উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ কম উপস্থিতির জেরে পরীক্ষার্থী আটকানোকে কেন্দ্র করে সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজে (Surendranath Regulation School) তৈরি হওয়া ছাত্রবিক্ষোভ এবং উপাধ্যক্ষ মহম্মদি তরন্নুমের পদত্যাগের ঘটনা ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। পদত্যাগের পরপরই গভর্নিং বডির (GB) সভাপতি কৌস্তুভ বাগচীর বিরুদ্ধে সরাসরি ক্ষোভ উগরে দিয়ে পদত্যাগী উপাধ্যক্ষ অভিযোগ করেছেন যে, সভাপতি নিজেই কঠোর নিয়মের কথা বলে আন্দোলন উসকে দিয়ে শেষ মুহূর্তে তাঁকে অন্ধকার ঘরে বন্দি রেখে চম্পট দিয়েছেন। অন্যদিকে, সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে কৌস্তুভ বাগচী পাল্টা আক্রমণ শানিয়ে জানিয়েছেন যে, উপাধ্যক্ষের দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছাচারিতা এবং অতীতে চলা বিভিন্ন অরাজকতার কারণেই কলেজের ঐতিহ্য ধ্বংস হয়েছে, যা তিনি কোনোভাবেই বরদাস্ত করবেন না।
পদচ্যুত উপাধ্যক্ষ মহম্মদি তরন্নুমের দাবি, রাজ্য সরকার শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা কার্যকর করতেই তিনি ক্লাসের হাজিরা নিয়ে কড়াকড়ি শুরু করেছিলেন। তিনি বলেন, অতীতে নিয়মকানুন ঠিকমতো মানা হতো না, কিন্তু তিনি আইন ও নিয়ম বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। উপাধ্যক্ষের অভিযোগ, গভর্নিং বডি বা জিবি-র সভাপতি হিসেবে কৌস্তুভ বাগচী দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনিই স্বয়ং ৪০ শতাংশের নিচে হাজিরা থাকা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় বসতে না দেওয়ার জন্য লিখিত নির্দেশ বা রেজোলিউশন দিয়েছিলেন।
কিন্তু পরিস্থিতি যখন জটিল আকার ধারণ করে এবং শিক্ষার্থীরা তাঁকে ঘেরাও করে রাখে, তখন সভাপতি কোনো প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক সাহায্য করতে এগিয়ে আসেননি। উপাধ্যক্ষের কথায়, “আমি সভাপতিকে ফোন করে যখন বলি যে ছাত্ররা আমায় আটকে রেখেছে, উনি তখন নিজের বিধানসভা ও রাজনৈতিক কাজের দোহাই দিয়ে আসতে অস্বীকার করেন। এর পর বার কাউন্সিলের ৭৫ শতাংশ ও ৬৫ শতাংশ হাজিরার ভিন্ন নিয়মসংক্রান্ত মেল পাঠিয়ে শিক্ষার্থীদের আরও খেপিয়ে দিয়ে তিনি সরে যান।” শুধু তাই নয়, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তাঁকে সারারাত ঘোর অন্ধকারের মধ্যে আটকে রেখে জোর করে ইস্তফাপত্রে সই করানো হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে মুখ্যমন্ত্রী ও উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি।
উপাধ্যক্ষের এই সমস্ত অভিযোগ তীব্র ভাষায় খারিজ করে দিয়েছেন কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি কৌস্তুভ বাগচী। তাঁর দাবি, উপাধ্যক্ষ যেভাবে কলেজ চালিয়েছেন এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন, তা অত্যন্ত লজ্জাজনক। কলেজের অতীত দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে কৌস্তুভ অভিযোগ করেন যে, এই উপাধ্যক্ষের আমলেই ক্লাসরুম ও কমন রুম ভেঙে বিশেষ ব্যক্তিদের জন্য ঘর তৈরি করা হয়েছিল। অন্য তিনটি সরকারি আইন কলেজের মোট ফির থেকেও বেশি টাকা এখান থেকে নেওয়া হতো। এমনকি অতীতে কলেজের অন্দরে খাটের বিছানা বা আপত্তিকর জিনিসপত্র উদ্ধারের মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনাও ঘটেছে এবং উপাধ্যক্ষ সব জেনেও চুপ ছিলেন।
কৌস্তুভ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, নিয়ম অনুযায়ী ৭৫ শতাংশ উপস্থিতি কাম্য হলেও, কলেজের পঠনপাঠন ও অনলাইন মূল্যায়নের যে জঘন্য ব্যবস্থা উপাধ্যক্ষ করে রেখেছিলেন, তাতে সমস্ত দায় শিক্ষার্থীদের ঘাড়ে চাপানো যায় না। সরকারের দেওয়া দায়িত্ব পালন করে কলেজের দুর্নাম ঘোচাতে এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে তিনি বদ্ধপরিকর বলে জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত বুধবার থেকেই ৪০ শতাংশের কম হাজিরা থাকায় একদল শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় বসতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজ। বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত উপাধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরে শুক্রবার দুপুরে লিখিত পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করে তিনি কলেজ ছাড়ার পর আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একাংশ কলেজে গঙ্গাজল ছিটিয়ে ও ধূপ জ্বালিয়ে ‘শুদ্ধিকরণ’ পর্ব সারেন। যদিও শিক্ষার্থীরা হেনস্থা বা জোরজবরদস্তির অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। তবে উপাধ্যক্ষ ও জিবি সভাপতির এই প্রকাশ্য কাদা ছোড়াছুড়িতে কলেজ চত্বরে চরম প্রশাসনিক সংকট ও উত্তেজনা বজায় রয়েছে।

