শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি: দেশের সর্বোচ্চ আদালত জামিনের আবেদন পত্রপাঠ খারিজ করে দিয়েছে। জারি আছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। বিডিওর দায়িত্ব থেকেও তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নীল বাতির গাড়ি নিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জের প্রাক্তন বিডিও প্রশান্ত বর্মন (Prashanta Barman)। সল্টলেকের স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যা খুনের মূল অভিযুক্ত প্রশান্ত পুলিশের খাতায় ‘পলাতক’। বাস্তবে পুলিশের নাকের ডগাতেই ঘুরছেন তিনি। শনিবার রাজগঞ্জ বিডিও অফিসেই দেখা গিয়েছে প্রশান্তকে। বিডিও অফিস থেকে খানিক দূরেই থানা। পুলিশ বা প্রশাসনের কর্তারা প্রশান্তর এইসব কীর্তি জানেন না সেকথা মানতে নারাজ সাধারণ মানুষজন। ফলে প্রশাসন চোখে ঠুলি পরে বসে থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে বিভিন্ন মহলে।
শনিবার রাজগঞ্জ বিডিও অফিসের দৃশ্য দেখে চক্ষু চড়কগাছ প্রত্যক্ষদর্শীদের। খাতায়-কলমে যে ব্যক্তিকে পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজছে, সেই প্রশান্তকে এদিন দু-দু’বার দেখা গেল বিডিও অফিসে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ নীল বাতির গাড়ি নিয়ে সটান অফিসে ঢোকেন তিনি। বিভিন্ন ঘরে গিয়ে কর্মীদের সঙ্গে কথা সেরে, কয়েকজন ঠিকাদারের সঙ্গে খোশমেজাজে আড্ডা দিয়ে আধ ঘণ্টা পর বেরিয়ে যান। ঘণ্টাখানেক পর ফের ফিরে আসেন। খুনের মামলার আসামির এমন ‘অফিস ভিজিট’ দেখে হকচকিয়ে যান ছুটির দিনও এসআইআর-এর কাজে অফিসে আসা কর্মী থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ী সকলেই। এদিন বিডিও অফিস চত্বরে থাকা এক ঠিকাদার বলেন, ‘এর আগেও প্রশান্ত অফিসে এসেছিলেন বলে শুনেছিলাম, তবে বিশ্বাস করিনি। এদিন ওকে দেখে চমকে যাই। যাওয়ার সময় বলে গিয়েছে কয়েকদিনের মধ্যেই নাকি আবার কাজে যোগ দেবে।’ স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর কথা, ‘সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও যদি প্রশান্তর কোনও শাস্তি না হয় তাহলে আর আইনে বিশ্বাস রাখা দায়। সবাই ভয়ে আছে।’
এদিন সকালে শিলিগুড়ির হিলকার্ট রোডের একটি সরকারি অতিথিশালা থেকে কয়েকজনের সঙ্গে নীল বাতির গাড়ি চড়ে বের হতে দেখা গিয়েছে প্রশান্তকে। অতিথিশালা সূত্রের খবর, সেখানে ময়নাগুড়ির জল্পেশে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা করছিলেন প্রশান্ত। জল্পেশ মন্দিরে এদিন সকালে নীল বাতির গাড়ি নিয়ে এসে কয়েকজন পুজো দিয়েছেন বলে মন্দিরের এক কর্মী জানিয়েছেন। তবে সেখানে প্রশান্ত ছিলেন কি না তা অবশ্য বলতে পারেননি তিনি। দিনকয়েক আগে কার্সিয়াংয়ে এক মধ্যবয়স্ক মহিলার সঙ্গে প্রশান্তকে ঘুরতে দেখেন শিলিগুড়ি শহরের এক বাসিন্দা। ওই বাসিন্দার কথা, ‘প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন প্রশান্ত ও তাঁর সঙ্গী। দেখে অবাক হয়ে যাই।’
সংবাদমাধ্যমের লাগাতার প্রশ্ন তোলা এবং বিভিন্ন মহলের চাপে প্রশান্তকে নাম কা ওয়াস্তে বিডিওর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে মাত্র। আশ্চর্যজনক বিষয় হল, খুনের মামলায় অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোনও প্রশাসনিক পদক্ষেপ করা হয়নি বা তাঁকে সাসপেন্ড করা হয়নি। আইন বলছে, কোনও আধিকারিকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে তাঁকে অবিলম্বে সাসপেন্ড করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু রাজগঞ্জের ওই প্রভাবশালীর ক্ষেত্রে আইনের বই সম্ভবত আলমারিতেই বন্দি। জেলা প্রশাসনের শীর্ষকর্তাদের ভূমিকাও এখন আতশকাচের তলায়। জলপাইগুড়ির জেলা শাসক শামা পারভিন বা মহকুমা শাসক তমোজিৎ চক্রবর্তী, কেউই বিষয়টি নিয়ে কোনও কথা বলতে নারাজ। পুলিশের বড়কর্তারাও যেন আচমকা বোবা হয়ে গিয়েছেন। স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনের মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা বিধাননগর কমিশনারেটের গোয়েন্দা শাখার কোনও আধিকারিক প্রশান্তকে নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি। কার্সিয়াং থেকে শিলিগুড়ির শিবমন্দির, সর্বত্রই রাজকীয় মেজাজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন অভিযুক্ত, অথচ পুলিশের স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম তো দূর থাক, সিভিক ভলান্টিয়ারের নজরেও তিনি পড়ছেন না!
প্রশান্তর প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোর কথা শুনে হতবাক স্বপন কামিল্যার শ্যালক দেবাশিস কামিল্যা। তাঁর প্রশ্ন, ‘প্রশান্তর অনেক ক্ষমতা। এত সবের পরেও যদি পুলিশ ওকে না গ্রেপ্তার করে তাহলে আমরা কোথায় যাব? কার উপর ভরসা রাখব?’ তিনি বলেন, ‘ওই বিডিওকে যারা বাঁচাতে চাইছে তাদেরও কঠিন শাস্তি দিতে হবে।’
রাজ্য প্রশাসনেরই এক প্রাক্তন সচিবের মতে, খুনের মামলার আসামি নিখোঁজ হলে জেলা প্রশাসনের উচিত ছিল বিশেষ টিম গঠন করা এবং নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি জানানো। কিন্তু এখানে সবকিছুই চলছে উলটো রথে। প্রশান্ত ছুটি নিয়েছেন কি না, বা তাঁকে শোকজ করা হয়েছে কি না— সে উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করছেন না প্রশাসনের কর্তারা।
যখন সুপ্রিম কোর্টও সুরক্ষা দিতে অস্বীকার করে, তখন কার ছায়ায় এত বড় আসামি বুক ফুলিয়ে নীল বাতি চড়ে ঘুরে বেড়ান সেই প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
