সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণ যে রূপ নিয়েছে, তা নজিরবিহীন বললেও কম বলা হয়। রাজ্যের প্রধান বিরোধীপক্ষ কে- এই প্রশ্নের উত্তর এখন গোলকধাঁধায়। খাতায়-কলমে তৃণমূল ৮০ আসনে জিতে প্রধান বিরোধী দল হওয়ার কথা। কিন্তু দলের অভ্যন্তরীণ ফাটল সেই অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ৫৮ জন বিধায়ক নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করেছেন। বিধানসভার স্পিকারও ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি দিয়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াই তৃণমূলের ভবিষ্যৎকে চরম অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়েছে। তবে দলের অভ্যন্তরীণ ডামাডোলের চেয়েও বড় প্রশ্ন- বিজেপির বিরুদ্ধে রাজ্যের বিপুল সংখ্যক মানুষের রায়ের কি কোনও মূল্য থাকল?
গৃহযুদ্ধের জেরে জোড়াফুল শিবির কতটা কার্যকরভাবে শাসকদলের নীতি ও সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে পারবে, তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক পরিচয়ের সূচনা হয়েছিল বিরোধী রাজনীতির হাত ধরে। বামফ্রন্ট জমানায় তিনি নিজেকে বিরোধী নেত্রী হিসেবে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর সেই অবস্থান ফিরে পাওয়া কঠিন।
অন্যদিকে, মমতার বিরোধী রাজনীতির উত্তরাধিকার এগিয়ে নিয়ে যেতে ঋতব্রত যোগ্য কি না- সেই প্রশ্ন জনমানসে আছে। তৃণমূলের এই দুর্বলতার সুযোগে অন্য বিরোধী দলগুলি জমি শক্ত করতে পারবে কি? বিধানসভায় কংগ্রেস (২), সিপিএম (১), আইএসএফ (১) এবং আম জনতা উন্নয়ন পার্টির (২) আসন সংখ্যা নামমাত্র। এই দলগুলির সাংগঠনিক শক্তিও ভীষণভাবে সীমিত।
অবশ্য সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে সিপিএম হকার উচ্ছেদ ও নতুন বিজেপি সরকারের ‘বুলডোজার নীতি’র বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে। তাদের সেই প্রতিবাদী ভূমিকা সাধারণ মানুষের নজর কেড়েছে। ফলতা উপনির্বাচনে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসার পর বাম শিবিরে উল্লাস স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, একটি বা দুটি কেন্দ্রের সাফল্যকে পুঁজি করে বিজেপির মতো সুসংগঠিত শক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি লড়াই সম্ভব নয়।
‘রামের বিরুদ্ধে বামেরাই একমাত্র বিকল্প’- এই ন্যারেটিভ এখনও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। কংগ্রেসের ভূমিকাও আশাব্যঞ্জক নয়। তৃণমূলের ভাঙন নিয়ে প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব যতটা উল্লসিত, নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতাগুলি চিহ্নিত করে রাস্তায় নামতে ততটা তৎপর নয়। প্রদেশ সভাপতি শুভঙ্কর সরকার ও প্রাক্তন সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরী বার্তা দিয়েছেন, যাঁদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা কংগ্রেসে, তাঁদের জন্য দলের দরজা খোলা।
সেই ডাকে সাড়া দিয়ে ইতিমধ্যে উত্তরবঙ্গের মেখলিগঞ্জ পুরসভার চেয়ারম্যান সহ ৬ কাউন্সিলার কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। এতে কংগ্রেস তাৎক্ষণিক কিছু লাভ হয়তো পাবে। কিন্তু বিজেপির মতো সংগঠিত শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে যে সাংগঠনিক ক্ষমতার প্রয়োজন, তা এখনও অনেক দূরে। দীর্ঘদিনের ক্ষয়রোগ বা সাংগঠনিক পক্ষাঘাতে আক্রান্ত কংগ্রেস। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী রাজনীতি কার্যত ঘেঁটে ঘ হয়ে গিয়েছে।
প্রধান বিরোধী দলের চরম কোন্দল এবং বাকি বিরোধীদের নামমাত্র উপস্থিতি বিজেপির পথকেই মসৃণ করে দিচ্ছে। শাসক সবসময়ই চায় বিরোধী শিবির যেন দুর্বল ও খণ্ডবিখণ্ড থাকে। বিরোধীশূন্য বা দুর্বল বিরোধীর সুযোগে গণতন্ত্রে শাসক স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে। সমালোচনা এবং জবাবদিহির জায়গাটি হারিয়ে গেলে গণতন্ত্রের ভিতটাই নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় যে কোনও সরকারকে সাধারণ মানুষের রায় রূপায়ণের জন্য অন্তত ছয় মাস সময় দেওয়া উচিত। প্রশাসন পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনমুখী প্রকল্প নিয়ে নতুন সরকারের নীতি দেখার জন্য এই সময়টুকু আবশ্যক। তবে এই প্রাথমিক সময়কালের পর শক্তিশালী ও সুসংহত বিরোধী কণ্ঠস্বরের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে যে বিরোধীশূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত পূরণ না হলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পক্ষে শুভ হবে না।
