রুমি বাগচী, লস অ্যাঞ্জেলেস: পাহাড়ের গায়ে সাদা অক্ষরে লেখা ‘হলিউড’, আর তার ঠিক অদূরেই নাসার সুবিশাল মানমন্দির (World Cup Soccer Fever Hollywood)। এই জোড়া কীর্তির শহরে অন্য কিছু নিয়ে মাতামাতি হওয়ার অবকাশ কোথায়! কিন্তু ফিফা বিশ্বকাপ যেন সেই অলিখিত নিয়মটাই বদলে দিল। যে শহরের ধমনীতে বয়ে চলে সেলুলয়েডের স্বপ্ন, যেখানে রেড কার্পেটে মেপে পা ফেলাতেই লুকিয়ে থাকে গ্ল্যামারের ছটা, সেই বিনোদনের রাজধানী গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মেতে উঠেছিল ফুটবলের নিখাদ রোমাঞ্চে। লস অ্যাঞ্জেলেসে বিশ্বকাপের সব খেলা ইতিমধ্যে শেষ, কার্নিভাল এখন পাড়ি দিয়েছে পূর্ব উপকূলে। রবিবার নিউ জার্সিতে শিরোপার লড়াই, আর তার আগেই ওয়ার্নার ব্রাদার্স বা ইউনিভার্সাল স্টুডিওর এই উপত্যকায় ফেলে আসা ফুটবলের এই ব্লকবাস্টার ফিরে দেখায় মগ্ন সবাই।
বিগত কয়েক দশক ধরে মার্কিন মুলুকে ফুটবল ছিল মূলত ড্রয়িংরুমের হালকা বিনোদন। কিন্তু এবারের ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। অস্কারের লাল গালিচার যাবতীয় আলো আর জৌলুস একাই শুষে নিয়েছিল স্টেডিয়াম। আর এই উন্মাদনায় শামিল হতে হলিউডের প্রথম সারির তারকারা এবার ভিড় জমিয়েছিলেন গ্যালারিতে। এটা কোনও সাধারণ জনসংযোগের চমক ছিল না। বেভারলি হিলসের বিলাসবহুল ভিলা থেকে বেরিয়ে রোলস রয়েস বা ল্যাম্বরগিনি হাঁকিয়ে তারকারা যখন মাঠে আসতেন, পরনে কোনও ডিজাইনার গাউন বা টাক্সিডো থাকত না। বদলে গায়ে উঠত স্রেফ প্রিয় দলের জার্সি।
আমেরিকা বনাম তুরস্কের ম্যাচে যেমন গায়ে মার্কিন জার্সি চাপিয়ে গ্যালারি মাতিয়েছিলেন ব্র্যাড পিট, সঙ্গী ছিলেন তাঁর বন্ধু এডওয়ার্ড নর্টন। লস অ্যাঞ্জেলেসে আমেরিকার উদ্বোধনী ম্যাচে ভিআইপি বক্সে বসে নব্বই মিনিটের চিত্রনাট্য গিলেছিলেন খোদ টম ক্রুজ। রবিবার নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সিতে ফাইনালের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে তিনি নাকি রুদ্ধশ্বাস কোনও স্টান্টও করবেন। প্যারিস হিলটন এসেছিলেন নব্বইয়ের দশকের মার্কিন রেট্রো ডেনিম জার্সিতে। আর অভিনেতা চ্যানিং ট্যাটাম তো রীতিমতো নরওয়ের স্ট্রাইকার আর্লিং ব্রাউট হাল্যান্ড সেজে মাঠে হাজির হয়েছিলেন! অন্যদিকে, কানাডার ম্যাচে গলা ফাটিয়েছিলেন রায়ান রেনল্ডস। ডালাসে আবার ফ্রান্স-স্পেন মহারণ দেখতে হাজির হয়েছিলেন টিমোথি শ্যালামে। লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও ভিড়ের মাঝে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করলেও, তাঁর বন্ধু টোবি ম্যাগুয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে এসে সমর্থন জুগিয়েছেন।
ঠিক এখানেই হলিউড তারকাদের আভিজাত্য আর ইগোর এক অদ্ভুত রূপান্তর ঘটেছিল। এবারে তাঁরা ছিলেন নিছকই দর্শক। অস্কারের মঞ্চে যিনি সিনেমার শিল্পগুণ নিয়ে গম্ভীর বক্তৃতা দেন, তাঁকেও দেখা গেল পেনাল্টি মিসে সাধারণ ফ্যানের মতো মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়তে। বিকেলের আভিজাত্যে মোড়া ককটেল পার্টিগুলোর আলোচনার বিষয়বস্তু পালটে গিয়ে দাঁড়িয়েছে অফসাইড আর ভিএআরের চুলচেরা বিশ্লেষণে।
সিনেমার চিত্রনাট্যে যে ক্লাইম্যাক্স ফুটিয়ে তুলতে মিলিয়ন ডলার খরচ করতে হয়, ফুটবল মাত্র নব্বই মিনিটে সেই টানটান ক্লাইম্যাক্স তৈরি করে ফেলে। লস অ্যাঞ্জেলেসের পাট চুকিয়ে রবিবার মেটলাইফে পর্দা নামবে এবারের বিশ্বকাপের। অস্কারের শহর হয়তো আবারও ব্যস্ত হয়ে পড়বে সোনার পুতুলের খোঁজে। তবে এই গ্রীষ্মে ফুটবল প্রমাণ করে দিল, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘শো-ম্যান’-রা আসলে মাঠের ওই এগারোজনই।

