উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: এলগিন রোডের বাড়ির বাইরে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের কড়া পাহারা। পুলিশ রিপোর্ট বলছে, গৃহবন্দী সুভাষচন্দ্র বসু নিজের ঘরে বাঘছালের ওপর বসে চণ্ডীপাঠ ও যোগসাধনায় মগ্ন। দাড়ি রেখেছেন, সন্ন্যাসী হওয়ার পথে। কিন্তু ১৯৪১ সালের সেই হাড়হিম করা শীতের রাতে ঘরের ভেতরে যে চিত্রনাট্য তৈরি হচ্ছিল, তা ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেক পোঁতার ব্লু-প্রিন্ট।
আজ ২৩শে জানুয়ারি, দেশনায়কের ১২৯তম জন্মবার্ষিকী। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ফিরে দেখা যাক সেই ‘মহান অভিযাত্রা’র (The Nice Escape) নেপথ্য কাহিনি। এই পলায়ন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, ছিল নিখুঁত জ্যামিতিক ছকে কষা পরিকল্পনা। কতটা নিখুঁত? ১৯৩৯ সালেই সুভাষচন্দ্র নিজের বাঁ কানের নিচে থাকা একটি জন্মদাগ অস্ত্রোপচার করে সরিয়ে ফেলেন, যাতে ভবিষ্যতে ছদ্মবেশ ধরলে কেউ চিনতে না পারে।
১৯৪১ সালের ১৭ই জানুয়ারি রাত ১টা ৩০ মিনিট। ভাইপো শিশির কুমার বসুর জার্মান ‘ওয়ান্ডারার’ গাড়িতে চেপে নিরুদ্দেশের পথে পা বাড়ালেন নেতাজি। গন্তব্য ধানবাদ হয়ে গোমো স্টেশন। কিন্তু সুভাষচন্দ্র হিসেবে নয়, তিনি তখন ‘মহম্মদ জিয়াউদ্দিন’— নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ারের এক ইনস্যুরেন্স এজেন্ট। পরনে পাঠানি কোট, ঢিলে পাজামা, মাথায় ফেজ টুপি আর চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা।
ধানবাদে আর এক ভাইপো অশোকনাথ বসুর বাড়িতে কিছুক্ষণ বিরতি। সেখানে বাড়ির চাকরদের সামনেও চলে নিখুঁত অভিনয়। ইংরেজিতে কথা বলে, চা খেয়ে, আভিজাত্য বজায় রেখে তিনি বেরিয়ে পড়েন। এরপর গোমো স্টেশন থেকে ১ আপ হাওড়া-দিল্লি মেল (কালকা মেল)-এ চড়ে বসেন। যে কালকা মেল একসময় ব্রিটিশ সাহেবদের সিমলা বয়ে নিয়ে যেত, সেই ট্রেনেই তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু পাড়ি দিলেন স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে। পেশোয়ার, কাবুল, মস্কো হয়ে বার্লিন— সেই যাত্রা আজ ইতিহাস।
এই এপ্রিলে ১৬০ বছর পূর্ণ করতে চলা কালকা মেল আজ ‘নেতাজি এক্সপ্রেস’ নাম নিয়ে সেই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ছুটছে। ব্রিটিশরা ভেবেছিল তিনি নিছক পালিয়েছেন, কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন পরাধীন ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে যুদ্ধের দামামা বাজাতে।
