ওয়ারশ: হলিউডের সায়েন্স ফিকশন সিনেমায় আমরা সাধারণত কী দেখি? অত্যাধুনিক রোবট বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিদ্রোহ করে মানুষের অস্তিত্বই মুছে ফেলতে চায়। কিন্তু বাস্তব ছবিটা যে কত অদ্ভুত হতে পারে, তা সম্প্রতি দেখিয়ে দিল পোল্যান্ডের (Poland) রাজধানী ওয়ারশ। সেখানে মানুষের চাকরি কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়, বরং এআই-এর থাবা থেকে মানুষের কর্মসংস্থান বাঁচাতে প্ল্যাকার্ড হাতে রাজপথে নামল একদল রোবট!
গত সপ্তাহে ওয়ারশ-এ পোল্যান্ডের ডিজিটাল বিষয়কমন্ত্রকের সামনে এক অভাবনীয় দৃশ্যের সাক্ষী থাকলেন সাধারণ মানুষ। দেখা গেল, প্রায় তিরিশটি হিউম্যানয়েড (মানুষের মতো দেখতে রোবট) এবং চারপেয়ে যান্ত্রিক কুকুর (রোবট ডগ) ফুটপাথে গোল হয়ে ঘুরছে। তাদের হাতে নানা রঙের পতাকা। আর লাউডস্পিকারে তারস্বরে বাজছে স্লোগান- ‘কর্মক্ষেত্র বাঁচান’, ‘আর অপেক্ষা নয়, নিয়মকানুন চালু হোক’ ইত্যাদি (Robots Protest)।
তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, যন্ত্রের নিজস্ব কোনও চেতনা তৈরি হয়নি বা তারা আচমকা কোনও শ্রমিক সংগঠনে যোগ দেয়নি! এই আস্ত বিক্ষোভটির নেপথ্যে ছিলেন রক্তমাংসের মানুষই। ‘ডেমোক্র্যাটিজম’ নামে একটি সংগঠনের উদ্যোগে এই অভিনব প্রতিবাদের আয়োজন করা হয়েছিল। বিক্ষোভের উদ্যোক্তা গ্রেগর্জ কুলিস জানিয়েছেন, এআই এবং রোবোটিক্স আগামীদিনে মানুষের কাজের বাজারকে কীভাবে বদলে দিতে চলেছে, তা নিয়ে বড়সড়ো বিতর্ক উসকে দেওয়াই ছিল তাঁদের লক্ষ্য।
গ্রেগর্জের মতে, প্রযুক্তি এখন আর শুধু কল্পবিজ্ঞানের পাতায় আটকে নেই। বাস্তবের মাটিতে মানুষের কায়িক ও মানসিক পরিশ্রমের জায়গাগুলো হুহু করে দখল করতে শুরু করেছে। তাই এখনই কর্মীদের সুরক্ষার জন্য কড়া নিয়ম চালু করা দরকার। এই অভিনব প্রতিবাদের আঁচ এত জোরালো ছিল যে, পোল্যান্ডের ডিজিটাল বিষয়কমন্ত্রী ক্রিস্টফ গাওকোস্কি তাঁর দপ্তরের বাইরে বেরিয়ে এসে প্রতিবাদের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে দেখা করেন।
বিক্ষোভটা দেখতে নাটুকে মনে হলেও এর পেছনে আতঙ্কটা কিন্তু একশো শতাংশ খাঁটি। একদিকে যখন ‘অ্যানথ্রপিক’-এর মতো প্রথম সারির এআই গবেষক সংস্থাগুলি সতর্ক করছে যে, আগামী এক দশকের মধ্যে উন্নত এআই মানুষের অস্তিত্বের পক্ষে চরম সংকট হয়ে দাঁড়াতে পারে, তখন পরিসংখ্যানও চোখ রাঙাচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) এবং পোল্যান্ডের ‘নাস্ক’-র যৌথ গবেষণায় দেখা গিয়েছে, গোটা বিশ্বে প্রতি চারটি চাকরির মধ্যে অন্তত একটিতে জেনারেটিভ এআই-এর সরাসরি প্রভাব পড়তে চলেছে।
যদিও গবেষকরা বলছেন, চাকরি পুরোপুরি উধাও হওয়ার চেয়ে আগামীদিনে কাজের ধরন বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। পোল্যান্ড অবশ্য এই বিপদের মোকাবিলায় ইতিমধ্যে কোমর বেঁধেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এআই অ্যাক্ট’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গত জুলাই মাসে তারা নিজেদের জাতীয় এআই আইনে সই করেছে।
মোদ্দা কথা হল, যন্ত্ররা এখনও মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করেনি ঠিকই, কিন্তু মানুষ যন্ত্রকে ব্যবহার করে একটা সময়োপযোগী বার্তা ছুড়ে দিয়েছে সমাজের দিকে। প্রযুক্তির গতি যখন রকেটের মতো ছুটছে, তখন কাউকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়াটা বোকামি। উদ্ভাবন যতই স্মার্ট হোক না কেন, মানুষের বিচারবুদ্ধির বিকল্প হতে পারে না। তাই যন্ত্রের গতি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই এআই-এর রাশ টানা কতটা জরুরি- এই বিক্ষোভ যেন তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

