ইট আউট, ডিম ইন, আগামী বিপন্ন মমতার

ইট আউট, ডিম ইন, আগামী বিপন্ন মমতার

শিক্ষা
Spread the love


রূপায়ণ ভট্টাচার্য

আগামী বলছে দেখতে আসবো তোকে।

যাদবপুর সুলেখা মোড় থেকে বিজয়গড় যাওয়ার শর্টকাট রাস্তায় আগের সরকারের কাউন্সিলারের সৌজন্যে দেওয়ালে লেখা আছে ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’। পাশে লাইনের সৃষ্টিকর্তা শঙ্খ ঘোষের ছবি। রিজেন্ট এটেস্টের ওই পাড়ায় একটু এগোলে বাঁদিকে এখনও আর একটা হোর্ডিং।

সেখানে লেখা— আগামী বলছে দেখতে আসবো তোকে। পাশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি। অবশ্যই ভোটের আগে টাঙানো।

তিন সপ্তাহের মধ্যে একেবারে হযবরল, ঘেটে ঘঁ হয়ে যাওয়া মমতার ‘আগামী’ একেবারে বিপন্ন। তাঁকে দেখতে যাওয়ার লোক নেই। তাঁর তৃণমূল কংগ্রেসের ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে অনেক প্রশ্নেরই উত্তর মিলছে না। তার মধ্যে প্রথম প্রশ্ন, উত্তরবঙ্গের চা বলয়ে প্রচুর বিতর্কিত কাজ করে কুখ্যাত হয়ে ওঠা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে অনেক সিনিয়ার বিধায়ক কীভাবে নেতা মেনে নিলেন? উদ্ধত ঋতব্রতর সাংগঠনিক দক্ষতা যে কী চূড়ান্ত হতাশাজনক, সে তো আলিপুরদুয়ার-শিলিগুড়ির লোকেরা ভালো করে জানেন। দল যে দায়িত্ব দিয়েছিল, সবগুলোতে ফ্লপ।

এটা এখন পরিষ্কার, তৃণমূল ভাঙার পেছনে বিজেপির অপারেশন বড় কাজ করেছে। মহারাষ্ট্রে দুটো পরিবারকেন্দ্রিক দল (২০২২ সালে শিবসেনা, ২০২৩ সালে এনসিপি) ভাঙা হয়েছিল একরকম ছকে। ২০১৪ সালে অরুণাচলের পুরো কংগ্রেসই চলে যায় বিজেপিতে। অসমে ২০১৫ সালে একই কাজ হয় হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে নিয়ে। মণিপুর যা দেখে ২০১৭ সালে। কর্ণাটকে একবার কংগ্রেস-জনতা দলের ১৬ জন বিধায়ক চলে যান বিজেপিতে। মধ্যপ্রদেশে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া ২২ কংগ্রেস বিধায়ক ভাঙিয়ে সরকারের পতন ঘটান, চলে যান বিজেপিতে। কংগ্রেসের ৮ বিধায়ক একই দৃশ্য দেখান গোয়ায়।

হয় টাকা নাও, আমাদের দলে এসো কিংবা জেলে পচার জন্য তৈরি হও। এই বার্তা দিয়ে, দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের টেনে বড় বড় অপারেশন করেছে বিজেপি। কলকাতাতে তারা বসেই বা থাকবে কেন বিপক্ষের সীমাহীন দুর্বলতা দেখে? আমরা এতদিন বলতাম, বাঙালির রাজনীতিতে সামান্যতম আদর্শবোধ রয়েছে। বাঙালি একটু ব্যতিক্রমী। এই ঘটনা বোঝাল, আয়ারাম গয়ারাম রাজনীতিতে বাংলা অন্য রাজ্যকে টেক্কা দেবে। বাঙালি এতদিনে প্যান ইন্ডিয়ান হয়েছে। মিরজাফর ইন, মিরমদন আউট। বিশ্বাসঘাতকতা ইন, আনুগত্য আউট।

এসব ছাপিয়ে আপাতত বড় হয়ে উঠছে মমতার এই প্রাণের দলের বালির ঘরের মতো ভেঙে পড়া। পুরো দলটা এমনভাবে দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন, এমনভাবে ক্ষমতার মোহে নেশাগ্রস্ত, সমর মুখোপাধ্যায়, জাভেদ খান, অরূপ রায়, চন্দ্রনাথ সিংহ, সাবিনা ইয়াসমিন, শিউলি সাহার মতো সিনিয়াররাও ঋতব্রতর মতো ধান্দাবাজকে ধরে বাঁচতে চাইছেন। মমতা-অভিষেকের দয়ায় সবে নাম লেখানো প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ও। ঋতব্রত নিশ্চয়ই জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া বা হিমন্ত বিশ্বশর্মা নন। শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় সততার দাঁড়িপাল্লায় বহু উঁচুতে ঋতব্রতর তুলনায়। শোভনদেব বনাম ঋতব্রত নিয়ে চুলচেরা হিসেব আজকের বাঙালি ভাবে না।

মমতার দুধকলা দিয়ে পোষা কালসর্পদের একমাত্র লক্ষ্য, নিজেদের দুর্নীতি চাপা দেওয়া। বহু নেতার নামেই এফআইআর। জানেন, মমতা-অভিষেক থেকে দূরত্ব রচনা করলেই বিজেপির কাছ থেকে ছাড় পাওয়া যাবে। এঁদের সত্যিই যদি দলে থেকে বিদ্রোহ করার ইচ্ছে থাকত, তা হলে এঁরা দলবেঁধে আগে যেতেন মমতার কাছে। স্পিকারের কাছে নয়। বিধ্বস্ত মমতার পক্ষে আরও দুটো চরম লজ্জার ব্যাপার। তার এক ঝাঁক মুসলিম বিধায়ক পর্যন্ত পদ্মগন্ধে অস্থির হয়ে তাঁর দিক থেকে মুখ ঘুরিয়েছেন। মমতার বিরুদ্ধে এত মুসলিম তোষণের অভিযোগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া শূন্য। আর একটা ঘটনা, তাঁর বিস্তৃত সাংসদকুল একেবারে হাওয়া। ভ্যানিশ তো ভ্যানিশ।

হালে যাঁদেরকে রাজার হালে রাজ্যসভার সাংসদ করলেন, সেই কোয়েল মল্লিক, রাজীব কুমার, মেনকা গুরুস্বামীরা পর্যন্ত দুঃসময়ে মমতার ছায়া মাড়াচ্ছেন না। কোয়েলের মতোই সাগরিকা ঘোষ আখের গুছিয়ে অদৃশ্য। বাবুল সুপ্রিয় এক-দু’বার দেখা দিয়ে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরছেন। দেব, শতাব্দী রায়, সায়নী ঘোষ কোথায়? কোথায় সৌগত রায়? বিধায়কদের দল ভাগাভাগির খেলায় এঁদের কোনও মন্তব্যই নেই। ঘরে বসে মজা দেখছেন। সমস্যাটা শুধু বিধায়কদের নিয়ে নয়, সাংসদদের নিয়েও। মোদি-শা’র বিধায়কদের নিয়ে মাথাব্যথা নেই। আসল লক্ষ্য সাংসদ ভাঙানো। সেই খেলাও শুরু হবে অতি দ্রুত।

বাংলার বিভিন্ন শহর ও গ্রামে জয়ী তৃণমূল বিধায়কদের নামে দেওয়াল লিখনগুলো এখনও রয়েছে। তাঁদের সবার নামের আগে ঝুলছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। মমতার আশীর্বাদধন্য জাতীয় কিছু লেখা, ছবি। সেই লেখাগুলো দেখলে বিধায়ক-সাংসদদের নিজেদের প্রতি লজ্জা হবে না? এটা তো এমন নয়, মমতার আমলে শুধু চুরি, দুর্নীতি হয়েছে। এর পাশাপাশি কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, স্বাস্থ্যসাথী, রূপশ্রীর কাজ হয়েছে। কলকাতা সহ বড় শহরে আলোর প্রলেপ পড়েছে। এই কথাগুলো সোচ্চারে পালটা বলার মতো সাংসদ-বিধায়কও মমতার হাতে নেই। সবাই ঘরবন্দি, মুখে তালা।

এমনিতে বঙ্গীয় রাজনীতি এই মুহূর্তে সারা ভারতে হাসির খোরাক। একইসঙ্গে অত্যন্ত জটিল এবং অত্যন্ত সরল। মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূলের প্রাক্তন। বিরোধী নেতাও প্রাক্তন তৃণমূল। মন্ত্রীরা অনেকে প্রাক্তন তৃণমূল। ওদিকে ১৫ বছর শাসনকর্তা থাকা তৃণমূল দলটাই কার্যত উঠে যাওয়ার মুখে। মমতাই প্রতীকহীন। তাঁর সঙ্গে জোড়াফুলের ছবি আর মেলানো যাবে না।

আর ওদিকে ডিম্ভাত খাওয়া ভুলে রাজনীতিতে ব্যস্ত বাঙালি ডিম ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত। বৃহস্পতিবার টালিগঞ্জের সিনেমাপাড়াতেও দুই পক্ষের মহিলারা ডিম ছোড়াছুড়ি করলেন। ভয় আউট, ভরসা ইনের বদলে ইট আউট, ডিম ইন হয়ে গিয়েছে! ডিম ইন, গানও ইন। মমতা তো গাইতেনই, এখন অগ্নিমিত্রা পাল গাইছেন, দিলীপ ঘোষ গাইছেন, দোলা সেন গাইছেন। রাজ্যে এত মন্ত্রী, নেতা নির্বাচনের পর জেলে, তাঁদের নাম মনে রাখা কঠিন। এঁদের পাশে দাঁড়ানোর মতো নেতা বা কর্মী তৃণমূলে নেই। সুবিধেভোগীরাও নেই। মাঝ থেকে নব্য বিধায়করা সুজিত বসু, রথীন ঘোষদের পরিস্থিতি দেখে ভয়ে কাঁটা। কারও বিরুদ্ধে বিপুল সম্পত্তি বাড়ানোর অভিযোগ, কারও বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ, প্রশাসনে বেআইনি হস্তক্ষেপের অভিযোগ। তাই সবাই মিলে গুটি গুটি ঋতব্রতর পিছনে। তাঁদের ভোটারদেরই ভাবা উচিত, কাকে তাঁরা রাজার ভার দিয়েছেন। জাভেদ খানের মতো প্রচুর বেআইনি সম্পত্তির মুসলিম নেতারা তো আরও কলঙ্কের। একবার বেআইনি সম্পত্তিতে বুলডোজার চলেছে। তাতেই কেঁপে অস্থির দাপুটে নেতা। ভুলে গিয়েছেন ভোটারদের প্রতি তাঁদের দায়িত্ববোধ। ভুলে গিয়েছেন, এতদিন ধরে বিজেপি সম্পর্কে তাঁরা কী বলেছেন, বিজেপি এতদিন তাঁদের সম্পর্কে কী বলেছে।

বিধানসভায় এবারই দেখা গিয়েছে, কত বিধায়ক বাংলা দেখে দেখে বলতে হোঁচট খাচ্ছেন। তা খান। মমতার এই কালসর্প বিধায়করা এখন শঙ্খ ঘোষের বিখ্যাত লাইন বলার চেষ্টা করতে পারেন- ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’। যদিও এঁদের ছাড়া ছাড়া তীব্র পরস্পরবিরোধী কথা শুনে প্রশ্ন জাগে, এঁরা অনেকেই জানেন না ভবিষ্যতে কী করবেন। নিজেকে বাঁচাতে দলে পড়ে চলে এসেছেন ঋতব্রতর পিছনে। যদি প্রাক্তন তৃণমূল দাদার ভরসার হাত পিঠে পড়ে!

এখন দেখতে চাই, শুধু মমতাকে দেখে যাঁরা তাঁর এই কালসর্পদের ভোট দিয়েছিলেন, সেই ভোটাররা কেন্দ্রে কী নিয়ে অপেক্ষা করেন। ফুল না ডিম না গান!



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *