ধীরে ধীরে ধীরে বও ওগো উতল হাওয়া

ধীরে ধীরে ধীরে বও ওগো উতল হাওয়া

শিক্ষা
Spread the love


কিছু ক্ষেত্রে চটজলদি সিদ্ধান্ত নতুন সরকারকে বিব্রত করছে। তবে কর্মীদের দাদাগিরি থামানোয় অবিলম্বে রাশ টানা দরকার।

রূপায়ণ ভট্টাচার্য

ওই দৃশ্যগুলোই রীতিমতো আতঙ্কের। নাড়িয়ে দিয়ে যাওয়ার। ওই দৃশ্যগুলোই আসলে গো-বলয়ের পরিচিত ছবি। গো-বলয় বললে ওই জাতীয় সংলাপ এবং দৃশ্যাবলি আমরা ভেবে থাকি। অবাক করে দেয় যে সব। এসব হচ্ছে এই বাংলায়?

প্রথম দৃশ্য : রাজারহাট-নিউটাউনের একটি বাড়িতে হঠাৎ কয়েকজন তরুণ এসে বৃদ্ধ বাসিন্দাকে বলল, ‘এ বাড়িতে তোমার মেয়ের থাকা যাবে না। ও কেন হিন্দু হয়ে মুসলিমকে বিয়ে করেছে? হিন্দু পাড়ার মধ্যে থাকায় কালচার নষ্ট হচ্ছে। ওকে অন্য পাড়ায় চলে যেতে বলো। নইলে ধর্ম পালটে ফের হিন্দু হতে বলো।’ বিয়েটা যদিও দশ বছর হয়ে গিয়েছে।

দ্বিতীয় দৃশ্য : আরেকদল তরুণ ঢুকেছে আরেকটি বাড়িতে। এসেই জিজ্ঞেস করছে, উঠোনে তুলসী গাছের অবস্থা এত খারাপ কেন। বাড়ির কর্ত্রীকে জিজ্ঞেস করছে, আপনার বাড়ির ঠাকুরঘরটা দেখান। ঠাকুরঘরে গিয়ে প্রশ্ন হচ্ছে ঠাকুরকে ফুল দেননি কেন। তুলসী গাছে ফুল আসেনি কেন।

তৃতীয় দৃশ্য : উত্তরবঙ্গে রাস্তায় এক মুসলিম দোকানদারের দোকানে হাজির আরেক দল তরুণ। তারা হুমকি দিচ্ছে, আপনি যে মুসলমান সেটা আপনার হোর্ডিং-এ লেখা নেই কেন। কেন সাইনবোর্ডে অন্য নাম। এক্ষুনি লিখে দিন আপনার নাম।

চতুর্থ দৃশ্য : সুন্দরবনের দিকে দুই তরুণকে মারধর করতে করতে তাদের পোশাক খোলানো হচ্ছে। যে তরুণরা গেরুয়া পোশাক পরে দাদাগিরি দেখাচ্ছে, তাদের লক্ষ্য পোশাক খুলে ধর্ম পরীক্ষা।

এসব দেখতে দেখতেই মনে হবে আমরা কি সেই পশ্চিমবঙ্গেই আছি? নাকি গো-বলয়ের কোনও রাজ্যে? বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর বাংলাজুড়ে এই জাতীয় ঘটনা ঘটছে! নেতারা হয়তো জানেনই না, অনেক তরুণ পার্টির নাম করেই নেমে পড়ছে রাস্তায়! স্রেফ দাদাগিরি দেখাতে।

বোঝা যায়, প্রথম ক্ষমতা পেয়ে তারা উতল হাওয়ার মতো। ক্ষমতা পেয়েই কিছু বোঝাতে নেমে পড়া। তবে শুভেন্দু অধিকারী ও শমীক ভট্টাচার্যরা এই দাদা-ভাইদের রাশ এখনই না ধরতে পারলে তারা এক-একজন ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন হয়ে দাঁড়াবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় যা হয়েছে। এলাকার ভাইয়েরা স্বরূপ বিশ্বাসের মতো দাদাগিরি দেখিয়ে চলেছেন ক্রমাগত। এমএলএ, কাউন্সিলার কেউ না হওয়া সত্ত্বেও। এসব দেখেও মমতা আর অন্য নেতারা চোখ বন্ধ করে থেকেছেন। কোনও ব্যবস্থা নেননি। মানুষ প্রতিশোধ নিয়েছে ইভিএমে।

মমতা যখন তৃতীয়বারের জন্য ভোটে নেমেছিলেন, তখনও পর্যন্ত মানুষ দিয়েছে। ৫ বছর আগে যখন উত্তরবঙ্গের রাস্তায় ঘুরেছি, তখন একটা কথা বলতে শুনতাম বহু মানুষকে, ‘দিদি ভালো, ভাইগুলা খুব খারাপ।’ মানুষ একটা সময় পর্যন্ত এই ‘ভাইগুলা’র দাদাগিরি সহ্য করেছে। তারপর কিন্তু আর দিদির জন্য বিন্দুমাত্র সহানুভূতি কাজ করেনি পাঁচ বছর পরে। ভাইদের বিপুলা সম্পত্তি উপচে উঠছে দেখে। দুষ্টু গোরু রাখতে গিয়ে গোয়াল শূন্য করে ফেলেছেন মমতা। তাঁদের অনেকে আজ নানা কথার মারপ্যাঁচ দিয়ে রাজনীতি থেকে অবসর নিচ্ছেন সাধারণ কর্মীকে অনাথ করে— এও তো এক ধরনের দুর্নীতি। সদ্য ক্ষমতায় আসা বিজেপি নেতাদের এই ভাইদের নিয়েই সাবধান হওয়া উচিত অতি দ্রুত।

এখনও পর্যন্ত আগের জমানার অনেক দাদা-কে জেলে ভরা হয়েছে। কাউকে কাউকে তো অন্তর্বাস পরিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে থানায়। মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে কি না সেই প্রশ্ন উঠেছে পর্যন্ত। তবে আগের যে চারটি ঘটনার উল্লেখ করলাম, সেখানে দাদাগিরি দেখানোর লোকগুলোর তেমন কিছু হয়নি। বিজেপির সঙ্গে জড়িত নানা সংগঠনের নাম করে অনেক তরুণই এখন নিজের স্বার্থে দাদাগিরি শুরু করেছে। ক্ষমতা পেতে, ক্ষমতার স্বাদ পেতে, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে বাংলার তরুণ সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মুখ এখন মরিয়া। এটা এদের বহু বছরের রোগ। শুভেন্দু-শমীকরা এ নিয়ে সতর্ক না থাকলে এরাই বিরক্তির কারণ হবে জনতার।

বিজেপি সরকারের প্রথম এক মাসে আরও চারটি ঘটনা মানুষের চর্চায় আসছে বারবার। এক, বুলডোজার দিয়ে বিভিন্ন স্টেশনে হকার উচ্ছেদ। বেআইনি নির্মাণ ভাঙা। দুই, অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের যোগ্যতামান নিয়ে বিভ্রান্তি। তিন, গোরু বিক্রি নিয়ে নিষেধাজ্ঞায় হিন্দু সমাজেরই সমস্যা। চার, বেসরকারিভাবে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করে বাংলাদেশিদের সেখানে রাখা। বা ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া বেসরকারিভাবে।

সব কাজই যেন বড় তাড়াহুড়োয় শুরু করে দেওয়া। মাঝে আবার বড় বিরতি, তারপর কী হবে স্পষ্ট নয়। এখন সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই দেখা যাচ্ছে, স্টেশনের ভাঙা স্টলের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে মালগাড়ি চলে যাচ্ছে। এমন ছবি বাংলা বোধহয় প্রথম দেখল। প্রশ্ন হচ্ছে. বেলঘরিয়া বা দমদমে যদি জোর করে হকার উচ্ছেদ হতে পারে, যাদবপুর বা বাঘা যতীন স্টেশনে তা বন্ধ হয়ে গেল কেন। মালদা স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মেই যেভাবে আরপিএফ অফিসের পাশে একটি কালী মন্দির দিনের পর দিন দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে বেড়ে উঠছে, তা ভাঙার নির্দেশিকা জারি হল না কেন। শিলিগুড়ি, মালদা, জলপাইগুড়ি সহ বহু জায়গায় রেলের জমি দখল করে থাকছে অসংখ্য মানুষ। সেই জমি উদ্ধারের কী হল, সেটাও জনতা চাইতে পারে হকার উচ্ছেদের ক্ষেত্রে এত তাড়াহুড়ো দেখে।

এক যাত্রায় আবার পৃথক ফল দেখা যাচ্ছে হকার উচ্ছেদের উদাহরণে। সল্টলেকের মতো জায়গায় বিধায়ক সক্রিয় হয়ে বেআইনি দোকান তুলে দিচ্ছেন। শহরের অন্য জায়গায় কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। নিউ কোচবিহার স্টেশনে যাওয়ার রাস্তায় যদি হকারদের দোকান ভাঙা হয়, অন্য স্টেশনের ক্ষেত্রে তা হবে না কেন?

কলকাতায় বেআইনি হকারদের স্বর্গরাজ্য ধর্মতলা, নিউ মার্কেট। সেখানে ফুটপাথ দখল করে মেট্রো স্টেশনে ঢোকা পর্যন্ত বন্ধ করে রেখেছেন বেআইনি হকাররা। শহরের সবচেয়ে ঐতিহাসিক হোটেল, মার্কেটে ঢোকা দায়। গেট দখল হকারদের। তা সেই এলাকায় প্রথম দিন বুলডোজার এসে ভেঙে দিল তৃণমূলের পার্টি অফিস। চারদিকে ধন্য ধন্য। তারপর কিন্তু সেখানে হকার উচ্ছেদের কিছুই হয়নি। তা হলে হাওড়া, শিয়ালদা, সল্টলেকে হকারদের তুলে দেওয়া হল কেন রাতারাতি?

নিয়ম পালনের মধ্যে একটা সামঞ্জস্য না থাকলে ভবিষ্যতে নতুন প্রশাসনই কিন্তু সমস্যায় পড়বে। মমতা এসব পারেননি। ধীরে ধীরে ভাইতন্ত্র দাদাগিরিতন্ত্র ঘিরে ফেলেছে তাঁকে। তাঁর ভালো কাজগুলো চাপা পড়ে গিয়েছে সে সবের কাছে। এমন দৃশ্য দেখেই বলা, সবকিছু ধীরে সময় নিয়ে করা ভালো। তাড়াহুড়ো হলে সমস্যাই হবে।

সমস্যা যে হবে, তার প্রমাণ অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের বারো পাতার ফর্ম। সমস্যা যে হবে, তা বোঝা যাচ্ছে কোমরে দড়ি বেঁধে প্রকাশ্যে ঘোরানো নিয়ে হাইকোর্টের প্রশ্ন তোলা দেখে। সমস্যা যে হবে, তার প্রমাণ অন্য একটা চালু জায়গাকে ডিটেনশন ক্যাম্প বানিয়ে দেওয়া। সেখানে যাদের রাখা হয়েছে, তাদের নিয়ে হিমসিম দশা হতে বাধ্য।

বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের এভাবে ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখার ব্যাপারটা প্রথম চালু করেছিলেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। এবার ভোটের আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বেশ হতাশভাবে যা বলেছেন, তার মর্মার্থ খুব বেশি বাংলাদেশিকে ওপারে পাঠানো যায়নি পাঁচ বছরেও। তিনি পাঁচ বছর রাজ করার আগে ওখানে বিজেপিরই মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন— সর্বানন্দ সোনোয়াল। হিমন্ত সেখানে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে চুক্তি নেই ঘুসপেটিয়াদের ফেরত দেওয়ার। তাই এখানে লোক দেখলে আমরা অন্ধকারে এমন একটা জায়গায় ওদের নিয়ে যাই, যেখানে বাংলাদেশি রক্ষী নেই, কাঁটাতার নেই। তারপর লাথি মেরে ওদের ওদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয় জোর করে।’ সেই লোকদের অনেকেই যে আবার ভারতে ফিরে আসে, তা মেনে নিয়েছিলেন হিমন্ত।

এমন প্রেক্ষাপটেই মনে হয়, এই দীর্ঘদিনের জটিল সংকট মেটাতে অনেক ভাবনাচিন্তা করে সমস্যা মেটানো জরুরি। হকার উচ্ছেদ, বেআইনি নির্মাণ ভাঙার মতো এখানেও দরকার অনেক ভাবনাচিন্তা, সমীক্ষা, তারপর সমাধান। এখনই দ্রুত হাততালি পাওয়ার থেকে বেশি জরুরি পাঁচ বছর পর গণহাততালি কুড়োনো।

দ্রুত হস্তক্ষেপ দরকার তাহলে কোথায়? ধর্মকে কেন্দ্র করে ভাইদের দাদা হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে অবিলম্বে রাশ টানা দরকার। বাংলা যদি দ্রুত গো-বলয় হওয়ার পথ ধরে, তা হলে তা হবে সত্যিই মর্মান্তিক।

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *