আপনি বাঁচলে দলের নাম, মুরোদ নেই বিরোধিতার

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


গৌতম সরকার

লেজ গুটিয়ে পালানোর দৌড়ে আরও একজন। পিঠটান দিলেন কৃষ্ণেন্দুনারায়ণ চৌধুরী। সরকার যদি অসহযোগিতা করেই থাকে, তাহলে তার মোকাবিলা করার মুরোদ হল না তাঁর। কিংবা শাসক শিবির যদি চাপ দিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করে থাকে, সেটা প্রকাশ্যে বলার সাহসও নেই। অবশ্য একা ইংরেজবাজার পুরসভার চেয়ারম্যানকে দুষে লাভ নেই। দল বিধানসভা নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর তৃণমূলের সব জনপ্রতিনিধিরই এমন পালাই পালাই ভাব।

পুরসভার মেয়র, চেয়ারম্যানরা হয় ইস্তফা দিচ্ছেন নয়তো দলের কাউন্সিলাররাই তাঁদের বাধ্য করছেন সরে যেতে। শিলিগুড়ির দোর্দণ্ডপ্রতাপ প্রাক্তন মেয়র গৌতম দেবও ব্যতিক্রম নন। বিধানসভা ভোটে হেরে গেলেও পুরসভাগুলি ছিল তৃণমূলের ঘাঁটি। পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি, জেলা পরিষদগুলিও। এইসব স্বশাসিত সংস্থাকে আঁকড়ে দলের তৎপরতা চালু রাখার সুযোগ তৃণমূলের ছিল। ছিল না শুধু সেই কাজ করতে হলে যে মেরুদণ্ড থাকা দরকার, সেটাই। পুরসভার চেয়ারম্যান, জেলা পরিষদের সভাধিপতি কিংবা পঞ্চায়েত প্রধানদের।

এইসব প্রতিষ্ঠানে তৃণমূলের দুর্গ থাকলেও কেউ কেউ রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অজুহাত দিচ্ছেন। সরকারি বরাদ্দ বন্ধ, বিভিন্ন খাতে অর্থ খরচে লিখিত-অলিখিত নির্দেেশ পুরসভা, পঞ্চায়েতগুলিকে পঙ্গু করে দেওয়ার অভিযোগ। পদত্যাগীদের যুক্তি, কাজই যখন করা যাচ্ছে না, তখন পদ আঁকড়ে থেকে কী লাভ! যা আসলে ছেঁদো যুক্তি। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগ তুললেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি রাজ্য সরকার চালিয়ে যাননি!

তৃণমূল দলটার আগাপাশতলা সুবিধাবাদ এমনভাবে গেড়ে বসেছিল যে নীতি-নৈতিকতার বালাই ছিল না কোনও স্তরে। পদ আঁকড়ে থাকা মানেই ছিল নানা ধান্দা, আখের গুছোনোর ফিকির। সরকার বদল হতে সেই রাস্তাগুলি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দলের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার আগ্রহ বা মানসিকতা পুরসভার চেয়ারম্যান, পঞ্চায়েত প্রধানদের ছিল না। তার মধ্যে সরকার দুর্নীতির তদন্ত শুরু করায় তাঁরা প্রমাদ গুনেছিলেন। অধিকাংশের বিরুদ্ধেই যে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আছে।

কেউ কেউ আবার বিজেপির দরজায় কড়া নেড়ে নিজেকে নিরাপদ করতে চেয়েছিলেন। দরজা সবার জন্য খোলেনি। কড়ায় ঠকঠক করলেও কৃষ্ণেন্দু কোনও দরজা খোলাতে পােরননি। ফলে আপনি বাঁচলে দলের নাম। এঁদের এখন ‘যঃ পলায়তি সঃ জীবতি’ দশা। দলের কথা আর কে ভাবে! তৃণমূলের বিরোধী রাজনীতির পরিসরটা হারিয়ে ফেলার মূল কারণ এটাই।

বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে পুরসভা, পঞ্চায়েতের সঙ্গে অসহযোগিতার অভিযোগ মিথ্যা নয়। নানাভাবে শাসকদলের ভয় দেখানো, চাপ দেওয়া ইত্যাদি অভিযোগেরও সারবত্তা আছে। নেই শুধু এই প্রতিহিংসার রাজনীতি মোকাবিলা করতে তৃণমূলের কোনও নেতার নৈতিক দৃঢ়তা। যা থাকতে হলে নিজেদের স্বচ্ছ রাখতে হয়। গোড়ায় গলদটা সেখানেই। গায়ের জোরে শাসক হওয়া যায়, কিন্তু নৈতিক জোর না থাকলে বিরোধী হওয়া আদৌ সম্ভব নয়। কৃষ্ণেন্দুদের দেখে সেটা আরও স্পষ্ট।

যদিও মুখে বারফট্টাই কম নয়। কংগ্রেস ও তৃণমূলের মধ্যে কয়েকবার ঘোরাফেরা করা ইংরেজবাজারের চেয়ারম্যান এখন বলছেন, তাঁকে অতীতে মেরে ফেলার চক্রান্ত হয়েছে। জেল খাটানো হয়েছে। কিন্তু তাঁকে মাথানত করানো যায়নি। তিনি নাকি কাউকে ভয় পান না। তাহলে কোন বা কার বা কীসের ভয়ে ইস্তফা দিলেন তিনি? মন্তব্যে নারাজ তিনি। আসলে তৃণমূলের লোকেরা বিরোধী রাজনীতি করতেই অনিচ্ছুক। ক্ষমতার ক্ষীর ছাড়া রাজনীতি তাঁদের কাছে লবণ ছাড়া তরকারির মতো পানসে।

৬০ জনের মতো বিধায়ক, ২০ জন লোকসভা সাংসদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ছাড়তেই দলটা নড়বড়ে হয়ে গেল। অথচ মমতার সঙ্গে একেবারে জনসমর্থন নেই, তা নয়। রাজ্য নেতৃত্ব যোগাযোগ না রাখলেও জেলায় জেলায় কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের লোকজন কিছু আছে। যা নেই ঋতব্রত শিবির বা ২০ জন সাংসদের। কয়েকজন বিধায়ক বা সাংসদ বাদ দিলে তাদের জেলা স্তরে সংগঠন বলে কিছু নেই। কর্মীবাহিনী বলে কিছু নেই।

নির্বাচনে প্রার্থী হলে তাঁদের পক্ষে ভোট দেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ এই বিধায়ক ও সাংসদরা নেই বলে মমতাও হাত গুটিয়ে বসে আছেন। মুখে যতটুকু হম্বিতম্বি, কুণাল ঘোষ কিংবা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় করছেন। উপাসনা চৌধুরীর মতো হাতেগোনা কয়েকজন তরুণ তুর্কি চেঁচিয়ে বাজারমাত করছেন। যদিও সেসব কলকাতাকেন্দ্রিক। মহানগরের বাইরে বিস্তীর্ণ শহর ও গ্রামাঞ্চলে তৃণমূলের সক্রিয়তা শূন্য। মমতা জেলা সফরে বের হলে সেই শূন্যস্থান পূরণ কিছুটা হতে পারত।

কিন্তু তিনি নিজেকে ঘরবন্দি করে রেখেছেন। সরকার তাঁকে বেরোতে দিচ্ছে না- এই যুক্তিটা বড় ছেঁদো। তাহলে কীসের বিরোধী নেত্রী! বাধাটা ভাঙার চেষ্টা তিনি করছেন- এমন দৃষ্টান্তও নেই। মানুষের মনে সন্দেহ জাগছে, তিনি তৎপর হলে বিজেপি সরকার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে গ্রেপ্তার করবে- এই ভয়েই কি এই নিস্পৃহতা? জবাব একমাত্র তৃণমূল নেত্রী দিতে পারেন। কিংবা তাঁর সক্রিয়তা সেই সন্দেহকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারে।

কিন্তু তিনি বা তাঁর দল কোনওটাই করছে না। প্রতীক ও দলের নাম হাতে পেলেও মমতার সক্রিয়তা কতটা বাড়বে, সন্দেহ আছে। আর যদি না পান, তাহলে জেলা স্তরে এরপর সঙ্গে লোক পাবেন কি না সন্দেহ। গত ১৫ বছরে সাহসের সঙ্গে, স্বচ্ছতার সঙ্গে মানুষের মাঝে দাঁড়িয়ে কাজ করার মতো নেতাই যে তৈরি করতে পারেনি তৃণমূল।

অসততা সম্বল, দুর্নীতিনির্ভর, আখের গোছানো সুযোগসন্ধানী লোক দিয়ে ভর্তি দলটির তাই বিরোধী রাজনীতি করার হিম্মতও নেই। এই ছন্নছাড়া পরিস্থিতিকে বিজেপি নিরন্তর আরও উসকে যাবে। ফলে তৃণমূল দলটার মাথা তুলে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব বলেই আপাতত মনে হচ্ছে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *