সরাসরি না হলেও আমেরিকার পাকিস্তান নীতি নিয়ে সরব হল ভারত। নিউইয়র্কে এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের এক আলোচনায় কেন্দ্রীয় বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর পাকিস্তানের মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে একপ্রকার সতর্ক করেই দিয়েছেন। পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, ভারতের মতো দীর্ঘদিন আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের শিকার দেশের উদ্বেগ বুঝতে না পারলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে প্রভাব পড়তে বাধ্য।
জয়শংকর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নামোচ্চারণ করেননি ঠিকই। কিন্তু অপারেশন সিঁদুর পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের আচরণ নয়াদিল্লির শিরঃপীড়া স্পষ্ট করে দিয়েছে। অপারেশন সিঁদুরে ভারতের সাফল্য নিয়ে আমেরিকাকে সেভাবে কখনও প্রশংসা করতে শোনা যায়নি। বরং পাকিস্তান যখন যা বলেছে, সেসব নিয়ে একপ্রকার মাতামাতিই করেছে।
সম্প্রতি রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের বক্তব্যের ভিডিও সমাজমাধ্যমে শেয়ার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্পের সময়োচিত হস্তক্ষেপে অপারেশন সিঁদুর বন্ধ হয়েছিল বলে ওই ভিডিওয় দাবি করতে শোনা গিয়েছিল শাহবাজকে। জয়শংকর মনে করিয়ে দিয়েছেন, বন্ধু দেশ ভারতের উদ্বেগকে গুরুত্ব না দিলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে তার প্রভাব পড়বে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির জটিলতা নিয়েও মুখ খুলেছেন কেন্দ্রীয় বিদেশমন্ত্রী।
ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বরাবরই সুয়োরানি আর দুয়োরানির গল্পের মতো। গণতন্ত্র, বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের মতো একাধিক বিষয়ে ভারত ও আমেরিকা বছরের পর বছর একই নৌকার সওয়ারি। তা সত্ত্বেও সেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কাঁটার মতো বিঁধে রয়েছে পাকিস্তানের প্রতি আমেরিকার পক্ষপাতিত্ব।
পাকিস্তানকে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করতে সবসময়ই সক্রিয় ওয়াশিংটন। ব্রিকস, জি ৭-এর মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব আমেরিকার পাকিস্তানকে মদত জুগিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। ভারতের বিদেশনীতির কিছু ভুলত্রুটির কারণে ইসলামাবাদ ক্রমাগত ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ হচ্ছে বটে। একই সঙ্গে আমেরিকার মতো সুপার পাওয়ার পাশে থাকায় পাকিস্তান হম্বিতম্বি করার স্পর্ধা পেয়ে যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমেরিকা এবং পূর্বতন সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন কোনও জোটে সরাসরি যোগ দেয়নি ভারত। বরং নির্জোট আন্দোলনে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির সঙ্গে মিত্রতা তৈরি করেছিল। তবে আমেরিকার তুলনায় সোভিয়েতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছিল নয়াদিল্লি। সেই মৈত্রী এখনও বহাল। উলটোদিকে ভারতের সোভিয়েত প্রীতির পালটা পাকিস্তান-মার্কিন ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে।
সন্ত্রাসের মদতদাতা হিসেবে পরিচিতি সত্ত্বেও ইসলামাবাদের প্রতি ওয়াশিংটনের দয়া-দাক্ষিণ্যের অভাব নেই। বরং ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তানকে নিয়ে সমস্ত রাখঢাক উধাও হয়ে গিয়েছে। কখনও পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে ওভাল অফিসে পাত পেড়ে খাওয়ানো হয়েছে। কখনও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
মার্কিন মুলুকের এমন খুল্লমখুল্লা সমর্থন সত্ত্বেও পাকিস্তান ব্যর্থ রাষ্ট্রের থেকেও একধাপ নেমে গিয়েছে। আগে বালুচিস্তান, সিন্ধে নিয়মিত গোলমাল, অশান্তি হত। এখন পাক অধিকৃত কাশ্মীরেও অশান্তি চলছে। মানবোন্নয়নের সূচকেও পাকিস্তান পিছিয়ে রয়েছে। ট্রাম্পের কঠোর শুল্কনীতিতে অনেক ক্ষেত্রেই নয়াদিল্লিকে ঢোঁক গিলতে হচ্ছে।
তবে এই প্রথম আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে মোদি সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ওয়াশিংটনের পাকিস্তান-নীতির সমালোচনা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন বিদ্যমান ব্যবস্থাকে আর বরদাস্ত করা কঠিন। ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের ভুল বা অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করে থাকলে নিশ্চিতভাবেই ভারত-আমেরিকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হতে বাধ্য।
শাহবাজ, মুনিরকে নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের গদগদ ব্যাপারটা ভারত-আমেরিকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতির পথে সবথেকে বড় কাঁটা। ভারতের কর্মই ভারতের সবথেকে বড় পরিচয়। আলাদা করে ডঙ্কা বাজানোর প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমেরিকা সহ যেসব দেশ পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে এবং তাদের কোনওপ্রকার দোষারোপ না করে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে উন্নতির কথা বলে, তাদেরও যে আত্মসমীক্ষার প্রয়োজন আছে, সেটা জয়শংকরের বার্তায় পরিষ্কার।
The submit উচিত কথা appeared first on Uttarbanga Sambad.
