উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: বাজারের ব্যাগে ঝকঝকে প্যাকেট। তাতে বড় বড় হরফে লেখা ‘রিফাইন্ড’ বা ‘পরিশোধিত’। আমরা ভাবি, এই তেল মানেই বুঝি হার্টের সুরক্ষা আর ঝরঝরে শরীর। শিলিগুড়ি থেকে মালদা, কোচবিহার থেকে জলপাইগুড়ি – মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে সর্ষের তেলের বদলে জায়গা করে নিয়েছে সাদা তেল বা রিফাইন্ড ভেজিটেবল অয়েল। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, আপনার শখের ‘লাইট’ অয়েল বা রিফাইন্ড তেল শরীরের বিপাক হার বা মেটাবলিজম কমিয়ে দিয়ে আপনাকে তিলে তিলে অসুস্থ করে তুলছে (Oil)।
জাঁকজমক বনাম আসল সত্যি
কয়েক দশক ধরে আমাদের শেখানো হয়েছে, ঘি বা সর্ষের তেল মানেই মেদ এবং হার্টের অসুখ। বিকল্প হিসেবে সামনে আনা হয়েছে সূর্যমুখী, সয়াবিন বা রাইসব্র্যান অয়েলকে। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, এই পরিশোধিত তেল তৈরির প্রক্রিয়াটিই আসলে অস্বাস্থ্যকর। দানাশস্য থেকে তেল বের করতে ব্যবহার করা হয় মারাত্মক রাসায়নিক (যেমন হেক্সেন) এবং প্রচণ্ড তাপমাত্রা। এই উচ্চ তাপে তেলের স্বাভাবিক পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায় এবং তা ট্রান্স ফ্যাটে রূপান্তরিত হয়। ফলে যা ‘হৃদযন্ত্রের বন্ধু’ বলে বিক্রি হচ্ছে, তা আদতে প্রদাহ বা ইনফ্লেমেশনের মূল কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
মেটাবলিজম বা বিপাক হার কমছে কেন
আমাদের শরীর একটি ইঞ্জিনের মতো। আমরা যা খাই, শরীর তা পুড়িয়ে শক্তি তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াকেই বলে মেটাবলিজম। রিফাইন্ড তেলে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। অতিরিক্ত ওমেগা-৬ শরীরের কোষের ভেতরে থাকা মাইটোকন্ড্রিয়া বা শক্তির আধারের ক্ষতি করে। যখন আপনার কোষগুলো ঠিকমতো শক্তি উৎপাদন করতে পারে না, তখন আপনার মেটাবলিজম বা বিপাক হার কমে যায়। ফলাফল? আপনি অল্প খেয়েও মোটা হয়ে যাচ্ছেন, সারাদিন ক্লান্তি ভাব থাকছে এবং থাইরয়েডের মতো হরমোনজনিত সমস্যায় ভুগছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আধুনিক তেলগুলো আমাদের শরীরে এক ধরনের ‘ধীরগতির বিষ’ হিসেবে কাজ করছে যা টাইপ-২ ডায়াবিটিসের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঘানি ভাঙা তেলের সেই সোনালি দিন
উত্তরবঙ্গের গ্রামগঞ্জে আজও ঘানি ভাঙা সর্ষের তেলের কদর আছে। আধুনিক বিজ্ঞান এখন হাতজোড় করে সেই পুরোনো অভ্যাসেই ফিরে যেতে বলছে। সর্ষের তেল বা নারকেল তেল হল কোল্ড প্রেসড বা কাচ্চি ঘানি। এতে কোনও রাসায়নিক থাকে না এবং প্রাকৃতিক অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে ভরপুর থাকে। আমাদের পূর্বপুরুষরা ঘি বা সর্ষের তেল খেয়েও দীর্ঘজীবী হতেন এবং চনমনে থাকতেন, কারণ সেই তেল শরীরের বিপাক ক্রিয়ায় বাধা দিত না।
নিরাপদ সর্ষের তেল বা ঘি
চিকিৎসকদের মতে, ভারতীয় রান্নার যে ধরন, অর্থাৎ কড়াইতে তেল ফুটিয়ে মশলা কষানো তার জন্য রিফাইন্ড অয়েলের চেয়ে সর্ষের তেল বা ঘি অনেক বেশি নিরাপদ। কারণ রিফাইন্ড তেল বেশি তাপে দ্রুত বিষাক্ত ধোঁয়া তৈরি করে, যা শরীরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়িয়ে দেয়।
অতএব রান্নাঘরে বদল আনতে হবে। কিন্তু কীভাবে?
সাদা তেলকে বিদায় জানান – রান্নাঘর থেকে সয়াবিন, রাইসব্র্যান বা সূর্যমুখী তেলের মতো উচ্চ পরিশোধিত তেল ধীরে ধীরে কমিয়ে ফেলুন। বদলে ঘানি ভাঙা সর্ষের তেল ব্যবহার শুরু করুন।
ঘি-ভীতি কাটান – ভালো মানের ঘি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়। বরং এটি হজম শক্তি বাড়াতে এবং মেটাবলিজম উন্নত করতে সাহায্য করে। তবে পরিমাণের দিকে নজর রাখতে হবে।
তেল গরম করার নিয়ম – একই তেল বারবার গরম করে ভাজাভুজি খাওয়া বন্ধ করুন। এটি বিষের সমান।
লেবেল পড়ার অভ্যাস – বিস্কুট, চিপস বা বাইরের ভাজা খাবারে প্রধানত সস্তা রিফাইন্ড তেল বা পাম অয়েল ব্যবহার করা হয়। এই আলগা খাবারের পরিমাণ কমান।
সুস্থ থাকা মানে শুধু কম খাওয়া নয়, বরং সঠিক জিনিসটা খাওয়া। বিজ্ঞাপনের চাকচিক্য আর ‘কোলেস্টেরল ফ্রি’ ট্যাগ দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। উত্তরবঙ্গের জল-হাওয়ায় সর্ষের তেল আর ঘরের তৈরি সাধারণ খাবারই আমাদের শরীরের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। মনে রাখবেন, মেটাবলিজম ঠিক থাকলে শরীর নিজে থেকেই রোগ প্রতিরোধ করবে। তাই তেলের প্যাকেট বদলানোর আগে একটু ভাবুন আপনার রান্নাঘর কি সুস্থতার পথে হাঁটছে, নাকি অসুস্থতার?
মনে রাখবেন, পুরোনো সেই ঘানি ভাঙা তেলের ঝাঁঝেই লুকিয়ে আসল স্বাস্থ্যের চাবিকাঠি।
