একদিন যে নদীখাত শুকিয়ে গিয়েছিল, ফিরেছে তার জল। বদলেছে গঙ্গার স্রোতও। তিন নদী আর এক মরা নদীপথের টানে ক্রমশ সরে যাচ্ছে ভূতনির মাটি। নদী কি এবার মুছে দেবে আস্ত একটি জনপদ? আজ দ্বিতীয় পর্ব।
শুভঙ্কর চক্রবর্তী
নদীকে ঠেকাতে মানুষ বাঁধ বানায়। কিন্তু নদী যদি সেই বাঁধের ক্ষমতা বুঝে নিজের চরিত্র বদলে নেয় তাহলে তা হয়ে ওঠে ভয়ংকর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মালদার (Malda) ভূতনির (Bhutni) ক্ষেত্রে অনেকটা সেরকমই হয়েছে। প্রায় পাঁচ দশক আগে গঙ্গার (Ganges) বন্যা থেকে ভূতনিকে রক্ষা করতে যে সার্কিট বাঁধ তৈরি হয়েছিল, বর্তমানে সেই বাঁধকেই কোথাও নদী গিলে ফেলেছে, কোথাও নতুন করে বাঁধ তুলতে হচ্ছে, কোথাও আবার বাঁধের ভিতরের জল বার করার জন্য স্লুইস গেট বসানোর পরিকল্পনা হয়েছে। অর্থাৎ ভূতনিকে বাঁচানোর লড়াইBhutni এখন শুধু নদীর সঙ্গে নয়, বদলে যাওয়া নদীকে মাথায় রেখে তৈরি পুরোনো জল-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গেও।
১৯৭৬-’৭৭ সালে তৈরি হয়েছিল ভূতনি দিয়াড়া সার্কিট বাঁধ। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সেচ ও জলপথ দপ্তরের সাম্প্রতিক নথি বলছে, গত দু’বছরে ভয়াবহ ভাঙনে পুরোনো বাঁধের উল্লেখযোগ্য অংশ নদীগর্ভে চলে গিয়েছে এবং ১৯৭৫ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে গঙ্গা সর্বাধিক প্রায় ৬ কিলোমিটার বাঁ পাড়ে সরে গিয়েছে।
২০২৫-এর বন্যায় গঙ্গা ও কোশীর সংযোগস্থলের কাছে নতুন তৈরি রিংবাঁধও ভেঙে যায়। নথিতে তার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘টো ইরোশন’—অর্থাৎ বাঁধের পাদদেশের মাটি ও নদীর তলদেশের তীব্র ক্ষয়কে।
গবেষকরা বলছেন, ভূতনির ভবিষ্যৎ বোঝার জন্য বাঁধ ব্যবস্থাপনা বোঝা অত্যন্ত জরুরি। গঙ্গা গবেষক দিবাকর দত্তের বক্তব্য, ‘নদী শুধু বাঁধের গায়ে ধাক্কা দিচ্ছে না, নদীবাঁধের নীচের মাটিটাই সরিয়ে দিচ্ছে। উপর থেকে বাঁধ যতই শক্ত করা হোক, তার পাদদেশের মাটি যদি নদী কেটে নিয়ে যায়, কাঠামোর স্থায়িত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে। সেই কারণেই ভূতনিতে এতদিন ধরে পাথর, বোল্ডার, বস্তা, বাঁশের কাঠামো, অ্যাপ্রন সহ নানা ধরনের নদীরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিতভাবে ভাঙন থামানো যায়নি।’ রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের নথিতেও অবশ্য সেকথা স্বীকার করা হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর একটি প্রশ্ন— বাঁধের ভিতরের জল যাবে কোথায়? ভূতনির চণ্ডীপুর এলাকায় বাম আমলে একটি স্লুইস গেট তৈরি করা হয়েছিল। সেটি বর্তমানে অকেজো। রাজ্য সরকার ওই এলাকায় নতুন একটি স্লুইস গেট তৈরির পরিকল্পনা করেছে।
অর্থাৎ বাঁধ দিয়ে নদীর জল আটকানো হচ্ছে, আবার সেই বাঁধেই জল বের করার দরজা তৈরি করতে হচ্ছে। কয়েকদিন আগে ভেতরের জল বের করার জন্য চণ্ডীপুর এলাকায় বাঁধ কেটে দিতে হয়েছে। এই দ্বৈত ব্যবস্থা দেখিয়ে দিচ্ছে, ভূতনির মতো দিয়াড়া অঞ্চলে শুধু নদীর জল ঠেকানোই যথেষ্ট নয়। বৃষ্টির জল, স্থানীয় জলপ্রবাহ এবং নদীর সঙ্গে সংযোগ, সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে জল ব্যবস্থা চালাতে হয়।
২০১৮ সালের আর একটি গবেষণায় ১৯৭৩ থেকে ২০১১ সালের উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে মানিকচক দিয়াড়া এলাকায় ৩৮.৬ বর্গকিলোমিটার জমি নদীভাঙনে হারানোর হিসাব পাওয়া যায়। কিন্তু একই সময়ে ২.৪ বর্গকিলোমিটার নতুন জমি পলি সঞ্চয়ের ফলে তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ নদী যেমন ভাঙছে, তেমনি তার নতুন করে গড়ার প্রবণতাও আছে।
২০২৫ সালে সায়েন্স অফ দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট-এ প্রকাশিত গবেষণায় আশুতোষ কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং আইআইটি দিল্লির গবেষকরা ১৯৯০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত উপগ্রহচিত্র ব্যবহার করে নিম্ন গঙ্গার ৬০০-র বেশি গ্রামের ক্ষয় ও পলি সঞ্চয়ের প্রবণতা বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী ওই সময়কালে প্রায় ২০০ বর্গকিলোমিটার জমি ক্ষয়ে গেলেও প্রায় ১২০ বর্গকিলোমিটার নতুন জমি তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ নদীর হিসাবকে শুধু ভাঙন দিয়ে দেখা যথেষ্ট নয়। কোথায় জমি তৈরি হচ্ছে, কতদিন স্থায়ী হচ্ছে এবং সেই জমি ভবিষ্যতে আবার ক্ষয়ের মুখে পড়বে কি না তাও দেখতে হবে।
সেই গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। বিজ্ঞানভিত্তিক মডেল দিয়ে কোন এলাকায় ভবিষ্যতে ক্ষয় বা পলি সঞ্চয়ের সম্ভাবনা বেশি, তা অনুমান করার চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ এখন যেখানে ভাঙন হচ্ছে শুধু সেখানে বোল্ডার ফেলার বদলে আগামীদিনে কোন গ্রাম বা চর বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে, তার আগাম মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব। গবেষণাটি মালদা ও মুর্শিদাবাদের জন্য এমন পরিকল্পনার কথাই বলছে, যেখানে নদীর ভূ-আকৃতি এবং মানুষের সামাজিক দুর্বলতাকে একসঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
এই বিষয়গুলিই ভূতনির ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূতনি একেবারে হারিয়ে যাবে— এমন সরল হিসাব নদী এখানে মানে না। নদী একদিকে জমি কেটে নেয়, অন্যদিকে পলি ফেলে নতুন জমি তৈরি করে। ফলে ভূতনির আয়তন, আকৃতি এবং নদীর সঙ্গে তার দূরত্ব ক্রমাগত বদলাতে পারে। আজকের চর আগামীদিনের নদী হতে পারে, আবার আজকের নদীর বুকেও কাল নতুন চর উঠতে পারে।
কিন্তু মানুষের সমস্যা এখানেই। নদীর এই স্বাভাবিক পরিবর্তনের গতি আর মানুষের তৈরি স্থায়ী বসতি, রাস্তা, কৃষিজমি ও বাঁধের হিসাব এক নয়। মানুষ চায় একই জায়গায় বসতি টিকে থাকুক, নদী চায় নিজের ঢাল, স্রোত, পলি ও তলদেশের নিয়ম মেনে চলতে। ভূতনিতে এই দুই বাস্তবতার সংঘাত ক্রমশ তীব্র হচ্ছে।
তাই ভূতনির জন্য শুধু আরও শক্ত বাঁধের পরিকল্পনা যথেষ্ট কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সরকারি নথি নিজেই বলছে, নদীর ভূ-আকৃতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। সেই পরিবর্তন না বুঝে এক জায়গায় বাঁধ মেরামত করে অন্য জায়গায় আবার নতুন ভাঙন শুরু হলে বিপুল অর্থ খরচ হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
ভূতনিকে বাঁচানোর পরবর্তী ধাপ তাই হওয়া উচিত নদীর ভবিষ্যৎ মানচিত্র তৈরি করা। গত পাঁচ দশকের উপগ্রহচিত্র, গঙ্গা-ফুলহর-মরা কোশীর জলপথ, নদীর মূল গভীর স্রোত, পলি জমার অঞ্চল, পাড় সরে যাওয়ার হার এবং বাঁধের অবস্থান একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে কোথায় আগামীদিনে ক্ষয়ের সম্ভাবনা বেশি, কোথায় নতুন চর তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে— তা চিহ্নিত করা দরকার। নদী গবেষক অনিরুদ্ধ বসাকের কথা, ‘যে নদী প্রতিনিয়ত নিজের মানচিত্র বদলায়, তার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা শুধু বাঁধ বদলানো, যেখানে সেখানে নতুন বাঁধ তৈরি, বাঁধ কেটে দেওয়া এসব নিতান্তই শিশুসুলভ কাজ হচ্ছে। সবার আগে আমাদের ভূতনির ভবিষ্যৎ মানচিত্রটা পড়ে নেওয়া উচিত। তারপর সেইমতো বিশেষজ্ঞদের মতামত মেনে পরিকল্পনা তৈরি করা দরকার।’

