শুভঙ্কর চক্রবর্তী
আলিপুরদুয়ার বিএড ট্রেনিং কলেজের জমি ও সম্পত্তি বেআইনিভাবে বিক্রি এবং আর্থিক দুর্নীতির মামলায় একাধিক বিতর্কে জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চের সদ্য প্রাক্তন অ্যাডিশনাল অ্যাডভোকেট জেনারেল জয়জিৎ চৌধুরী (Joyjit Chowdhury Alipurduar BEd Faculty Case)। তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি পদের অপব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। ‘প্রণাশা’ নামে একটি সোসাইটি আলিপুরদুয়ার বিএড ট্রেনিং কলেজ পরিচালনা করত। সোসাইটির পদাধিকারীদের মধ্যে ঝামেলার জেরে কলেজ নিয়ে কয়েক বছর আগে মামলা হয়েছিল। কলেজের সভাপতি হিসাবে মামলা করেছিলেন সজল সরকার। সেই মামলায় এনসিটিই-এর আইনজীবী ছিলেন জয়জিৎ। পরবর্তীতে ‘অশ্বিনী চৌধুরী এডুকেশনাল ট্রাস্ট’ কলেজের দায়িত্ব নেয়। দেখা যায় সেই ট্রাস্টের অন্যতম সদস্য ছিলেন জয়জিৎ। অর্থাৎ মামলার আইনজীবী হিসাবে কাজ করতে গিয়ে বকলমে কলেজের পরিচালক হয়ে বসেছিলেন প্রাক্তন অ্যাডিশনাল অ্যাডভোকেট জেনারেল। বিতর্কের শুরু সেখান থেকেই।
সোসাইটির হাত থেকে ট্রাস্টের হাতে কলেজ বিক্রি নিয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে ফের মামলা হয়। সেই মামলা এখনও চলছে। হাইকোর্টের (Calcutta Excessive Court docket) জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চে (Circuit Bench) মামলা চলাকালীন সেখানে অ্যাডিশনাল অ্যাডভোকেট জেনারেল হিসাবে দায়িত্বে ছিলেন জয়জিৎ। অর্থাৎ যিনি অভিযুক্ত তিনিই পদাধিকার বলে মামলার তদারকি করেছেন। তা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। শুক্রবার সার্কিট বেঞ্চে সেই মামলার শুনানি ছিল। তাতে কলেজের পক্ষ থেকে সওয়াল করেন জয়জিৎ। যিনি কলেজের হয়ে মামলা লড়ছেন তিনিই এনসিটিই-র হয়ে সওয়াল করছেন, বিষয়টি নজরে আসতেই তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিচারপতিরা। তারপরই মামলার আইনজীবী হিসাবে সরে গিয়ে নতুন আইনজীবী নিয়োগের অনুরোধ করেন তিনি।
না, এখানেই শেষ হয়। শুক্রবারের শুনানিতে সামনে এসেছে ভয়ংকর অভিযোগ। সরকারপক্ষের আইনজীবীরা জানান, কলেজের জমি এবং যাবতীয় সম্পত্তি বেআইনিভাবে আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে একটি চক্র কাজ শুরু করেছে অভিযোগ তুলে সজল ২০২২-এর ১৭ মে তারিখে আলিপুরদুয়ার জেলা পুলিশ সুপারের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগপত্রে প্রধান অভিযুক্ত হিসাবে নাম রয়েছে জয়জিৎ-এর। অভিযোগপত্রে একাধিক চাঞ্চল্যকর ও বেআইনি কার্যকলাপের অভিযোগ তোলা হয়। অভিযোগপত্রে বলা হয়, বিচারাধীন হওয়া সত্ত্বেও সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে প্রায় ৬ কোটি টাকার সম্পত্তি (জমি ও ভবন) মাত্র ১ কোটি ১৫ লক্ষ টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়। এত কম টাকায় সম্পত্তি বিক্রির নামে আসলে কলেজের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করার চক্রান্ত হয়েছিল বলেই অভিযোগ তোলা হয়। কিন্তু সেই অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও পদক্ষেপই হয়নি। কেন পুলিশ অভিযোগ পাওয়ার পরও পদক্ষেপ করেনি বা লিখিত অভিযোগকে এফআইআর হিসাবে গ্রহণ করেনি তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিচারপতিরা।
শুক্রবারের শুনানিতে বিচারপতি অমৃতা সিনহা এবং বিচারপতি অজয়কুমার গুপ্তের ডিভিশন বেঞ্চ পুলিশের এই চরম নিষ্ক্রিয়তায় উষ্মা প্রকাশ করে। আদালত স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, ২০২২ সালের মে মাসে পুলিশ সুপারের কাছে যে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল, তার ভিত্তিতে পুলিশ কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তা অবিলম্বে রিপোর্ট আকারে জমা দিতে হবে। রাজ্যের অ্যাডিশনাল অ্যাডভোকেট জেনারেলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আলিপুরদুয়ারের পুলিশ সুপারের কাছ থেকে এই সংক্রান্ত রিপোর্ট সংগ্রহ করে পরবর্তী সার্কিট বেঞ্চের শুনানিতে পেশ করার জন্য। সেই নির্দেশের কথা জানাজানি হতেই হইচই শুরু হয়েছে প্রশানিক ও আইনজীবী মহলে।
জয়জিৎ একদিকে কলেজ দুর্নীতির অভিযোগপত্রে থাকা অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তি, অন্যদিকে তিনিই আবার এই মামলার আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছেন, যা আইন ও বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে চূড়ান্ত নৈতিক অবক্ষয়ের এবং স্বার্থের সংঘাতের বড়সড়ো প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। জয়জিৎ অবশ্য দাবি করছেন তিনি কোনও বেআইনি কাজ করেননি। তাঁর বক্তব্য, ‘আইন মেনে সব কাজ করেছি। আইন মেন কলেজের দায়িত্ব ট্রাস্ট পেয়েছে। পদে থাকলেও কোনওভাবেই মামলার ক্ষেত্রে কোনও প্রভাব খাটাইনি। মামলার তদারকিও করিনি। আর এনসিটিই এবং কলেজের হয়ে একসঙ্গে মামলা লড়ার ক্ষেত্রে কোনও আইনি বাধা নেই। বিচারপতিদেরও সেকথা জানিয়েছি। আমি আইনের সীমারেখার মধ্যেই যা করার করেছি। বিচারপতিদের বলেছি আগামী শুনানিতে নতুন আইনজীবী সওয়ালজবাব করবেন।’
সার্কিট বেঞ্চের অ্যাডিশনাল অ্যাডভোকেট জেনারেল জাগৃতি মিশ্রের বক্তব্য, ‘পুলিশ সুপারের কাছ থেকে রিপোর্ট নিয়ে তা পরবর্তী শুনানিতে পেশ করা হবে। আমরা গোটা বিষয়টির উচ্চপর্যায়ের তদন্ত চেয়েছি। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বহু প্রশ্ন উঠেছে। আইনি নৈতিকতা নিয়েও নানা প্রশ্ন থেকে গিয়েছে।’ যেখানে তিনি নিজেই অভিযুক্ত এবং তাঁর নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ সরাসরি জড়িত সেই মামলাতে সরকারি কৌঁসুলি লড়তে বা তদারকি করতে পারেন কি না তা নিয়ে বড়সড়ো প্রশ্ন উঠেছে আলিপুরদুয়ার বিএড কলেজের মামলায়।

