সৌরভ রায় ও রাহুল মজুমদার, শিলিগুড়ি: রাষ্ট্রপতির সফর বিতর্কের (President Murmu Siliguri Go to) রেশ যেন মেটারই নয়। তবে শিলিগুড়িতে রাষ্ট্রপতির এই সফরকে কেন্দ্র করে রাজ্যের বিরুদ্ধে অব্যবস্থা, তাঁকে অসম্মানের অভিযোগের বিষয় সহ সবকিছুকে ছাপিয়ে ডেলিগেট পাসের বিষয়টিই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রপতি দৌপ্রদী মুর্মুকে দর্শনে ৭০০ টাকায় এই পাস আর্থিকভাবে দুর্বল আদিবাসীদের অনেকের পক্ষেই জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। এনিয়ে শনিবার উত্তরবঙ্গ সংবাদে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই বেশ জলঘোলা শুরু হয়।
রাষ্ট্রপতির সভার উদ্যোক্তা আন্তর্জাতিক সাঁওতাল কাউন্সিলের কার্যকরী সভাপতি নরেশ মুর্মু শুক্রবার ফোন ধরেননি। শনিবার সকালে অবশ্য ফোন ধরে তাঁর দাবি, ‘আমরা ডেলিগেট পাসের ব্যবস্থা করলেও পুলিশও আলাদাভাবে পাসের ব্যবস্থা করেছিল। ডেলিগেট পাস থাকা সত্ত্বেও পুলিশের দেওয়া ডিআইবি পাস না থাকায় অনেককেই ফিরে যেতে হয়।’ শিলিগুড়ি মেট্রোপলিটান পুলিশ সূত্রে অবশ্য খবর, সভার দিন সভামঞ্চ কিংবা রাষ্ট্রপতির আশপাশে যাঁদের থাকার কথা ছিল শুধু তাঁদের জন্যই ডিআইবি পাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যাঁদের শুধু সভাস্থলে আসার কথা ছিল, তাঁদের জন্য ডেলিগেট পাসই যথেষ্ট ছিল। পাশাপাশি, সেদিন ডিআইবি পাসের বিষয়ে কোনও কড়াকড়িও করা হয়নি বলে পুলিশের দাবি।
বিতর্ক এখানেই শেষ হচ্ছে না। সম্মেলনের জায়গা বদল দিয়ে ইতিমধ্যেই বহু জলঘোলা হয়েছে। এ বিষয়ে শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেবের বক্তব্য, ‘জেলা প্রশাসনের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ভবনের আধিকারিকদের বৈঠকে বিধাননগরে অনুষ্ঠান করার কথা হয়েছিল। কিন্তু বিমানবন্দর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে ওই জায়গায় সভা করলে সমস্যা হবে জানিয়ে গোঁসাইপুরের জায়গাটিই ওঁরা বেছে নেন।’ অনুষ্ঠানের আয়োজন ঠিকমতো করা হচ্ছে কি না দেখতে বলা হলেও তাঁরা সেটি করেননি বলে গৌতমের দাবি। মেয়রের কথায়, ‘রাষ্ট্রপতির সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি কেন্দ্রীয় এজেন্সিই দেখে। অনুষ্ঠানের দুইদিন আগেই ওরা গোটা জায়গার দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিল। রাজ্যকে যা করতে বলা হয়েছে, রাজ্য সেটুকুই করেছে।’ গৌতমের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানতে সন্ধ্যায় নরেশকে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। নয়বার ফোন করা হলেও সংগঠনের সম্পাদক চুনিয়া মুর্মু সাড়া দেননি।
রাষ্ট্রপতি ৭ মার্চ গোঁসাইপুরে আন্তর্জাতিক সাঁওতাল কাউন্সিলের নবম সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে সেভাবে ভিড় না দেখে তিনি আক্ষেপ জানিয়ে এই সম্মেলনের জন্য প্রথমে বাছাই করা বিধাননগরের মাঝিথানে সন্তোষিণী বিদ্যাচক্র হাইস্কুলের মাঠে যান। সেখানে শাল গাছ রোপণ করে তিনি বলেছিলেন, ‘প্রশাসন বলেছিল এখানে জায়গা কম। এখানে কিন্তু অনায়াসেই পাঁচ লক্ষ মানুষের জমায়েত করা যেত।’ তিনি আরও বলেন, ‘সম্মেলনের জন্য পরে যে জায়গাটি বেছে নেওয়া হয় সেটি অনেকটা দূরে হওয়ায় আদিবাসীদের অনেকেই সেখানে যেতে পারেননি। এজন্য আমি দুঃখিত।’ প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই বিষয়টি নিয়ে এরপরই রাজ্য ও কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে জোর চর্চা শুরু হয়। তবে যতই সময় গড়াচ্ছে আনুষঙ্গিক নানা বিষয় ততই প্রকট হচ্ছে। আয়োজকরা ১২০০ ডেলিগেটের ব্যবস্থা করেছিলেন। সেটা না জেনেই কি রাষ্ট্রপতি পঁাচ লক্ষ মানুষের দাবি করেছিলেন বলে প্রশ্ন উঠেছে। নরেশের অবশ্য দাবি, ‘রাষ্ট্রপতি সবই জানতেন। রাষ্ট্রপতি ভবনও বিষয়টি জানত।’
প্রথমে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগিযার অভিযোগ তুললেও নরেশরা পরে দার্জিলিং জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তোলেন। তাঁর বক্তব্য, ‘সরকারি পাস ছাড়া সম্মেলনে যাওয়া যাবে না বলে প্রশাসন আমাদের জানায়। ওই পাস না থাকায় আমিও সভাস্থলে যেতে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছি। অসম থেকে আসা অনেকে ভিতরে না ঢুকে ফিরে যান।’
যদিও সম্মেলনের দিন শুধুমাত্র ডেলিগেট পাস থাকা অনেককেই সভাস্থলে ঢুকতে দেওয়া হয়েছিল। সভাস্থলে গিয়ে চারটি গেট দেখা গিয়েছিল। প্রত্যেক গেটে তিন–চারজন পুলিশকর্মী ছিলেন। ৭০০ টাকা দিয়ে যাঁরা ডেলিগেট পাস জোগাড় করেছিলেন, তাঁদের ওই সম্মেলনে যোগ দিতে দেওয়া হয়। তাই নরেশের দাবি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
