হঠাৎ মুখ বেঁকে যাওয়া বা কথা জড়িয়ে যাওয়াকে সাময়িক সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাচ্ছেন না তো? এটি হতে পারে ‘টিআইএ’ বা মিনি স্ট্রোকের পূর্বাভাস। উপসর্গ সেরে গেলেও বিপদ কিন্তু কাটে না, বরং তা বড় ধরনের স্ট্রোকের আগাম সংকেত দেয়। তাই একটুও দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। লিখেছেন শিলিগুড়ির রুদ্রাক্ষ সুপারস্পেশালিটি কেয়ারের নিউরোলজিস্ট ডাঃ জয়দীপ দে।
সম্প্রতি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন কলকাতার এক জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী। রাতে কথা বলার সময় হঠাৎ তাঁর ঠোঁট বেঁকে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে তঁাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানান, তঁার টিআইএ হয়েছে। কিন্তু রোগটা আদতে কী?
ট্রানজিয়েন্ট ইসকেমিক অ্যাটাক বা টিআইএ (TIA) হল মস্তিষ্ক, চোখ বা মেরুদণ্ডের কোনও অংশে সাময়িকভাবে রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়ার ঘটনা, যার ফলে হঠাৎ স্ট্রোকের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। রক্তপ্রবাহ দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে গেলে উপসর্গও সম্পূর্ণভাবে সেরে যেতে পারে এবং স্থায়ী মস্তিষ্কের ক্ষতি না-ও হতে পারে।
এই কারণেই সাধারণ মানুষের কাছে টিআইএ ‘মিনি স্ট্রোক’ নামে পরিচিত। কিন্তু এই শব্দটি কিছুটা বিভ্রান্তিকর, কারণ টিআইএ মোটেই তুচ্ছ ঘটনা নয়। বরং এটি ভবিষ্যতে বড় স্ট্রোকের ঝুঁকি সম্পর্কে একটি জরুরি সতর্ক সংকেত দেয়।
লক্ষণ
হঠাৎ করে
- মুখের একপাশ বেঁকে যাওয়া
- একটি হাত বা পায়ে দুর্বলতা বা অবশ ভাব
- কথা জড়িয়ে যাওয়া বা কথা বলতে না পারা
- অন্যের কথা বুঝতে অসুবিধা
- এক বা দুই চোখে হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া
- হঠাৎ ভারসাম্য নষ্ট হওয়া বা হাঁটতে সমস্যা
- কখনও হঠাৎ দ্বৈতদৃষ্টি বা তীব্র মাথা ঘোরানো
মনে রাখবেন, উপসর্গ দেখা দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে আপনি সুস্থ হয়ে উঠলেও অপেক্ষা করা যাবে না বা রোগটিকে অবহেলা করা উচিত নয়।
কেন টিআইএ হয়
টিআইএ’র পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবিটিস, কোলেস্টেরল বৃদ্ধি, ধূমপান, স্থূলতা, ক্যারোটিড ধমনীতে সংকোচন এবং হৃদযন্ত্রের কিছু সমস্যা – বিশেষ করে অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন বা অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। তাই টিআইএ হওয়ার পর শুধু উপসর্গ চলে যাওয়াই যথেষ্ট নয়। কেন টিআইএ হল, সেটি খুঁজে বের করাই চিকিৎসার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
কী পরীক্ষা প্রয়োজন
রোগীর পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসক সাধারণত মস্তিষ্কের এমআরআই/সিটি, মস্তিষ্ক ও ঘাড়ের রক্তনালির পরীক্ষা, ক্যারোটিড ডপলার, ইসিজি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দীর্ঘসময় ধরে কার্ডিয়াক রিদম মনিটরিং এবং ইকোকার্ডিওগ্রাফি করতে পারেন। এর উদ্দেশ্য ভবিষ্যৎ স্ট্রোকের কারণ চিহ্নিত করা।
চিকিৎসা
চিকিৎসা নির্ভর করে টিআইএ’র কারণের ওপর। কারও ক্ষেত্রে অ্যান্টিপ্লেটলেট ও কোলেস্টেরল-লোয়ারিং ট্রিটমেন্ট প্রয়োজন হতে পারে, আবার অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশনের মতো হৃদযন্ত্রজনিত কারণ থাকলে অ্যান্টিকোয়াগুলেশন প্রয়োজন হতে পারে। ক্যারোটিড ধমনীতে উল্লেখযোগ্য সংকোচন থাকলেও বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
সংগীতশিল্পীর দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর ঘটনা সাধারণ মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। মুখ বেঁকে যাওয়া, হাত-পা দুর্বল হওয়া বা কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গকে গ্যাস, ক্লান্তি বা সাময়িক সমস্যা ভেবে বাড়িতে বসে থাকা বিপজ্জনক।
টিআইএ’র উপসর্গ চলে গেলেও বিপদ শেষ হয়েছে – এমনটা ভাবা ঠিক নয়। এটি ভবিষ্যৎ স্ট্রোকের সতর্ক সংকেত হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা ও কারণ নির্ণয়ের মাধ্যমে সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। আবারও বলছি, ‘Signs gone’ মানেই ‘hazard gone’ নয়। সুতরাং, স্ট্রোকের লক্ষণ চিনুন, সময় নষ্ট করবেন না, দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছান।

