অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী
চোখ বুজে কল্পনা করুন এমন এক উচ্চতার কথা, যেখানে শ্বাস নেওয়াটাও এক মস্ত বড় ‘সংগ্রাম’। ফুসফুসে বরফশীতল হাওয়া যেন কাচের টুকরোর মতো বিঁধছে। আর ঠিক সামনেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে এক হিরের আকৃতির কালো পাথরের শৃঙ্গ— অধরা, দুর্লঙ্ঘ্য, নিস্তব্ধ। তুষারাবৃত সেই পর্বতচূড়ার চারপাশে হিমালয়ের ঝোড়ো হাওয়ায় পতপত করে উড়ছে পুণ্যার্থীদের প্রার্থনা পতাকা। যুগ যুগ ধরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি প্রবাদ অত্যন্ত জনপ্রিয়— ‘সব তীর্থ বার বার, গঙ্গাসাগর একবার।’ কিন্তু গত কয়েক বছরে পিলগ্রিম ট্যুরিজমে যোগ হয়েছে উত্তরের এক পুণ্যভূমি, কৈলাস ও মান সরোবর যাত্রা। তিব্বতে অবস্থিত কৈলাস পর্বত ও মান সরোবর হিন্দুদের কাছে পরম পবিত্র, যেখানে দেবাদিদেব মহাদেবের আদি বাসভূমি বলে বিশ্বাস করা হয়। এটি বৌদ্ধ, জৈন এবং তিব্বতিদের কাছেও সমানভাবে পুণ্যস্থল।
পবিত্র তীর্থ
করোনার সময়ে বেশ কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর, ২০২৫ সাল থেকে আবারও ভারতের মাটি থেকে শুরু হয়েছে এই কৈলাস যাত্রা। চিনা অধিগ্রহণে থাকা এই কৈলাসে যাওয়ার জন্য বেশ কিছু আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধও রয়েছে। অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং কষ্টসাধ্য এই বাৎসরিক পুণ্যযাত্রায় অংশ নিতে অনেকদিন আগে থেকেই বুকিং করতে হয়। ভারতীয়দের জন্য নির্দিষ্ট নথিপত্র জমা দেওয়ার সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে করাতে হয় অত্যন্ত কঠিন স্বাস্থ্য পরীক্ষাও। কিছু বছর পর্যটকদের কাছে হয়ে ওঠে এক বিশেষ আধ্যাত্মিক সময়। ২০২৬ সালও তেমনই এক অলৌকিক বিষয়ের সাক্ষী, কারণ এই বছরের কৈলাস ও মান সরোবর যাত্রা এক বিরল আধ্যাত্মিক পর্ব হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গত মে মাস থেকে শুরু হওয়া এই পবিত্র যাত্রা চলবে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
বিশেষ বছর
২০২৬-এর এই কৈলাস যাত্রার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে জ্যোতিষ বিজ্ঞানের দিক থেকেও। তিব্বতি ও চিনা পঞ্জিকা অনুসারে এটি আগুনে ঘোড়ার বছর বা ফায়ার হর্স ইয়ার, যা ৬০ বছরে মাত্র একবার ফিরে আসে। তিব্বতি বিশ্বাস অনুযায়ী, গৌতম বুদ্ধের জন্ম হয়েছিল এমনই এক ঘোড়া বছরে। আর তাই সেই সুপ্রাচীন বিশ্বাস থেকেই উঠে এসেছে এই আগুনে ঘোড়ার বছরের বিশেষ মাহাত্ম্য। যার অর্থ, ২০২৬ সালে একবার কৈলাস দর্শন বা পরিক্রমা করা মানে সাধারণ সময়ের ১২ থেকে ১৩টি পরিক্রমার সমান পুণ্যলাভ। এই বিরল মহাযোগের কারণে বর্তমান সময়কে সাধক ও সনাতন ধর্মাবলম্বী মহলে কৈলাস মহাকুম্ভ বলা হচ্ছে।
আধ্যাত্মিক শক্তি
তিব্বতি ও চিনা জ্যোতিষশাস্ত্রে বছর নির্ধারিত হয় বারোটি প্রাণীচিহ্ন ও পাঁচটি মৌলিক উপাদানের সমন্বয়ে। ঘোড়া রাশি এবং অগ্নি উপাদান একত্রে মিললে তৈরি হয় এই আগুনে ঘোড়ার বছর। এই জ্যোতিষীয় ব্যাখ্যায় অগ্নিকে ধরা হয় শুদ্ধিকরণ ও রূপান্তরের প্রতীক হিসেবে— যে আগুন মানুষের ভেতরের অজ্ঞতা ও পুরোনো জাগতিক বন্ধনকে দগ্ধ করে ছাই করে দেয়। আর ঘোড়া হল মূলত শক্তি, গতি এবং পরম মুক্তির প্রতীক। বহু সাধক এই দুই মহাশক্তির মিলনকে এক প্রবল আধ্যাত্মিক পরিবর্তনের সময় হিসেবে দেখেন। হিন্দু ধর্ম অনুসারে এই ব্যাখ্যার সঙ্গে শিবের রূপান্তরিত শক্তির গভীর মিল রয়েছে—বিশেষত ধ্বংসের মধ্য দিয়ে নতুন সৃষ্টির দর্শনে। কৈলাস মহাকুম্ভ কথাটি অনেক আধ্যাত্মিক গুরু ও সাধকের কাছে এক প্রতীকী প্রকাশ, যেখানে কৈলাসের আধ্যাত্মিক শক্তি বিশেষভাবে সক্রিয় হয় বলে মনে করা হয়। যোগ ও তন্ত্রের বহু প্রাচীন ধারায় কৈলাস পর্বতকে মহাবিশ্বের মূল আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে কল্পনা করা হয়।
দুর্গম পরিক্রমা
বলা হয় কৈলাস পর্বতকে মানুষের পক্ষে জয় করা সম্ভব নয়, তাকে পরম পবিত্র ও অক্ষত রেখেই পুণ্যার্থীরা এই পর্বতের চারপাশ পদব্রজে পরিক্রমা করেন। হিমালয়ের চরম উচ্চতায় প্রায় ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই দুর্গম পথ পুণ্যার্থীদের অতিক্রম করতে হয়। এই যাত্রার সবচেয়ে কঠিন ও বিপজ্জনক অংশ হল ডোলমা লা পাস, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫,৬৩০ মিটার অর্থাৎ ১৮,৪৭১ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। বহু তীর্থযাত্রীর কাছে এই পথ অতিক্রম করা মানে আক্ষরিক অর্থেই এক নতুন পুনর্জন্ম লাভ করা। এখানকার হাড়কাঁপানো ঠান্ডার ডেথ জোন পেরিয়ে এই দীর্ঘ যাত্রা পুণ্যার্থীদের শারীরিক ক্ষমতা ও মানসিক সহনশীলতার চরম পরীক্ষা নেয়।
নতুন সড়ক
পাহাড়ি পথের এই অবর্ণনীয় কষ্ট লাঘব করতেই ভারত সরকার উত্তরাখণ্ডের লিপুলেখ পাস পর্যন্ত আশি কিলোমিটার দীর্ঘ একটি নতুন সংযোগকারী সড়ক বা লিংক রোড নির্মাণ করেছে। এর ফলে সিকিমের নাথু লা বা নেপালের কাঠমান্ডু হয়ে দীর্ঘ ও দুর্গম যাত্রাপথ এড়িয়ে পুণ্যার্থীরা অনেক দ্রুত ও নিরাপদে তিব্বত মালভূমিতে পৌঁছাতে পারছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের শারীরিক ক্লেশ দূর করার এই সদিচ্ছাই আন্তর্জাতিক স্তরে জন্ম দিয়েছে এক তীব্র কূটনৈতিক ঝড়ের। আক্ষরিক অর্থেই, এক পরম পবিত্র তীর্থপথ আজ দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ভূরাজনৈতিক সংঘাতের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভৌগোলিক সংঘাত
২০২৬ সালের গ্রীষ্মে লিপুলেখ পাস দিয়ে কৈলাস যাত্রা পুনরায় শুরুর কথা ভারত ও চিন যৌথভাবে ঘোষণা করতেই কাঠমান্ডু কড়া কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানায়। নেপালের দাবি, এই নতুন যাত্রাপথ সরাসরি তাদের দাবি করা সার্বভৌম ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে গিয়েছে। লিপুলেখ পাসের মাধ্যমে তিব্বতের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপিত থাকায় ভারতের সামরিক অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে সুদৃঢ় হয়েছে, যা এই অঞ্চলে চিনের একচেটিয়া আধিপত্যের প্রতি এক বড়সড়ো চ্যালেঞ্জ। স্বাভাবিকভাবেই নেপালের এই আকস্মিক আপত্তির পেছনে বেজিংয়ের কোনও প্রচ্ছন্ন ইন্ধন বা পরোক্ষ প্ররোচনা রয়েছে কি না, সেই কোণটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সাংস্কৃতিক সমাধান
এই অচলাবস্থা কাটাতে প্রয়োজন পরিণত কূটনীতির, উগ্র জাতীয়তাবাদের আস্ফালনের নয়। বিশেষত আগুনে ঘোড়ার বছরের মতো পবিত্র সময়ে একটি ঐতিহাসিক তীর্থযাত্রাকে সংকীর্ণ রাজনীতির দড়াদড়িতে আটকে রাখা অনুচিত। সমাধানের জন্য প্রথমত, কালাপানি বা লিপুলেখ অঞ্চল নিয়ে দুই দেশের বিদেশসচিব পর্যায়ের থমকে থাকা সীমান্ত বৈঠক অবিলম্বে পুনরুজ্জীবিত করা প্রয়োজন। ঐতিহাসিক নথিপত্রের পাশাপাশি আধুনিক উপগ্রহ মানচিত্র এবং নদী বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে এই বিরোধের একটি বৈজ্ঞানিক ও সম্মানজনক মীমাংসা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, নেপালের সাম্প্রতিক কড়া শুল্কবিধি সাধারণ মানুষের জীবিকায় টান ফেলায় ইন্টার গভর্নমেন্টাল কমিটির মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সমস্যাগুলির দ্রুত সমাধান করে পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। তৃতীয়ত, রামায়ণ ও বুদ্ধ সার্কিটের মতো যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে দুই দেশের সুপ্রাচীন সভ্যতার মেলবন্ধন ও সাংস্কৃতিক বিনিময় প্রসারিত করা প্রয়োজন। পরিশেষে, স্থায়ী সমাধান লুকিয়ে আছে কৈলাস যাত্রার অভিন্ন ঐতিহ্যের দর্শনে। ভারত ও নেপালের সাধারণ মানুষের নিবিড় আত্মিক সম্পর্ক যে কোনও সাময়িক রাজনৈতিক উত্তেজনার চেয়ে শক্তিশালী। রাষ্ট্রনেতাদের নিশ্চিত করতে হবে, কৈলাসের পুণ্যপথ যেন চিরকাল আত্মিক মুক্তির সোপান হয়েই থাকে, তা যেন আন্তর্জাতিক সংঘাতের রণক্ষেত্রে পরিণত না হয়।
(লেখক সাংবাদিক)
