ফালাকাটা: আলিপুরদুয়ারের ফালাকাটা থেকে সলসলাবাড়ি (Falakata-Salsalabari) পর্যন্ত ৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেন বিশিষ্ট ইস্ট-ওয়েস্ট করিডর প্রকল্পের কাজে এবার বড়সড়ো দুর্নীতির (4-Lane Corruption) অভিযোগ তুললেন স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক পরিতোষ দাস (BJP MLA)। শালকুমারহাটে আয়োজিত বিজেপির তপশিলি মোর্চার একটি দলীয় সম্মেলনে যোগ দিয়ে তিনি প্রকাশ্যে এই দুর্নীতির প্রসঙ্গটি তুলে ধরেন। তাঁর এই বিস্ফোরক মন্তব্যের একটি ভিডিও ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে (যদিও সেই ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেনি উত্তরবঙ্গ সংবাদ)। বিধায়কের দাবি, এই গোটা প্রক্রিয়ার নেপথ্যে রয়েছে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র, যারা প্রশাসনিক যোগসাজশে সাধারণ মানুষের পাওনা অর্থ নয়ছয় করছে। এই ধরনের একটি পেমেন্ট ইতিমধ্যেই তিনি আটকে দিতে সক্ষম হয়েছেন।
শাসকদলের বিধায়ক নিজেই যখন এমন গুরুতর অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন, তখন থেকেই জেলা প্রশাসনের অন্দরমহলে শুরু হয়েছে তীব্র শোরগোল। বিধায়ক সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলেছেন ন্যাশনাল হাইওয়ে অথরিটি অফ ইন্ডিয়া অর্থাৎ এনএইচএআই এবং রাজ্য ভূমি সংস্কার দপ্তরের কিছু আধিকারিকের দিকে। এই স্পর্শকাতর ইস্যুটিতে জেলা প্রশাসনের কর্তারা মুখে কুলুপ এঁটেছেন এবং কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সম্মেলনের মঞ্চে দেওয়া বক্তব্যে পরিতোষ দাস ক্ষোভপ্রকাশ করে জানান যে, অসমে অনেক পরে ফোর লেন প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও তা ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে। অথচ আলিপুরদুয়ারে বহু আগে এই কাজের সূচনা হলেও সাধারণ মানুষ আজ পর্যন্ত তার সুফল পেলেন না। এর পেছনে এনএইচএআই ও ভূমি দপ্তরের কর্মকর্তাদের ভয়ংকর দুর্নীতি ও কারসাজি কাজ করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। হাতেনাতে একটি দুর্নীতির ঘটনা ধরার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান যে, দিন দশেক আগে তাঁর হাতে একটি নথি আসে। ওই দপ্তরগুলি সাধারণ মানুষকে কোনও বুকলেট বা শিট দেখতে দেয় না। কিন্তু তিনি দেখতে পান, ‘এস সরকার’ নামে এক ব্যক্তির কনস্ট্রাকশন বাবদ মাত্র ১০-১২ লক্ষ টাকা পাওনা পাওয়ার কথা থাকলেও তাঁকে ১ কোটি ১২ লক্ষ টাকা পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছিল। এই পুরো কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসতেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে বিষয়টি জানিয়ে দেন। পাশাপাশি, ন্যাশনাল হাইওয়ে অথরিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের সুপারিশ করে চিঠিও দিচ্ছেন তিনি।
এই দুর্নীতির শিকড় বহু গভীরে প্রোথিত রয়েছে এবং তার সূচনা হয়েছিল বিগত সরকারের আমলেই, এমনটাই দাবি বিধায়কের। তাঁর কাছে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ রয়েছে বলে জানিয়ে তিনি স্পষ্ট জানান যে, এই ফোর লেন প্রকল্পে সাধারণ মানুষকে ঠকানোর জন্য কীভাবে বহুমুখী চক্র সক্রিয় ছিল, তা খতিয়ে দেখতে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর দরবারে যাবেন এবং সিআইডি তদন্তের (CID Probe) জোরালো আবেদন জানাবেন। তবে নথিতে উল্লেখ থাকা ‘এস সরকার’ নামক ওই ব্যক্তিটি ঠিক কে, তাঁর আসল পরিচয় এখনও অজানা। ওয়াকিবহাল মহলের অনুমান, এটি কোনও সংঘবদ্ধ দালাল চক্রের নাম হতে পারে, যার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে সড়ক কর্তৃপক্ষ ও ভূমি দপ্তরের অসৎ কর্তারা। নিরপেক্ষ তদন্ত হলেই আসল সত্য সামনে আসবে।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জলপাইগুড়ির চূড়াভান্ডারে এসে ৪১ কিলোমিটার এই মহাসড়ক প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত একের পর এক জটিলাবর্তে আটকে যায় রাস্তার কাজ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জমির ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। আবার কোথাও কোথাও অন্যের মালিকানাধীন জমির ভুয়ো কাগজপত্র তৈরি করে দালালদের মারফত মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করার ঘটনাও ঘটে। প্রায় চার বছর আগে ফালাকাটায় জমি সংক্রান্ত এহেন দুর্নীতির অভিযোগে দুই দালাল গ্রেপ্তারও হয়েছিল, যদিও পরবর্তীতে সেই ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। বর্তমানে রাস্তার কাজ ফালাকাটার দিকে এগোতেই ঘরবাড়ির ক্ষতিপূরণ হাতিয়ে নেওয়ার তৎপরতা বেড়েছে। অভিযোগ উঠছে, যেখানে পুরোনো বাড়ি বাবদ বড় জোর দু’লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা, সেখানে দালাল ও ইঞ্জিনিয়ারদের যোগসাজশে ভুয়ো এস্টিমেট বানিয়ে ২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত পাইয়ে দেওয়ার সুপারিশ করা হচ্ছে। ঠিক এইরকমই একটি জালিয়াতির নথি হাতেনাতে ধরে ফেলেছেন বিধায়ক, যা সম্ভবত ফালাকাটা অঞ্চলেই সংঘটিত হচ্ছিল।

