বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ: উৎসবেও আলো নেই ওদের জীবনে। ওরা মানে রায়গঞ্জ মুক্ত সংশোধনাগারের বন্দিরা (Raiganj)। পুজো চলে এল। তবু ওদের চোখেমুখে সেই খুশির ঝিলিক নেই। কারণ, ইচ্ছে ষোলোআনা থাকলেও এবার পুজোয় ওরা কেউ বাড়ি যাবে না।
কারও কারও বন্দি জীবন দশ-বারো বছরেরও বেশি দীর্ঘ হয়েছে। অনেকেই হাতের কাজ শিখে অপরাধপ্রবণতা ভুলে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে। কিন্তু নিয়মিত উপার্জন না থাকায় এবার দুর্গাপুজোয় বাড়ির ছেলেমেয়েদের নতুন জামাকাপড় কিনে দিতে পারছে না তারা। তাই বাড়িতে গিয়ে পুজোর দিনগুলো পরিবারের সঙ্গে কাটানোর কথাও ভাবতে পারছে না কেউ।
২০১৬ সালে উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জে এই মুক্ত সংশোধনাগারটি গড়ে তোলা হয়েছিল দণ্ডিতদের আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে। বর্তমানে এখানে রয়েছে ২৭ জন সাজাপ্রাপ্ত বন্দি। সকলে সকাল পাঁচটার পর বাইরে বেরিয়ে সারাদিন কাজ করে এবং রাত আটটার আগে ফিরে আসে সংশোধনাগারে। এটাই নিয়ম মুক্ত সংশোধনাগারের। সারাদিনে যা উপার্জন করে, তা দিয়ে নিজেদের খাবার, পোশাক-পরিচ্ছদ, ওষুধপত্রের খরচ মেটায়। সামান্য যা বাঁচে, তা বাড়িতে পাঠায় পরিবারের জন্য।
বন্দিদের মধ্যে কেউ টোটোচালক, কেউ নির্মাণশ্রমিক, কেউ বা মিষ্টির দোকানে কাজ করে। তিনজন সংশোধনাগারের সামনেই ছোট মুদির দোকান চালায়। একজন আদালতের মুহুরি হিসেবেও কাজ করছে। তবুও প্রতিদিন কাজ জোটে না, ফলে আয় হয় অনিয়মিত।
শনিবার সংশোধনাগারে গিয়ে দেখা গেল, কেউ সবজির বাগানে আগাছা পরিষ্কার করছে, কেউ শাকসবজি তুলছে। নিজেদের খাবারের জন্যই তারা বেগুন, কাঁচালংকা, পুঁইশাক, কুমড়ো, ডাটা সহ নানা সবজি চাষ করেছে। কেউ আবার টেলারিং-এর কাজ করছে, কয়েকজন রান্নায় ব্যস্ত।
ইসলামপুরের উদয় মিত্র দু’বছর আগে এখানে এসেছে। সংশোধনাগারের সামনেই মুড়ি-চিঁড়ার দোকান দিয়ে কোনওমতে জীবন চালাচ্ছে। দক্ষিণবঙ্গের গণেশ মালি প্রায় ১২ বছর ধরে বন্দি। গত ছয় বছর ধরে মুক্ত সংশোধনাগারে আছে। বর্তমানে ভাড়ায় টোটো চালায়। প্রতিদিন মালিককে ৩০০ টাকা ভাড়া দিয়ে হাতে থাকে মাত্র ২০০ টাকা। সেই টাকা দিয়ে সংসারের খরচ, নিজের খাওয়া আর পুজোর প্রস্তুতি—কোনটাকে অগ্রাধিকার দেবে, সেই দোটানায় ভুগছে সে।
জলপাইগুড়ির ইন্দ্রজিৎ শর্মার যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে খুনের মামলায়। গত সাত বছর ধরে সে রয়েছে রায়গঞ্জ মুক্ত সংশোধনাগারে। নির্মাণশ্রমিকের কাজ করে উপার্জন করে। কিন্তু নিয়মিত কাজ মেলে না। তার কথায়, ‘নিজের পেট চালাব না স্ত্রী-সন্তানের জন্য টাকা পাঠাব? জীবনটা এমন যে মরে মরে বেঁচে আছি। দুর্গাপুজোয় বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু টাকার অভাবে তা আর হচ্ছে না।’
কোচবিহারের নয়ন বর্মন প্রতিদিন ভোরে বেরিয়ে রেলস্টেশনের বাজারে বসে। কিন্তু সেখানে এখন বহু সবজির দোকান হওয়ায় ব্যবসা জমে না। ফলে পর্যাপ্ত আয়ও হয় না।
রায়গঞ্জ জেলা সংশোধনাগারের সুপারিন্টেন্ডেন্ট নিরঞ্জন সাহা বলেন, ‘মুক্ত সংশোধনাগারে বর্তমানে ২৭ জন সাজাপ্রাপ্ত আসামি রয়েছে। তাদের বাইরে গিয়ে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। কিন্তু প্রতিদিন কাজ পাওয়া যায় না। ফলে তারা ভীষণ সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।’
মূলস্রোতের মানবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করেও সমাজের সঙ্গে তাল মেলাতে হিমসিম খাচ্ছে রায়গঞ্জের মুক্ত সংশোধনাগারের বন্দিরা। উৎসবের মুখে তাদের এই না-পাওয়ার বেদনা যেন আরও গভীর হয়ে উঠছে।
