উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: চব্বিশের নির্বাচনি ধাক্কার রেশ কাটতে না কাটতেই তৃণমূল কংগ্রেসে নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক ভাঙন দেখা দিয়েছে। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একাধিপত্য এবং শীর্ষ নেতৃত্বের রণকৌশলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ (TMC insurrection) ঘোষণা করেছেন ঘাসফুল শিবিরের সিংহভাগ সাংসদ ও বিধায়ক। রাজনৈতিক মহলের মতে, গত কয়েক দশকের মধ্যে দলীয় হাইকম্যান্ডের বিরুদ্ধে এটাই সবচেয়ে বড় এবং সংগঠিত বিদ্রোহ, যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের অস্তিত্বকেই সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একটি সর্বভারতীয় সংবাদ সংস্থা তৃণমূল সাংসদ জগদীশ বর্মা বসুনিয়াকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, আগামী ১৫ জুন লোকসভার স্পিকারের (Lok Sabha Speaker Om Birla) সঙ্গে দেখা করেন নিজেদের ‘প্রকৃত তৃণমূল’ বলে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানাবেন বিদ্রোহী সাংসদরা।
দিল্লিতে ফাটল: এনডিএ-র দিকে ১৯ সাংসদ
লোকসভায় তৃণমূলের অন্দরে এই বিদ্রোহের সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। এবার তা প্রকাশ্য রূপ নিল। জানা গেছে, প্রবীণ সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে ১৯ জন বিক্ষুব্ধ তৃণমূল সাংসদ লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে একটি চিঠি জমা দিয়েছেন। চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, কাকলি ঘোষ দস্তিদারি হাউসে দলের আসল ‘চিফ হুইপ’। এই বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীটি সংসদের ভেতরে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (NDA)-কে নিঃশর্ত সমর্থন জানানোর সিদ্ধান্তও আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করেছে।
টাকার খেলা নাকি ক্ষোভের বিস্ফোরণ? কীর্তিকে তোপ বাসুনিয়ার
সাংসদদের এই আকস্মিক দলবদল এবং শিবির পরিবর্তন নিয়ে ইতিমধ্যেই তৃণমূলের অন্দরে কাদা ছোঁড়াছুড়ি শুরু হয়েছে। তৃণমূল সাংসদ কীর্তি আজাদ অভিযোগ তোলেন যে, প্রলোভন এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমেই আইন প্রণেতাদের নিজেদের দিকে টানছে বিজেপি। তবে এই অভিযোগকে তীব্র ভাষায় নস্যাৎ করে দিয়েছেন কোচবিহারের বিক্ষুব্ধ তৃণমূল সাংসদ (জগদীশ চন্দ্র বর্মা) বাসুনিয়া। কীর্তি আজাদকে সরাসরি ‘মিথ্যাবাদী’ প্রতিপন্ন করে তিনি বলেন, ‘কীর্তি আজাদ একজন আস্ত মিথ্যাবাদী। এই ধরণের ভিত্তিহীন অভিযোগ করা একেবারেই অনুচিত। আমরা ১৯ জন সাংসদ একজোট হয়েছি, উনিও একজন সাংসদ। নিজের সহকর্মীদের বিরুদ্ধে এমন কুৎসিত অভিযোগ করার কোনো অধিকার ওঁর নেই।’
রাজ্যেও অশনি সংকেত: বিধানসভাতেও ভাঙন
দিল্লির এই ফাটল কেবল সংসদ ভবনেই সীমাবদ্ধ নেই, এর আঁচ এসে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভাতেও। দল থেকে বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে রাজ্যেও এক বিরাট বিদ্রোহী গোষ্ঠী মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। ঋতব্রতের দাবি, ইতিমধ্যেই ৫৮ জন বিক্ষুব্ধ তৃণমূল বিধায়ককে রাজ্য বিধানসভায় ‘প্রধান বিরোধী গোষ্ঠী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লোকসভা এবং বিধানসভা উভয় জায়গাতেই যেভাবে দলের জনপ্রতিনিধিরা মমতার পাশ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন, তাতে স্পষ্ট যে দলের অন্দরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কার্যপদ্ধতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। নির্বাচনি পরাজয় সেই ক্ষোভের বারুদে অগ্নিসংযোগের কাজ করেছে। এখন দেখার, এই বিপুল ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগামী দিনে কী চাল চালেন।
