল, সে প্রশ্ন করতে পারলাম কই? কীভাবে উচ্ছেদ করা হল সে কথা বলতে পারলাম কই? এখানেও কি চাপা দ্বিজাতিতত্ত্ব নেই? নেই ছোটলোকদের প্রতি উপেক্ষা? দাদা, শুনেছিলাম গণশুনানি হবে, আমাদের যন্ত্রণার কথাগুলো জনসমক্ষে বলতে পারব৷ গণশুনানি কেন হল না? আমাদের কথা কি বাংলার মানুষ শুনতে চায় না? বাংলায় আর ভিটে চাই না, অনুদান চাই না, ত্রাণ চাই না৷ শুধু নিজেদের কথাগুলো বাংলার মানুষকে শোনাবার একটা সুযোগ চাই৷

চুপ করে থাকি৷

একদিন নির্মলকান্তি চুপ করে গেলেন৷ তারপর চুপ চিরতরে৷

মানুষ আর কই, সবই রাজনীতি, নির্মলদা!

নির্মলকান্তি ঢালি খুলনার দেশভিখারি৷ ১৯৬৯-এ পরিবারের সঙ্গে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন৷ তখন স্কুলের ছাত্র৷ ১৯৭৮-এ দণ্ডকারণ্য-প্রত্যাগত উদ্বাস্তুরা সুন্দরবনের মরিচঝাঁপিতে নিজেদের শ্রমে ও সাধনায় যে ‘নেতাজিনগর বিদ্যাপীঠ’ গড়ে তুলেছিলেন, তিনি তার প্রধান শিক্ষক৷ সেই স্কুলে পড়াতেন রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল, ভবনাথ মণ্ডল, কণিকা বিশ্বাস, গোবিন্দলাল মিস্ত্রি, পারুল দে, স্নেহলতা মল্লিক, সুকুমার পাল প্রমুখ ১৩ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা৷ এঁরা কেউ উচ্চশিক্ষিত নন, পড়ানোর অভিজ্ঞতাও ছিল না৷ সুন্দরবনের মাটিতে নিজেদের বাসস্থান গড়ে তোলবার সাধনায় ব্রতী তাঁরা বুঝেছিলেন, শিক্ষা ছাড়া বাসস্থান হয় না৷ নির্মলকান্তিকে সেই দায়িত্ব দিয়েছিলেন উদ্বাস্তু নেতারা৷

উচ্ছেদ-অভিযানের শুরুতেই সেই স্কুল, জঙ্গলের মাটি-কাঠ-পাতা এবং দেশভিখারিদের শ্রম ও স্বপ্ন দিয়ে তৈরি লেখাপড়ার ঘরগুলি জ্বালিয়ে দেয় সরকারি আধিকারিক তথা পুলিশের ‘উপাচার্য’রা৷ ছোটলোকের আবার শিক্ষা লাগে কীসে!

‘মানুষের বসবাসের পক্ষে সম্পূর্ণ উপযোগী নয়’, এই কাদামাটির দেশ সুন্দরবনের মরিচঝাঁপি দ্বীপে একাধিকবার গিয়েছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়৷ একবার বর্ষায় উত্তাল রায়মঙ্গল ডিঙিতে পেরিয়ে৷ ডিঙিতে কেন? মরিচঝাঁপিতে অলিখিত অবরোধ জারি করেছে প্রশাসন৷ দ্বীপে ঢোকা ও বেরোনো নিষিদ্ধ, উদ্বাস্তুদের জন্য তো বটেই, সাংবাদিক, বিরোধীপক্ষের রাজনীতিবিদ, এমনকি শুভানুধ্যায়ীদের জন্যও৷ পানীয় জল আনতে যাওয়াও নিষিদ্ধ, পুলিশ তুলে নিয়ে যায় বধূদের, মেয়েদের৷ এইরকম জবরদস্ত নিষেধাজ্ঞা ভেঙে দ্বীপের মাটিতে পা রেখেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়৷ তাঁর দেখা, অভিজ্ঞতা এবং বিনম্র পরামর্শ চিঠির আকারে প্রকাশিত হয় আনন্দবাজার পত্রিকার ‘সম্পাদক সমীপেষু’ বিভাগে, ১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৮৷ কেন নয় প্রতিবেদন? শাসকের বারণ ছিল৷ রায়মঙ্গলের বুকে নৌযুদ্ধ দেখেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় : ‘একদিকে পুলিশবাহিনী যাঁদের কারুরই উচ্চতা পাঁচ ফুট ন-ইঞ্চির কম নয় এবং তাঁরা প্রত্যেকেই স্বাস্থ্যবান বলে ধরে নেওয়া যায়, আর অন্যদিকে অনাহার বা স্বল্পাহারে দুর্বল, খালি গা বাঙালি উদ্বাস্তুরা৷ পুলিশপক্ষ ছিলেন মোটরলঞ্চে আর উদ্বাস্তুরা নিজেদের তৈরি করা নৌকোয়৷’

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘মরিচঝাঁপিতে গিয়ে আমি অবাক৷ আমার ধারণা ছিল বাঙালি উদ্বাস্তুরা অলস, কোনও কাজ করতে চায় না৷ কিন্তু মরিচঝাঁপি দ্বীপ অঞ্চলে জঙ্গল, জলকাদার মধ্যে বুড়োবুড়ি থেকে শিশুরা পর্যন্ত খাটাখাটনি করছে দারুণভাবে৷ খাটছে প্রাণের দায়ে৷ তারা খাটলে খেতে পাবে, নইলে পাবে না৷ তারা সরকারি কোনও সাহায্য পায় না, চায়ও না৷’ এই লেখা নিছক সংবাদ বা প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ থাকে না, তিনি প্রশ্ন করেন, দণ্ডকারণ্য থেকে কেন চলে আসে উদ্বাস্তুরা, যারা একবার ভিটেমাটি ছেড়েছে, দেশ ছেড়েছে, আবার কেন তারা অনিশ্চয়ের পথে হাঁটে, উদ্বাস্তুদের ওখানে থাকতে দিলে ক্ষতি কী? তিনি পরামর্শ দেন, ‘বাঙালি উদ্বাস্তুদের পশ্চিমবঙ্গে স্থান দিতে পারলে বামফ্রন্ট সরকার যথার্থ ভালো কাজ করবেন৷… আমি নিজে পূর্ববঙ্গের লোক বলেই বাঙালি উদ্বাস্তুদের জন্য কষ্ট বোধ করি এবং একথা স্বীকার করতে আমার কোনও লজ্জাবোধ নেই৷’

সংবাদের তথ্য, বিবরণ, পরিসংখ্যান ইত্যাদির গভীরে স্তরান্বিত হয়ে থাকে যে নিতলছায়া, সুনীলের লেখা তার স্পর্শ পায়৷ এই লেখাটির শিরোনাম ‘মরিচঝাঁপি সম্পর্কে জরুরি কথা৷’ আরেকটি প্রতিবেদন আছে, ‘মুখ্যমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ’, প্রকাশিত হয় ২৯ মে, ১৯৭৯৷ সুনীল প্রশ্ন করছেন, ‘এঁদের (বাঙালি উদ্বাস্তুদের) ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনও মূল্য না দিয়ে জোরজবরদস্তি করে, এঁদের খাদ্য-পানীয় সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে কোনওক্রমে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া কি আইন, নীতি কিংবা বিবেকসম্মত?’ আনন্দবাজার ছাপতে পারেনি এ লেখা, ‘মরিচঝাঁপি বুলেটিন’ হয়ে বেরিয়েছিল৷ ততদিনে উৎখাত ‘সুসম্পন্ন’৷ নির্মলকান্তি ঢালির উচ্চারণগুলি ধরা আছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ৩৫ বছর আগেকার সংবাদধর্মী লেখায়৷

দুই

শান্তিবনে ইন্দিরা গান্ধির অন্ত্যেষ্টি৷ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কভার করতে গিয়েছেন৷ ভিআইপিদের পাশেই বসার ঠাঁই হয়েছে৷ এসেছেন দীর্ঘদেহী অধ্যাপক গলব্রেথ, মার্গারেট থ্যাচার, কেনেথ কাউন্ডা, জিয়াউল হক, জেনারেল এরশাদ, ইয়াসের আরাফাত, শেখ হাসিনা, কামাল হোসেন প্রমুখ৷ আছেন বিভিন্ন রাজ্যের হোমরাচোমরা মন্ত্রীরা৷ সুনীল এঁদের চেনেন না৷ ‘তবে মাঝে মাঝে একজন আরেকজনের নাম ধরে ডাকছেন, তখন বুঝতে পারছি যে এইসব নাম খবরের কাগজে পড়ি৷ কেউ বিধানসভায় চেয়ার ভাঙেন, কেউ বিরুদ্ধপক্ষের দিকে চটি ছুড়ে মারেন৷’

সুনীল তাকিয়ে থাকেন চিতাবেদির দিকে৷ দেখেন, ‘কালো পাড় দেওয়া সাদা শাড়ি পরে আছেন সোনিয়া গান্ধি৷ তিনি আঁচলে মুখ মুছছেন মাঝে মাঝে৷ তাঁদের (রাজীব-সোনিয়ার) পুত্র রাহুল বিহ্বলভাবে ঘুরছে এদিকে-ওদিকে৷ সদ্য কিশোর সে৷ এই বয়সে রাজনীতি, ক্ষমতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা মনে স্থান পায় না৷ এটা স্বপ্ন দেখার বয়স৷ এটাই গভীর দুঃখ পাওয়ার বয়স৷ ছোট্ট মেয়ে প্রিয়াঙ্কা মায়ের পাশ ছাড়ছে না৷ একসময় তার হাত ধরল আর একটি বাচ্চা ছেলে৷ ওই ছেলেটি কে? আমার পাশের ব্যক্তিটি জানিয়ে দিলেন ও হচ্ছে প্রিয়াঙ্কার কাকার ছেলে বরুণ৷ ইন্দিরা গান্ধির গৃহত্যাগিনী দ্বিতীয় পুত্রবধূ মেনকাকে দেখতে পেলুম না৷’ জঙ্গি চক্রান্তে নিহত জাতীয় তথা আন্তর্জাতিক মাত্রার নেত্রীর শেষকৃত্যের রাজকীয় আবহে এসে পড়ে পারিবারিক শোকচ্ছবি৷ এই ছবিটি সব সমারোহের ঊর্ধ্বে উঠে সাদা-কালো আলেখ্যের মতো চিরকালীন হয়ে থাকে৷ একজন ঘরোয়া মানুষের দেখা ও লেখা এ প্রতিবেদন৷

ইন্দিরা গান্ধির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এবং অবিভাজ্যভাবে যুক্ত হয়ে আছে শিখদাঙ্গা৷ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সেই দাঙ্গার চেহারা দেখেছেন৷ হিংসার প্রলয়নৃত্য৷ এই দাঙ্গার মূলে ছিল একটি গুজব৷ তীক্ষ্ণধী সাংবাদিকের মতো তিনি সেই গুজব খণ্ডন করেন৷ তিনটি বাক্যে হিংসার ছবিটি ধরে রাখেন : ‘মাটিতে তখনও লেগে আছে কালচে কালচে রক্ত৷ পাড়ার কুকুর সেই রক্ত চাটছে৷ ওই রক্ত যার, হয়তো তার হাত থেকেই কুকুরটি একসময় খাবার খেয়েছে৷’ প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘ইন্দিরা হত্যা ও আমাদের জাতীয়তা’৷ ছাপা হয় ১৯৮৪ সালের প্রথম সপ্তাহের কোনও একদিন৷ লেখাটি শেষ হয় প্রার্থনার মতো কথা দিয়ে: ‘আমাদের আরাধ্য দেবতার চেয়ে বড়ো খুনি বোধহয় কেউ নেই৷ দেশের সবক’টা ধর্মস্থানকে আগামী দশ বছরের জন্য বন্ধ করে দিলে কেমন হয়? যার যা ইচ্ছে হয় বাড়িতে বসে ধর্ম করুক৷ তাহলে হয়তো দেখা যাবে ভ্রাতৃহত্যা, প্রতিবেশীহত্যা বন্ধ হয়েছে৷’

তিন

বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনা ও তার প্রবল প্রতিক্রিয়া নিয়ে লিখতে হয়েছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে৷ শিরোনাম ‘আমরা বন্দী ধর্মের নামে অধর্মে’৷ হিংসা, ঘৃণা, আগুন, রক্তস্রোত, হত্যা, কার্ফিউ, অন্ধকার, আতঙ্ক ইত্যাদি বীভৎসতা তাঁর চারপাশে ঘটতে দেখে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘সুস্থ চিন্তা, শিল্প, সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করে যে কলকাতা, সেখানেও কদর্য সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিতে পারে?’ এই ঘটনায় বহুস্তরীয় সামাজিক প্রতিক্রিয়ার পাঠ লিপিবদ্ধ করেন তিনি৷ দৃশ্যত গুণী একজন মন্তব্য করেন, ‘ভেঙেছে ভালোই হয়েছে, একটা বালাই চুকে গেছে৷’ এই ‘গুণীজন’ মৃত্যুস্রোতে যেন নির্বিকার৷ আরেক ‘গুণীজন’ বলেন, ‘ব্যাপারটা খুব খারাপ হয়েছে বটে, কিন্তু অনেকে খুশিও হয়েছে৷’ অর্থাৎ তিনি খুশি হয়েছেন৷ কেউ দপ করে জ্বলে উঠে বলে ফেলেন, ‘একটা মসজিদ ভাঙা হয়েছে তো কী এমন সাংঘাতিক ব্যাপার, কত যে মন্দির ভেঙেছে ওরা?’ সমাজ-মনে কত ঘৃণা জমে আছে! এমনও কেউ বলেন, ‘এবার সবক’টা মন্দির, মসজিদ, গির্জা, গুরুদ্বারকে মিউজিয়াম করে দিলে কেমন হয়? যার খুশি বাড়িতে বসে ধর্মচর্চা করুক, প্রকাশ্যে ধর্মাচরণ নিষিদ্ধ হোক আমাদের দেশে৷’ একথা বলার মানুষ অবশ্য এদেশে মাইক্রোস্কোপিক মাইনরিটি৷

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে সংবাদধর্মী লেখা লিখতে হয়েছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে৷ আমরা এই তিনটি বেছে নিলাম এই কারণে যে বহু বছর পেরিয়ে এসে লেখাগুলি প্রকাশ সময়ের চেয়ে বেশি সাম্প্রতিক ও প্রাসঙ্গিক৷ বাংলাভাগের দুর্দশা আশি বছর পর আরও মর্মান্তিক৷ বাঙালি দেশ হারাচ্ছে প্রতিদিন৷ আর সাম্প্রদায়িক ঘৃণা, বিদ্বেষ খানখান করতে চাইছে দেশের গাঁথনি৷

সহজ জলের মতো কথার চলন  

কৌশিক জোয়ারদার

 

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তখন তরুণ কবি। দেশ পত্রিকার দপ্তরে এলেন একটা গল্প জমা দিতে। সে সময়ে গল্পের বিভাগটি দেখতেন বিমল কর। হয়তো ঠাট্টা করেই, বিমল কর গল্পটি হাতে নিয়ে বললেন, ‘কবিতাই তো বেশ লিখছিলে।’ সুনীল যে গল্পও লিখবেন বেশ এবং বেশি, তখন বিমলবাবুর পক্ষে হয়তো অনুমান করা সম্ভব হয়নি। পরে সুনীলের প্রতিপত্তি এমনই বৃদ্ধি পেল যে, গুজব রটে গেল দেশ পত্রিকার অফিসে সুনীলের জন্য পৃথক ঘরের ব্যবস্থা হচ্ছে। গুজবই, কিন্তু বিমল কর চাকরি ছেড়ে দিলেন। এতে সুনীলের সত্যি কোনও হাত ছিল না, কিন্তু লেখার হাতটির গুণেই তিনি বাংলা সাহিত্যের সম্রাট হয়ে উঠলেন।

বাদল বসু লিখেছেন, ‘সুনীলের মতো জনপ্রিয় তাঁর সমসাময়িক কোনও সাহিত্যিক হতে পারেননি।’ বলাই বাহুল্য, এই জনপ্রিয়তা কেবল কবিতার কারণেই নয়। বস্তুত কবি সুনীল না গদ্যকার সুনীল, কে বেশি জনপ্রিয়, এই নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। নিজেকে হয়তো তিনি কবি হিসেবে দেখতেই পছন্দ করবেন। তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘কবিতা আমার প্রথম প্রেম, কিন্তু গদ্য লিখতে হয়েছে অজস্র।’

দিস্তা দিস্তা লিখতে হয়েছে বলে নিন্দুকেরা অনেকে বলেন, গুণমানের সঙ্গে তিনি আপোস করেছেন ঢের। সব ক্ষেত্রের মতোই সাহিত্যেও বিরোধিতার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান লাগে। কৃত্তিবাসের কালাপাহাড় সুনীল নিজেই একসময়ে প্রতিষ্ঠান হয়ে গিয়ে কৌতুকে নিজের কীর্তিকে কতিপয় ক্রুদ্ধ লেখকের দ্বারা আক্রান্ত হতে দেখতেন। সব লেখা কারওরই উতরোয় না, কিন্তু সুনীলের গদ্যে অনেক উজ্জ্বল বন্দর, আপনি নোঙর ফেলতে পারেন।

কবিতা লিখে পয়সা হয় না, তরুণ কবিটি অনেক আগেই বুঝে গিয়েছিলেন। তাই প্রথম সুযোগ পাওয়ার পর থেকেই গল্পে, উপন্যাসে এবং অন্য নানান ধরনের গদ্যে নিজেকে বিস্তার করে দিয়েছিলেন ক্রমশ। কবিতার পাশাপাশি তাঁর গদ্যভাষার স্বকীয়তা সমসময় লক্ষ্য না করে পারেনি।

সুনীল তখন আমেরিকার আয়ওয়া শহরে, রাইটার্স ওয়ার্কশপে যোগ দিতে গেছেন। সৌজন্যে কবি পল এঙ্গেল। সেই ষাটের দশকের মাঝামাঝি কলকাতায় তখন গদ্যে-পদ্যে হাংরি আন্দোলনের ঢেউ। আমেরিকা থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হাংরি আন্দোলনের অন্যতম পুরোহিত মলয় রায়চৌধুরীকে চিঠি লিখেছিলেন। বাপরে বাপ, কী গদ্য সেই চিঠির! শ্লীল সাহিত্যভাষায় কীভাবে মাস্তানি প্রদর্শন করতে হয়, জানতে হলে চিঠিটি পড়ুন। যারা পড়েছেন, ভুলতে পারবেন না সেই সগর্ব ঘোষণা : ‘কলকাতা শহরটা আমার। ফিরে গিয়ে আমি ওখানে রাজত্ব করব।’ করে যে ছিলেন, সময় সাক্ষী।

তো সেই চিঠিতেই তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘বালজাকের মতো আমি আমার ভোকাবুলারি আলাদা করে নিয়েছি কবিতা ও গদ্যে।’ সুনীলের গদ্যের সহজ সাবলীল চলনের কারণেই তিনি সর্বস্তরের পাঠকের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন ও আছেনও। যাঁরা জনপ্রিয়তাকে ভালো সাহিত্যের পরিপন্থী মনে করেন, তাঁরা অবশ্য তাঁর সাহিত্যপ্রতিভায় সন্দেহ করে আসর জমাতেন। কিন্তু অস্বীকার করে লাভ নেই, গদ্যে সুনীল জলের ভিতরে মাছের মতো।

আমার বাড়িতে কোনও শারদসংখ্যায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস থাকলে ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই সবার আগে ওইটাই পড়তেন। এমনকি নিন্দুকেরাও। সমালোচনাকে সুনীল খুব একটা গুরুত্ব দিতেন না। কালজয়ী সাহিত্য বলে কিছু হয় কি না, এই নিয়েই তাঁর সন্দেহ ছিল। রবীন্দ্রনাথের গান না থাকলে কে আর তাঁকে আজও মনে রাখত, এইরকমই বলেছিলেন কোথায় যেন। অবশ্য রবীন্দ্রনাথের কাব্য ও গদ্যের উৎকর্ষে তাঁর সন্দেহ ছিল না, মানুষের স্মৃতির উপরেই ভরসা রাখেননি তিনি।

তবে কবিতায় নীরার পাশাপাশি, গদ্যে নীললোহিত, নীলমানুষ রণজয় এবং কাকাবাবুর মতো এতগুলি জনপ্রিয় চরিত্র সৃষ্টি করেছেন যিনি, তিনি আরও অনেক দিন পাঠকদের মনে বেঁচে থাকবেন। আমরা সবাই একদিন যেতে চাই দিকশূন্যপুর, আমাদের সবার ভিতরে বাস করে একজন নীলু, যার বয়স সাতাশেই থেমে থাকে।

তবে সত্যি বলতে কী, সাতাশের অধিক না বাড়লেও, ভিতরে ভিতরে বয়স কমে আমি প্রায়শই কিশোরত্বপ্রাপ্ত হই। সেই কিশোরটি ভোলে না, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নাম ভাঁড়িয়ে এক দুষ্ট লোক তার প্রকৃত কৈশোরে কী দুঃখই দিয়েছিলেন!

সুদূর অতীতে, সেবার হস্টেল থেকে উত্তরবঙ্গে ফেরার সময়ে ভয়াবহ বৃষ্টি আর বন্যার কারণে কলকাতায় শিয়ালদহের একটি হোটেলে আটকা পড়েছিলাম। হোটেলেরই আবাসিক, মোটাসোটা গোলগাল, কানের দু’পাশে পুরুষ্টু জুলফি নিয়ে একটা লোক আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে বললেন, ‘হলদে বাড়ির রহস্য পড়েছ? আমি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।’

আমাকে আর পায় কে! বইপোকা আমি তো তাঁর কিশোরপাঠ্য সব লেখা গোগ্রাসে গিলি। প্রিয় লেখকের সঙ্গে কত গল্পই না জুড়ে দিলাম। জানলাম তিনি নাকি লেখার জন্য এইখানে আত্মগোপন করে আছেন। কিন্তু আমার পাড়াতুতো দাদা এসে আমার স্বপ্নভঙ্গ ঘটিয়ে দিলেন। জেরা করে তিনি লোকটিকে জাল লেখক প্রমাণ করে দিলেন এবং হোটেল ছাড়া হতে হল সেই নকল সুনীলকে।

কী কারণে যে তিনি কিশোর পাঠকের মনে এমন আঘাত দিয়েছিলেন, হলদে বাড়ির মতোই সে এক রহস্য। কিন্তু লক্ষণীয়, মন ভোলানোর জন্য বেছে নিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কেই। অব্যর্থ অস্ত্র। কিশোর মনের স্বপ্নভঙ্গের সেই ক্ষতের নিরাময় আজও হয়নি।

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল, আনন্দমেলায় কাকাবাবুর কোনও একটি অভিযানের কাহিনী ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছিল। একবার কাকাবাবু রাজা রায়চৌধুরীর গোঁফটি আঁকতে ভুলে গিয়েছিলেন শিল্পী। পরের সংখ্যায় গল্পের মাঝখানে একটি চতুর্ভুজের ভিতরে শুধুমাত্র কালো ঝোপড়া পুরুষ্টু একটি গোঁফ এঁকে ছোট্ট বন্ধুদের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন সম্পাদক। এতটাই জনপ্রিয় ছিল কাকাবাবুর গল্পগুলি।

আজ ভাবি, কল্পনা ও কলমের কতটা জোর থাকলে একজন খঞ্জ মধ্যবয়সি মানুষকে শিশু-কিশোরদের উপযোগী গল্পের নায়ক হিসেবে ভাবা ও লেখা যায়। ‘কাকাবাবু’ আমার মতে গদ্যকার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। কাকাবাবুর মতো একজন মানুষকে সুনীল সত্যিই একবার অনায়াসে পাহাড়ে উঠতে দেখেছিলেন এবং সেই মানুষটির মনের জোরকেই তিনি নায়ক হিসেবে সৃষ্টি করেছিলেন।

বহুপ্রজ এই লেখক কবিতা, গল্প, উপন্যাস লেখার পাশাপাশি এবং পত্রিকার কাজ সামলেও কাকাবাবুকে নিয়ে প্রায় চল্লিশটির কাছাকাছি রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনী লিখেছেন এবং অধিকাংশই সাহিত্য হিসেবেও উত্তীর্ণ। ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’, ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’ থেকে শুরু করে ‘আগ্নেয়গিরির পেটের ভিতর’ পর্যন্ত এতগুলি কাহিনীতে পাঠককে সমান আকৃষ্ট করে রাখা কম কথা নয়।

‘তাজমহলে এক কাপ চা’, ‘প্রথম আলো’ অথবা ‘আত্মপ্রকাশ’-এর মতো গল্প-উপন্যাস ছেড়ে স্বল্প পরিসরের আলোচনায় কাকাবাবুকে নিয়েই এত কথা বলছি, কারণ গদ্যকার সুনীলের প্রসঙ্গে হয়তো ‘বড়দের’ জন্য লেখাগুলিই পাঠক ও আলোচকদের অধিক মনে পড়বে। কিন্তু যে লেখক প্রাপ্তবয়স্কের উপযোগী কবিতা-উপন্যাস লেখার পরেও শিশু-কিশোরদের মন জয় করে ফেলতে পারেন, তাঁকে আমি গদ্যকার হিসেবে বিশেষ কৃতিত্ব দেব।

তাছাড়া এই গল্পগুলি ভ্রমণকাহিনী হিসেবেও চমৎকার। আন্দামানের সবুজ দ্বীপ, মধ্যপ্রদেশের ভোপাল, ত্রিপুরার দুর্গম অঞ্চল, নেপালের বরফঢাকা শুভ্র হিমালয়ের চূড়া, বন্যপ্রাণী অধ্যুষিত আফ্রিকার জঙ্গল, এরকম কত জায়গাই না ঘুরে এসেছি সন্তু হয়ে কাকাবাবুর হাত ধরে।

ভ্রমণের কথাই যখন উঠল, উল্লেখ করতেই হয় ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ বইটির কথা। নামেই প্রকাশ, ফরাসি দেশের কথা হবে। অথচ বইটির প্রথমার্ধের অনেকখানি জুড়ে সুনীলের আয়ওয়া শহরে বাস। হলে কী হবে, সেও আসলে লেখকের ফরাসি ভ্রমণ।

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, দেশ কোনও ভূখণ্ড নয়, তা আসলে মানবের মনোভূমি। সুনীলের সে সময়কার কবিতায় শুধুই বাংলার নদী, হাওয়া, মাটি, বিদেশ অনুপস্থিত। তেমনই মার্গারিট ম্যাতিউ ফরাসি দেশকেই মনের মধ্যে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় রাত্রিদিন। মার্গারিট লেখকের স্বর্ণকেশী ফরাসি বান্ধবী। সে ফরাসি কবিতা আর প্যারিসের রোদ্দুর দিয়ে জড়িয়ে রাখে সুনীলকে।

পরে অবশ্য কলকাতায় ফেরার পথে লেখক প্যারিসে এলেন, এবং এমনভাবে গল্প বললেন ছবি ও কবিতার দেশের যে, আমি আজও মার্গারিট ছাড়া প্যারিসের রাস্তা ভাবতে পারি না। এমন কোনও যুবক আছে যে মার্গারিটের প্রেমে পড়বে না? সুনীলও পড়েছিলেন সন্দেহ নেই, অথচ ভগ্নহৃদয় ফরাসিনীর বিমান আমেরিকার দিকে উড়ে গেলেও, কী নির্মোহভাবেই যেন অমলিন ভ্রমণ চলতে থাকে অপরাপর সঙ্গীদের সঙ্গে।

এমন নির্মোহ গদ্যের চলন সুনীলের অনেক লেখাতেই। জলের মতো সহজ, অথচ লেখক যেন পদ্মপাতায় জল। মায়া আছে, অথচ লেখক কোনও চরিত্রের প্রতিই মোহগ্রস্ত হয়ে আটকে থাকেন না এক জায়গায়।

গদ্য অজস্র লিখেছেন সুনীল, কেউ বলতেই পারেন, ‘বড্ড বেশিই লিখেছেন।’ সে কথা তিনি নিজেও মানতেন। ভুলে যাওয়ার মতো অনেক রচনা আছে তাঁর, কিন্তু একবার পড়তে শুরু করে মাঝপথে ছেড়ে চলে যাওয়ার মতো গদ্য তিনি কমই লিখেছেন।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *