দীপায়ন বসু, শিলিগুড়ি: সাদরে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাতে একদিন গেটে দাঁড়িয়েছিলাম। তারপর থেকে এই ব্যাপারটাই যে কীভাবে জীবনের সঙ্গে জুড়ে গেল টেরই পেলাম না। এখন শুধু গেটে দাঁড়ানোই নয়, সবাইকে ঠিকমতো খাতিরযত্ন করা হচ্ছে কি না, আপ্যায়ন থেকে খাবারদাবারে কোনও খামতি থেকে গেল কি না, সবকিছু খুঁটিয়ে দেখে ব্যবস্থা না নিলে এতটুকু স্বস্তি পাই না।
এটা শিলিগুড়ির (Siliguri) হাকিমপাড়ানিবাসী মোনালিসা রায়ের গল্পের একটা অংশ মাত্র। বলা ভালো, তাঁর মতোই শিলিগুড়ির আরও অনেকেরই। বিয়ের কাজে হ্যাপা কম নয়। নির্ঘণ্ট ঠিক হয়ে গেলে বাজারঘাট থেকে শুরু করে সমস্ত কিছুর নিখুঁতভাবে ছক কষা, মণ্ডপ সাজানো, অতিথি আপ্যায়ন, সেবাযত্ন থেকে খাবারদাবার… মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। একটা সময় একাজে কেবলমাত্র পুরুষদের কাঁধেই গুরুদায়িত্ব ছিল। শহর শিলিগুড়িতে অবশ্য গত পাঁচ–ছয় বছর ধরে ছবিটা বদলাতে শুরু করেছে। বছর ২৩ ধরে শিলিগুড়িতে সুনামের সঙ্গে কেটারিং ব্যবসার দায়িত্ব সামলানো শুভ্রপ্রকাশ মণ্ডলের কথায়, ‘প্রথম প্রথম বেশ অবাক লাগত। তারপর যখন দেখলাম মেয়েরাও দিব্যি এই কাজের সবকিছু সামাল দিচ্ছে বেশ ভালোই লাগে।’
মোনালিসার গল্পে ফেরা যাক। থিয়েটার করতেন। পারিবারিক প্রয়োজনে রোজগারের রাস্তায় নামা। এই সূত্রেই শিলিগুড়ির এক নামী ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থার কর্ণধার শুভাশিস কুণ্ডুর সঙ্গে পরিচয়, অতিথিদের বরণ করে নিতে ‘ওয়েলকাম গার্ল’ হিসেবে গেটে দাঁড়ানো। সময় গড়িয়েছে। বিয়েবাড়ির মেইন কাউন্টার, অতিথিদের জন্য স্টার্টারের দায়িত্বও সামাল দেওয়া শুরু করেছেন। আজকাল কমপ্লিট ‘ম্যারেজ প্ল্যানার’ হিসেবে কাজ করছেন। শুভাশিসদের মতো সংস্থা শিলিগুড়িতে প্রায় ৭০টি, এর মধ্যে গোটা ৩০ বিয়ের কাজে যুক্ত। আর এই সমস্ত সংস্থায় ধীরে ধীরে মোনালিসাদের সংখ্যা বাড়ছে। তিনি বছরখানেক ধরে একাজে যুক্ত হলেও সহকর্মী দিশানী রায়ের অবশ্য বছর দশেক আগে এপথে নামা। মেয়েরাও যে কীভাবে বিয়ের কাজে ধীরে ধীরে দক্ষ হয়ে উঠেছে হাকিমপাড়ার দিশানী নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেছেন, ‘এমনটা নয় যে, আমরা কেবলমাত্র শিলিগুড়িতেই এই কাজ করছি, উত্তরবঙ্গের নানা প্রান্ত তো বটেই, এখানকার পরিধি ছাড়িয়ে বাইরে গিয়েও নিখঁুতভাবে বিয়ের কাজ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছি। সফলও হয়েছি।’
কী কারণে বিয়ের কাজেও মেয়েদের নামা? শুভ্রপ্রকাশের ব্যাখ্যা, ‘বিয়েও এখন গ্ল্যামার দুনিয়ার মতোই। তাই সুন্দর সাজে মহিলাদের এতে যুক্ত করা, আপ্যায়ন করা, খাবারদাবারের আয়োজন করা… সবই কমপ্লিট প্যাকেজের অংশ।’ যৌথ পরিবার ভেঙে খানখান হওয়া, পারিবারিক নানা কাজে আগে পরিবারের সবাই যেখানে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে লড়ত, সেই সংখ্যাতেও আজকাল ভাটা। আর সেই ফাঁক গলেই হয়তো এই ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থাগুলির ঢুকে পড়া। বাবা সুব্রত দাসকে নিয়ে বিশ্বজিৎ দাসের নামী কেটারিংয়ের ব্যবসা। ৩৫ বছর ধরে রমরমিয়ে চলছে। হালে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সূত্রে শিলিগুড়িতে বিয়ের কাজে মহিলাদের সংখ্যা বাড়লেও বিশ্বজিৎরা বহুদিন ধরেই একাজে মহিলাদের নিয়োগ করার চেষ্টা করেছেন। ওয়েলকাম গার্লের পাশাপাশি স্টার্টারের দায়িত্ব সামলানোর জন্য বিভাসচন্দ্র শীলের মতো অনেকেই ভেন্ডর হিসেবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
এককথায়, বিয়ের কাজে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠেও মেয়েরা! নাহ, একটু ভুল হল। এখানে চণ্ডীপাঠ অর্থাৎ শেষপর্বে জমিয়ে খাওয়াদাওয়ার পর্বে মেয়েদের কিন্তু পরিবেশনের কাজে এখনও সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। কারণ রয়েছে। শুভ্রপ্রকাশের কথায়, ‘হাজার আধুনিক হওয়ার চেষ্টা করলেও মাঝেমধ্যেই আমাদের মধ্যে এখনও আদিম প্রবৃত্তি মাথাচাড়া দেয়। তখন কেউ কেউ এই মহিলাদের সঙ্গে একটু অন্যরকম ব্যবহার করার চেষ্টা করে।’ এমন পরিস্থিতিতে পড়লেও অবশ্য মুশকিল আসান রয়েছে। দিশানীর কথায়, ‘আমি নিজে এমন পরিস্থিতিতে পড়িনি। তবে অনেকে পড়েন বলে শুনেছি। আর তখন শুভাশিসদারা মাঠে নামেন। মহিলাদের ময়দান থেকে সরিয়ে পুরুষরাই তখন সমস্ত দায়িত্ব সামলান।’
সমস্যা আরও আছে। বহু জায়গায় বিয়ের অনুষ্ঠানে শৌচালয় বা পোশাক পালটানোর মতো পরিবেশ থাকে না। এক্ষেত্রে মহিলাদের খুবই সমস্যা হয়। এছাড়া, কোনও কোনও কাজের সময় রাত ৩–৪টে পর্যন্ত গড়িয়ে যায়। সেই কাজ সামলে বাড়ি ফিরে পর দিনের কাজের প্রস্তুতি নেওয়াটাও কম ঝক্কির নয়। তবুও মোনালিসারা এরই মধ্যে সবকিছু নিখুঁতভাবে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। আক্ষরিকভাবেই বিয়ের কাজে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠের দায়িত্ব সামাল দেওয়ার স্বপ্নটাকে সঙ্গী করে।
