যোগী মডেল

যোগী মডেল

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


সারা দেশে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে দুর্নীতিদমনের প্রশ্নে যোগী মডেল অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই যোগী মডেলের বৈশিষ্ট্য কী? এই মডেলের সারাংশ, দুর্নীতির প্রশ্নে সরকারের অনমনীয় মনোভাব। অপরাধীদের সমূলে বিনাশ করাই উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকারের মূলমন্ত্র। যোগী সরকার প্রথম দিন থেকেই অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করেছে এবং তা করতে গিয়ে বহু সময়ে দেশের সংবিধান স্বীকৃত আইনি ব্যবস্থার বাইরে সিদ্ধান্ত গ্রহণেও দ্বিধা করেনি।

অপরাধীর বিচারের আগেই তার বিচার প্রক্রিয়া শেষ করে ফেলেছে যোগী সরকার। এমন পরিস্থিতি ঘটেছে একাধিকবার। বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্তদের সম্পত্তি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যোগী সরকার। সরকারের এই সিদ্ধান্তে বহু মানুষ সন্তোষ প্রকাশ করতেও পিছপা হয়নি। কিন্তু সরকার সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে গেলে যে যৌক্তিক পথে হাঁটতে হয়, সেকথা ভুলে যায় শাসক গোষ্ঠী।

বহুসময় সস্তা জনপ্রিয়তার মোহে অথবা নিজেদের মহিমান্বিত করার ইচ্ছায় শাসক গোষ্ঠী বহু অনভিপ্রেত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলে। যোগী সরকারের বুলডোজার নীতি একাধিকবার আদালতে ধিক্কৃত হয়েছে। তবু যোগী আদিত্যনাথ আপন অবস্থানে স্থিত থাকা শ্রেয় মনে করেছেন বরাবর। অন্য একটি সিদ্ধান্তের জন্যও এবার তাঁকে কঠিনভাবে সমালোচিত হতে হল।

যোগী সরকারের অপরাধ দমনের মডেলে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহে প্রবলভাবে উৎসাহী হয়ে উঠেছেন। যোগী সরকারও অকৃপণভাবে এইসব জনপ্রতিনিধি এবং তাঁদের স্বজনদের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দিয়েছে। এর ফলে সমাজে যে এক চূড়ান্ত অরাজকতা সৃষ্টি হতে পারে, সেদিকে মাথা ঘামায়নি যোগী সরকার।

অথচ দুর্নীতি মোকাবিলার নামে দমনমূলক সংস্কৃতির আমদানির ফলে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা বড় হয়ে দেখা দিয়েছে বলে মনে করিয়ে দিয়েছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণ, উত্তরপ্রদেশের বন্দুক সংস্কৃতি সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করে ত্রাসের সঞ্চার করছে। আদালতে পেশ করা হলফনামা থেকে জানা যাচ্ছে, এই মুহূর্তে উত্তরপ্রদেশে দশ লক্ষের কিছু বেশি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ছ’হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে এমন সব মানুষের হাতে, যাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা ঝুলছে। অর্থাৎ আগ্নেয়াস্ত্র যাঁদের হাতে, তাঁরা নিজেরা বিভিন্ন দুষ্কর্মে অভিযুক্ত।

ওই হলফনামা থেকে এটাও জানা গিয়েছে যে, প্রায় একুশ হাজার পরিবারের হাতে একাধিক আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে। ব্রিজভূষণ শরণ সিং বা রাজা ভাইয়ার মতো প্রভাবশালী মানুষের হাতে একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র থাকার তথ্য কৌশলে গোপন করেছে যোগী সরকারের পুলিশ। এই তথ্য হাতে পাওয়ার পর আদালতের পর্যবেক্ষণ, যে সমাজে এভাবে সশস্ত্র ব্যক্তিরা আতঙ্কের রাজত্ব কায়েম করতে চায়, সেখানে সাধারণ মানুষ কখনও স্বাধীনভাবে জীবনধারণ করতে পারে না।

আদালতের এই পর্যবেক্ষণের পর যোগী সরকার হয়তো রাজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে কিঞ্চিৎ সতর্ক হবে। যদিও সরকারের চেতনা ফিরবে- এমন কথা বলার সময় এখনও আসেনি। যোগী সরকারের কঠোর দুর্নীতিদমন নীতিতে পুলিশ ক্রমেই এনকাউন্টার প্রিয় হয়ে উঠেছে। সরকারের ধারণা, অভিযুক্তকে নিকেশ করে ফেলতে পারলেই সমাজ অপরাধীমুক্ত হয়ে যাবে।

যোগী সরকারের এই নীতি মোটেও অভিনব নয়। ১৯৮০ সালে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পদে বসেই ঠিক করেছিলেন অপরাধ দমনে কঠোর নীতি গ্রহণ করবেন। প্রায় দু’হাজার অপরাধীর মধ্যে কাউকে এনকাউন্টার করে মেরে ফেলে ভিপি সিং সরকারের পুলিশ। কাউকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হয়। কাউকে জেলবন্দি করা হয়। তারপরেও উত্তরপ্রদেশ অপরাধমুক্ত রাজ্য হয়নি। বরং দেখা গিয়েছে, বহুসময়ে আইনভঙ্গকারীরাই আইনপ্রণয়নকারী হয়ে উঠেছেন। অতীত থেকে এই শিক্ষা যোগী সরকারের নেওয়া উচিত যে, রাষ্ট্র যদি দমনপীড়নকে একমাত্র নীতি হিসাবে গুরুত্ব দেয়, তাহলে তা সমাজের পক্ষে মঙ্গলদায়ক হয় না।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *