সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, ফিলাডেলফিয়া: কানসাস সিটির সবুজ গালিচায় তখন আলজিরিয়ার বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিকের উদ্দাম উৎসব। গ্যালারি ফেটে পড়ছে ‘মেসি’, ‘মেসি’ গর্জনে। কিন্তু সেই ঘোরলাগা মোহময় মুহূর্তেই গোটা বিশ্ব দেখল এক অচেনা দৃশ্য- মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন জাদুকর! এই চোখের জল তো রূপকথার নায়ক হওয়ার আনন্দাশ্রু নয়। এর প্রতিটি বিন্দুতে যে মিশে আছে এক নিদারুণ অসহায়তা।
ব্যক্তিগত জীবনকে সবসময় সযত্নে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ থেকে আড়ালে রাখেন লিওনেল মেসি। কিন্তু সেদিন সেই বাঁধভাঙা কান্নার কারণ জানতে চাইলে, ধরা গলায় শুধু বলেছিলেন, ‘সত্যি কথা বলতে কী, এর সঙ্গে ফুটবলের বা আজকের ম্যাচের কোনও সম্পর্ক নেই। আমি জীবনের একটা খুব জটিল আর খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি।’ সেই যন্ত্রণার আসল কারণটা যখন প্রকাশ্যে এল, তখন ফুটবল বিশ্বেরও যেন বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে উঠল। গুরুতর অসুস্থ মেসির বাবা-৬৮ বছরের জর্জে মেসি।
জর্জে তো লিওনেলের শুধু জন্মদাতাই নন। তিনি এই মহাতারকার ছায়াসঙ্গী, তাঁর অন্ধকারের লাঠি এবং তাঁর মিলিয়ন ডলার সাম্রাজ্যের প্রধান স্থপতি। পরিচিত আর্জেন্টাইন সাংবাদিক এডুয়ার্ডো ফেইনমানের কাছে শুনলাম, গত বছর থেকেই জর্জের শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। আর জানুয়ারি থেকে তিনি হাসপাতালের চার দেওয়ালে বন্দি। হৃদযন্ত্র ও স্নায়ুর জটিল সমস্যা। যে মানুষটা বিপদে-আপদে পাহাড়ের মতো ছেলেকে আগলে রাখতেন, তাঁকে হাসপাতালের বিছানায় ধুঁকতে দেখে মেসি যে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন, কানসাস সিটির ওই কান্নাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
কিন্তু খ্যাতির বিড়ম্বনা যে কত নিষ্ঠুর হতে পারে, তারও প্রমাণ মিলল। আবেগের এই চরম টানাপোড়েনের মাঝেই আর্জেন্টাইন সঞ্চালিকা ফ্লোরেন্সিয়া পেনা ‘লুজু টিভি’-র লাইভ সম্প্রচারে কোনও সত্যতা যাচাই ছাড়াই জর্জে মেসির মৃত্যুর খবর ঘোষণা করে বসেন! রেটিংয়ের এই নির্লজ্জ লোভে রীতিমতো শিউরে ওঠে গোটা বিশ্ব। প্রবল বিতর্কের মুখে পড়ে ওই সঞ্চালিকা প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
এই চরম অমানবিকতায় ক্ষোভে, দুঃখে ফেটে পড়ে মেসি পরিবার। এক কড়া প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তারা জানিয়েছে, চিকিৎসকদের কড়া পর্যবেক্ষণে জর্জের শারীরিক অবস্থার ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। পরিবারের সেই চিঠির ছত্রে ছত্রে লুকিয়ে ছিল এক অদ্ভুত অসহায়তা আর ক্ষোভ-‘একটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক বিষয়কে কিছু মানুষ যে ধরনের অসংবেদনশীলতা, অশ্রদ্ধা এবং অবিবেচকের মতো ব্যবহার করেছেন, তা অত্যন্ত হতাশাজনক।’ মেসির পরিবারের স্পষ্ট আবেদন, একজন মানুষের স্বাস্থ্য এবং তাঁর চারপাশের মানুষের মানসিক শান্তি নিয়ে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন জল্পনা যেন না হয়। শুধুমাত্র ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের কথার ওপরই ভরসা রাখার এবং তাঁদের গোপনীয়তাকে মানবিকতার খাতিরে সম্মান জানানোর আকুল আর্জি জানিয়েছে পরিবার।
বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিটি ফুটবলারই কোনও না কোনও আবেগ নিয়ে খেলেন। জাদুকরও খেলছেন। একদিকে দেশকে বিশ্বকাপ জেতানোর অমানুষিক চাপ, অন্যদিকে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষটা- পেশাদারিত্ব আর নাড়ির টানের এই দ্বৈরথে একাই লড়ছেন এক অসহায় ছেলে। ২২ জুন অস্ট্রিয়া এবং ২৮ জুন জর্ডানের বিরুদ্ধে গ্রুপ লিগের বাকি ম্যাচগুলিতে নামবে আর্জেন্টিনা। হয়তো বাবার দ্রুত আরোগ্যের প্রার্থনাই তাঁকে মাঠে নিজের সেরাটা নিংড়ে দিতে আরও বেশি তাগিদ জোগাচ্ছে। ফুটবল বিশ্ব এখন শুধু এই কামনাই করছে, টুর্নামেন্ট শেষে জাদুকরের এই যন্ত্রণার কান্না যেন চরম প্রাপ্তির আনন্দে বদলে যায়। আর জর্জে যেন গ্যালারিতে বসেই দেখতে পান ছেলের হাতে ওঠা কাপ!

