উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ দেশজুড়ে শুরু হওয়া বহু প্রতীক্ষিত ষোলোতম জনগণনার (West Bengal Census 2026) কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে গেল পশ্চিমবঙ্গেও। শনিবার পূর্বঘোষণা অনুযায়ী সকাল ১০টায় নবান্নে বসে অনলাইনে মোট ৩৩টি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ‘স্ব-শুমারি’ বা সেলফ এনুমারেশনের (Self-Enumeration) মাধ্যমে রাজ্যে এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার সূচনা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এ বারের জনগণনার মূল ট্যাগলাইন হলো— ‘জনগণের জনকল্যাণ’। রাজ্যের সাধারণ মানুষকে এই ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেওয়ার এবং জনগণনাকর্মীদের সম্পূর্ণ সহযোগিতার অনুরোধ জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
দেশের ইতিহাসে এই প্রথম সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে জনগণনা হচ্ছে, যার মধ্যে ‘স্ব-শুমারি’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নতুন সংযোজন। এ দিনের সূচনা পর্বের পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনগণনার গোটা সময়সূচি ও পদ্ধতি তুলে ধরা হয়েছে:
- স্ব-শুমারি পর্ব: ১ অগাস্ট থেকে ১৫ অগাস্ট পর্যন্ত রাজ্যবাসী ঘরে বসে অনলাইনেই নিজেদের পরিবারের সমস্ত সদস্যের তথ্য নির্দিষ্ট পোর্টালের মাধ্যমে দাখিল করতে পারবেন।
- বাড়ি বাড়ি তথ্য যাচাই: আগামী ১৬ অগাস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জনগণনার কাজে নিযুক্ত সরকারি কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নাগরিকদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে প্রকৃত তথ্য মিলিয়ে দেখবেন। প্রয়োজনে ঘটনাস্থলেই তা সংশোধনের সুযোগ থাকবে।
- মোবাইল অ্যাপের ব্যবহার: গণনাকারীদের জন্য বিশেষ মোবাইল অ্যাপের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সংগৃহীত সমস্ত তথ্য সরাসরি কেন্দ্রীয় সার্ভারে আপলোড করা হবে। এর ফলে কাগজের ব্যবহার বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া হবে আরও দ্রুত, নির্ভুল ও স্বচ্ছ।
নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস বা অপব্যবহার হওয়া নিয়ে যাতে কোনো বিভ্রান্তি না থাকে, সে বিষয়ে কড়া আশ্বস্ত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, “রাজ্যবাসীর দেওয়া তথ্য সম্পূর্ণ গোপন এবং আইনগতভাবে সুরক্ষিত থাকবে। একমাত্র পরিসংখ্যান, পরিকল্পনা এবং উন্নয়নের জন্যই তা ব্যবহার করা হবে। ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ বা অপব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই।”
অনলাইনে এই স্ব-শুমারিতে নাগরিকদের মোট ৩৩টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত পরিচয়, পরিবারের সদস্য সংখ্যা, শিক্ষা, পেশা, বাসস্থানের বিবরণ-সহ একাধিক জরুরি তথ্য। বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই প্রথম জনগণনায় জাতিভিত্তিক তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, এর ফলে সাধারণ মানুষ সরাসরি জাতিগত সুবিধা পাবেন এবং তাঁদের আর আলাদা করে লাইনে দাঁড়াতে হবে না। এই জাতিগত তথ্যের মাধ্যমে একটি স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান তৈরি হবে। পূর্বতন সরকারের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, বিগত সরকার সময়মতো এই কাজ শুরু না করলেও বর্তমান সরকার একে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে।
এদিনের বক্তব্যে এসআইআর তালিকা এবং অনুপ্রবেশ ও শরণার্থী সংক্রান্ত বিতর্ক নিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। যাঁদের নাম এসআইআর তালিকায় বিবেচনাধীন রয়েছে, তাঁরা ‘স্ব-শুমারি’ করতে পারবেন কি না— এই প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এই বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশিকা রয়েছে। রাজ্যে প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষের নাম বিবেচনাধীন ছিল, যার মধ্যে কিছু নাম বাদ গেলেও প্রায় ৭ লক্ষ মানুষ ট্রাইবুনালে আপিল করেছেন এবং বাকি ২০ লক্ষ মানুষের তরফ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি।
এই প্রসঙ্গে কেন্দ্র ও রাজ্যের নীতি স্পষ্ট করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশ থেকে দু’ধরনের মানুষ এ দেশে এসেছেন— অনুপ্রবেশকারী এবং শরণার্থী। যাঁরা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, তাঁরা কোনোভাবেই এ রাজ্যে থাকতে পারবেন না এবং সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করে তাঁদের ফেরত পাঠানো হবে। আগের সরকারের আমলে বীরভূমে যে প্রশাসনিক ত্রুটি ঘটেছিল, তার পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে, শরণার্থীদের সুরক্ষা সম্পর্কে তিনি বলেন, সিএএ (CAA)-র আইন ও নিয়ম অনুযায়ী হিন্দু, শিখ, জৈন ও পারসিরা শরণার্থী হিসেবে পরিগণিত হন। ২০১৯ সালের আইন এবং ২০২৪ সালের বিধি অনুযায়ী, ধর্ম ও প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে এ রাজ্যে আসা শরণার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি মামলা হবে না এবং পুলিশ তাঁদের কোনোভাবেই হেনস্তা করতে পারবে না।

