আবাস দুর্নীতি থেকে বাঁচতে আদালতে শিশুমঙ্গলের দুর্নীতিকে হাতিয়ার করেছেন উদয়ন। নিজেকে বিশিষ্ট সমাজসেবী হিসাবে তুলে ধরতে আদালতে বেশ কয়েকটি শংসাপত্র পেশ করেছেন প্রাক্তন মন্ত্রী। সরকারি প্যাডে উদয়নকে শংসাপত্র দিয়েছেন দিনহাটা হাসপাতালের সুপার।
শুভঙ্কর চক্রবর্তী
ফাঁস হল উদয়ন গুহর (Udayan Guha) আরও এক কুকীর্তি। এক দুর্নীতি (Corruption) থেকে বাঁচতে আর এক দুর্নীতিকে হাতিয়ার করেছেন প্রাক্তন উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী। উত্তরবঙ্গ সংবাদের অন্তর্তদন্তে সেই তথ্য সামনে আসতেই শুরু হয়েছে হইচই। আবাস দুর্নীতি থেকে বাঁচতে আদালতে শিশুমঙ্গলের দুর্নীতিকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছেন উদয়ন। দিনহাটা পুরসভার চেয়ারম্যান থাকাকালীন আবাস যোজনায় ঘর পাইয়ে দেওয়ার জন্য উপভোক্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ২০ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগে উদয়নের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা চলছে। আনোয়ার হোসেনের দায়ের করা সেই মামলায় নিজেকে বিশিষ্ট সমাজসেবী হিসাবে তুলে ধরতে বেশ কয়েকটি শংসাপত্র আদালতে পেশ করেছেন উদয়ন। তারমধ্যে একটি শংসাপত্র দিনহাটা হাসপাতালের সুপারের দেওয়া। সেই শংসাপত্রে সুপার লিখেছেন, শিশুমঙ্গল সমিতির সম্পাদক হিসাবে উদয়ন হাসপাতালের শিশুবিভাগের পরিকাঠামো উন্নয়নে কাজ করেছেন। সেটা প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকার প্রকল্প। সেই কাজের ফলে শিশু চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। হাইকোর্টের একাধিক আইনজীবীর ব্যাখ্যা, আদালতে নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল দেখানোর জন্যই কায়দা করে ওই শংসাপত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
শুধু দিনহাটা হাসপাতাল (Dinhata Hospital) সুপারের দেওয়া শংসাপত্রই নয়, একইভাবে কোচবিহার রিজিওনাল ক্যানসার সেন্টার, ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন, বেলা গুহ দুঃস্থ মহিলা ও শিশুকল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে উদয়নের প্রশস্তিতে ভরপুর শংসাপত্রও পেশ করা হয়েছে আদালতে। উদয়ন নিজেই ক্যানসার সেন্টারের সম্পাদক, মায়ের নামে তৈরি বেলা গুহ সমিতিতে তিনিই শেষ কথা। ওই দুই প্রতিষ্ঠান থেকে ইচ্ছে অনুযায়ী শংসাপত্র পাওয়া খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু বাকি দুই প্রতিষ্ঠান থেকে কীভাবে উদয়নের দরাজ প্রশংসা করে শংসাপত্র দেওয়া হল তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। সব শুনে হতভম্ভ হয়ে গিয়েছেন অনেকেই।
সরকারি প্যাডে উদয়নকে শংসাপত্র দেওয়া নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছেন দিনহাটা মহকুমা হাসপাতালের সুপার রণজিৎ মণ্ডল। হাসপাতালে সরকারি অনুমোদনহীন শিশুমঙ্গল সমিতির অর্থব্যয় নিয়ে এমনিতেই উঠেছে হাজারো প্রশ্ন। হাসপাতালের নামে কোটি কোটি টাকা তুলে তা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে উদয়ন এবং তাঁর শাগরেদদের বিরুদ্ধে। তারপরেও কেন শংসাপত্র দেওয়া হল তার সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি হাসপাতাল সুপার। হাসপাতালে শিশুমঙ্গল সমিতি কত টাকার কাজ করেছে তার কোনও টেন্ডার হয়নি, অডিটও হয়নি। তা সত্ত্বেও কীসের ভিত্তিতে শংসাপত্রে ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকার উল্লেখ করা হল তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। রণজিতের কথা, ‘শিশুমঙ্গল সমিতির সম্পাদক হিসাবে ওই শংসাপত্র দিয়েছিলাম। অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল না। সেসময় মন্ত্রীর নির্দেশ অমান্য করার মতো পরিস্থিতি ছিল না।’ তবে সুপারের যুক্তি মানতে নারাজ আনোয়ার। তাঁর বক্তব্য, ‘উদয়ন গুহকে দুর্নীতির মামলা থেকে বাঁচানোর জন্য পরিকল্পনা করেই ওই শংসাপত্র দেওয়া হয়েছে। আদালতে সেকথা বলব। সুপার সহ যাঁরা শংসাপত্র দিয়েছেন প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে তদন্ত করা উচিত।’
বেলা গুহ সমিতির সভাপতি হিসাবে শংসাপত্র দিয়েছেন উদয়নের প্রতিবেশী চিকিৎসক বিদ্যুৎকমল সাহা। ২০২৫-এর ৩ এপ্রিল শংসাপত্র দেওয়া হয়েছে। ২ এপ্রিল শংসাপত্র দেওয়া হয় আইএমএ-র দিনহাটা শাখার পক্ষ থেকে। সেইসময় বিদ্যুৎকমলই ছিলেন আইএমএ-র দিনহাটা শাখার সভাপতি। অর্থাৎ একই ব্যক্তি দুটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসাবে উদয়নের প্রশংসা করে শংসাপত্র দিয়েছেন। শিশুমঙ্গলের দুর্নীতি নিয়ে এফআইআর হওয়ার পর থেকেই নিখোঁজ বিদ্যুৎকমল। তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ। বাড়িতে গেলেও দেখা মেলেনি। তিনি বাড়িতে নেই বলে একটি বোর্ডও বাড়ির সামনে ঝোলানো আছে। অভিযোগ, উদয়নের নানা কুকীর্তির সঙ্গী ছিলেন ওই চিকিৎসক। উদয়নের ভয়ে কেউ তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পেতেন না। ক্ষমতার পরিবর্তনের পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপের দাবি উঠেছে।

