UPI Expenses | ইউপিআইয়ে বাড়তি খরচের খাঁড়া, নগদে ফিরবে ডিজিটাল ইন্ডিয়া!

ভিডিও/VIDEO
Spread the love


নবনীতা মণ্ডল ও সাগর বাগচী, নয়াদিল্লি ও শিলিগুড়ি: হাতে নগদ নেই? সমস্যা কী! মোবাইল বের করুন, কিউআর কোড স্ক্যান করুন, টাকা পৌঁছে যাবে মুহূর্তেই। চায়ের দোকান থেকে মুদিখানা, টোটো থেকে ফুটপাথের সবজির দোকান- গত কয়েক বছরে উত্তরবঙ্গের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনের ছবিটাই বদলে দিয়েছে ইউপিআই। অথচ সেই ইউপিআই নিয়েই এবার নতুন করে চিন্তায় ব্যবসায়ীরা। ২ হাজার টাকার বেশি নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক লেনদেনে ০.৪ শতাংশ মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআর (MDR) চালুর সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই প্রশ্ন উঠছে, বাড়তি খরচটা শেষপর্যন্ত যাবে কার পকেট থেকে? ব্যবসায়ীদের একাংশের কথায় নতুন আশঙ্কা দানা বাঁধছে। তাঁরা খরচ বহন করলেও তার চাপ ঘুরিয়ে ক্রেতার উপর পড়তে পারে বলেই অনেকের মত (UPI Expenses)।

শুধু শিলিগুড়ি বা উত্তরবঙ্গ নয়, একই চর্চা দেশের অন্য প্রান্তেও। দিল্লির চাঁদনি চক, কনট প্লেস, জনপথ, কমলানগর, খান মার্কেট, নেহরু প্লেস ও সদর বাজারের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলির মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কমলানগর মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নীতিন গুপ্তার বক্তব্য, ব্যবসায়ীদের ইউপিআই ব্যবহারে আপত্তি নেই। কিন্তু জিএসটি সহ অন্যান্য খরচের সঙ্গে নতুন মাশুল যোগ হলে ছোট ব্যবসায়ীদের উপর চাপ বাড়বে। কোনও কোনও ব্যবসায়ী সংগঠন তাই প্রয়োজনে নগদ লেনদেন (Money) বাড়ানোর কথাও ভাবছে।

বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক চাপও তৈরি হয়েছে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধি ইউপিআইয়ের এই মাশুল প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। বুধবার সংসদের অর্থ বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠকেও কয়েকজন সাংসদ বিষয়টি তুলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বলে জানিয়েছেন কমিটির চেয়ারম্যান ভর্তৃহরি মহতাব। কমিটির সদস্য আরএসপি সাংসদ এনকে প্রেমচন্দ্রনের বক্তব্য, ‘২ হাজারের বেশি ব্যবসায়িক ইউপিআই লেনদেনে মাশুল বসানোর প্রভাব শেষপর্যন্ত দেশের মানুষের উপরই পড়বে।’

কেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে পর্যন্ত আবেদন হয়েছে।

ভারত পে-র সহ প্রতিষ্ঠাতা অশনীর গ্রোভারও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর কথায়, ‘যদি সরকার মনে করে যে যারা টাকা দিতে সমর্থ শুধু তাদের থেকেই চার্জ নেওয়া হবে, তাহলে এটাকে সোজা ভাষায় ট্যাক্স বলুন। মনে রাখবেন, ব্যবসায়ীদের ওপর যে ফি চাপানো হবে, তা ঘুরেফিরে সাধারণ গ্রাহকের পকেট থেকেই যাবে।’ অশনীর এখানেই থেমে থাকেননি। কেন্দ্রকে তাঁর আরও তোপ, ‘যদি আপনারা (সরকার) এই আর্থিক ব্যবস্থা চালানোর জন্য ৮০০০ কোটি টাকা ভরতুকি দিতে না পারেন, তাহলে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে আমরা ইউপিআই বানিয়েছি, আমরা গ্লোবাল লিডার ইত্যাদি বলা বন্ধ করুন। যে দেশ সফল প্রযুক্তিকে টিকিয়ে রাখার খরচ বহন করতে পারে না, সে আবার কীসের গ্লোবাল লিডার!’

শিলিগুড়ির হাকিমপাড়ার মুদিখানা ব্যবসায়ী সোমশুভ্র মণ্ডল যেমন বলছেন, ইউপিআই এখন আর বিলাসিতা নয়, ক্রেতার অভ্যাস। মাসের বাজার করতে এসে অনেকেই দুই-তিন হাজার টাকা বা তার বেশি অনলাইনে মিটিয়ে দেন। ব্যবসায়ীর নিজেরও মহাজনকে টাকা পাঠাতে হয় ইউপিআইয়ের মাধ্যমে। তাঁর প্রশ্ন, ‘একদিকে সবাইকে ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত করা হল, অন্যদিকে সেই লেনদেনেই বাড়তি খরচ চাপলে ব্যবসায়ীরা যাবেন কোথায়?’ তাঁর মতে, পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছালে নগদে বেচাকেনা করাই সহজ হয়ে উঠতে পারে।

কেন্দ্র অবশ্য বলছে, সাধারণ গ্রাহকের ইউপিআই লেনদেনে কোনও মাশুল বসানো হচ্ছে না। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির লেনদেনও এই ব্যবস্থার বাইরে। ২ হাজার টাকা পর্যন্ত ইউপিআই লেনদেনে ব্যাংক বা পেমেন্ট সংস্থা কোনও চার্জ নিতে পারবে না। নতুন ০.৪ শতাংশ এমডিআর প্রযোজ্য হবে নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী-গ্রাহক লেনদেনে ২ হাজার টাকার বেশি অঙ্কের ক্ষেত্রে। ৭৫ হাজার টাকা বা তার বেশি লেনদেনে মাশুলের সর্বোচ্চ সীমা ৩০০ টাকা। নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার কথা ১৫ অক্টোবর থেকে।

কিন্তু এখানেই উত্তরবঙ্গের ব্যবসায়ীদের আপত্তি। হিলকার্ট রোড ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সনৎ ভৌমিকের বক্তব্য, ‘বাজারে এমনিতেই নগদের জোগান কম। এটিএম থেকে নির্দিষ্ট সীমার বেশি টাকা তুললে বাড়তি খরচের বিষয় রয়েছে। তার উপর আজকের দিনে ২ হাজার টাকা এমন কোনও বড় অঙ্ক নয়। ফলে এই সীমার উপরে ইউপিআই লেনদেনে মাশুল বসলে তার প্রভাব বাজারে পড়বেই।’ বিধান মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির অন্যতম সদস্য অসিত দে’র কথাতেও একই উদ্বেগ।

ব্যবসায়ীদের আশঙ্কার পাশাপাশি ক্রেতাদের দুশ্চিন্তাও কম নয়। বেসরকারি চাকরিজীবী তনয় সরকারের বক্তব্য, ‘ব্যবসায়ী সরাসরি ক্রেতার কাছ থেকে এমডিআর চাইতে না পারলেও পণ্যের দাম বাড়িয়ে সেই টাকা তুলে নিতে পারেন। যেমন ২৫০০ টাকার কোনও পণ্য আগে হয়তো ২৩৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছিল। পরে সেই দাম ২৪০০ টাকা হয়ে গেলেও ক্রেতার পক্ষে বোঝা কঠিন বাড়তি ৫০ টাকা কেন নেওয়া হচ্ছে। ফলে কাগজে মাশুল ব্যবসায়ীর হলেও বাস্তবে তার একটা অংশ ক্রেতার ঘাড়ে চাপার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।’

মহাবীরস্থানের ব্যবসায়ী সাধন দাসের অভিজ্ঞতাও সেই প্রশ্নটাই সামনে আনছে। তাঁর কথায়, মাসের বাজার করতে এসে অনেকে ২ হাজার টাকার বেশি ইউপিআইয়ে দেন। তিনি নিজেও মহাজনের টাকা অনলাইনে মেটান। ফলে একদিকে ডিজিটাল লেনদেনের উপর নির্ভরতা বাড়ছে, অন্যদিকে সেই ব্যবস্থার খরচও বাড়ছে। তাঁর ভাষায়, ব্যবসায়ীদের এমন পরিস্থিতিতে ফেলা হচ্ছে যেন ‘গাছে তুলে মই কেড়ে নেওয়া’।

ফলে ১৫ অক্টোবরের আগে উত্তরবঙ্গের বাজারে এখন মূলত দুটি হিসাব। ব্যবসায়ীরা কীভাবে বাড়তি খরচ সামলাবেন এবং সেই খরচ ক্রেতার উপর কতটা পড়বে। তার পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্ন ঘুরছে বাজারে, নগদ যেখানে এতদিনে অনেকটাই পিছনে চলে গিয়েছে, সেখানে ইউপিআইয়ের খরচ বাড়লে আবার কি পকেটে ফিরবে সেই পুরোনো নোট-খুচরোর হিসাব?

উত্তরটা মিলবে নতুন ব্যবস্থা চালু হওয়ার পরই।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *