উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: শীতকাল যতটা আরামদায়ক, ততটা কষ্টেরও। বিশেষ করে আরথ্রাইটিস বা বাতের রোগীদের কাছে এই মরশুম বেশ অস্বস্তির (Arthritis Ache)। কারণ, যে ব্যথা গরমকালে অত ভোগায় না, সেই ব্যথাই শীতকালে যেন অসহনীয় হয়ে ওঠে। এমনটা হওয়ার কারণ এবং শুরুতেই এর মোকাবিলা করার উপায় জানলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ও পরনির্ভরতা এড়ানো সম্ভব। লিখেছেন কলকাতার এশিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ইমিউনোলজি ও রিউমাটোলজির কনসালট্যান্ট রিউমাটোলজিস্ট ডাঃ অর্ঘ্য চট্টোপাধ্যায়।
শীতকালে যে যে পরিবর্তন হয়
রক্ত সঞ্চালন কমে যায় – ঠান্ডার কারণে ভাসোকনস্ট্রিকশন ঘটে অর্থাৎ রক্তনালি সংকুচিত হয়ে যায়। ফলে গঁােট ও পেশিতে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ কমে যায়, অাড়ষ্টতা ও ব্যথার প্রতি সংবেদনশীলতা বাড়ে এবং হাত ও পায়ের আঙুলে রক্ত সঞ্চালনে বিঘ্ন ঘটে। এগুলো বিশেষ করে রেনড’স ফেনোমেনন (ঠান্ডায় হাত নীল বা সাদা হলে), ভাসকুলাইটিস, ডায়াবিটিস এবং কানেক্টিভ টিস্যু ডিজিজগুলির ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করে।
জয়েন্টের ফ্লুইড ঘন হয়ে যায় – কম তাপমাত্রায় সাইনোভিয়াল ফ্লুইড (জয়েন্ট লুব্রিক্যান্ট) কম কার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে জয়েন্ট গ্লাইডের কার্যকারিতা কমে যায়, ঘর্ষণ বাড়ে এবং প্রথম নড়াচড়ার সময়ই বিশেষ করে সকালে ব্যথা হয়। এমন অবস্থাকে অস্টিওআরথ্রাইটিসে ‘স্টার্ট-আপ পেন’ হিসেবে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়।
ব্যারোমেট্রিক প্রেশার এবং স্নায়ুতে সংবেদনশীলতা – বায়ুমণ্ডলীয় চাপ কম হলে জয়েন্টের চারপাশের টিস্যুকে সামান্য প্রসারিত করে। এছাড়া পেন-সেনসিটিভ স্ট্রাকচারগুলিকে প্রসারিত করার পাশাপাশি স্নায়ুতে ব্যথার অনুভূতি বাড়ে। সুতরাং পুরোনো আঘাত, মেরুদণ্ডের অবক্ষয় এবং প্রদাহযুক্ত জয়েন্ট ‘আবহাওয়ার পূর্বাভাস’ দেয়।
নিষ্ক্রিয়তায় ব্যথা বেশি
শীত → কম নড়চড়া → মাংসপেশির দুর্বল হওয়া → জয়েন্টে চাপ বেশি পড়া → বেশি ব্যথা → আরও নিষ্ক্রিয়তা। এই চক্র পেশিক্ষয় (সারকোপেনিয়া)-কে ত্বরান্বিত করে, বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে।
সংক্রমণই যখন কারণ
শীতের ভাইরাল ইনফেকশনের জন্য ইমিউন সিস্টেম সক্রিয় করতে পারে। সেইসঙ্গে রিউমাটয়েড আরথ্রাইটিস, লুপাস, ভাসকুলাইটিস, মায়োসিটিস হতে পারে। সুস্থ হয়ে ওঠার পরেও ক্লান্তি ও শরীরে ব্যথা বাড়তে পারে
রোগ অনুযায়ী শীতের প্রভাব
অস্টিওআরথ্রাইটিস – এক্ষেত্রে হাঁটু ও মেরুদণ্ডের ব্যথা বেড়ে যাওয়া, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর উঠে দাঁড়াতে সমস্যা এবং পেইনকিলারের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যেতে পারে।
রিউমাটয়েড আরথ্রাইটিস – সকালে দীর্ঘসময় ধরে হাত-পা অাড়ষ্ট হয়ে থাকা, ছোট ছোট জয়েন্টে ফুলে যাওয়া ও ব্যথা এবং ওষুধ অনিয়মিত খেলে রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা এই রোগে দেখা যায়।
স্পন্ডাইলোআরথ্রাইটিস – সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর পিঠ ও কোমর আড়ষ্ট হয়ে থাকা এবং শীতের সকালে মেরুদণ্ডের নমনীয়তা কমে যেতে পারে।
লুপাস ও কানেক্টিভ টিস্যু ডিজিজ – ক্লান্তি, জয়েন্টে ব্যথা, ঠান্ডার প্রতি সংবেদনশীলতা হওয়ার পাশাপাশি ত্বক ও রক্তনালির সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
রেনড’স ফেনোমেনন – এক্ষেত্রে হাত ও পায়ের আঙুলের রং পরিবর্তন (সাদা→ নীল→লাল) অন্যতম লক্ষণ। এছাড়া আড়ষ্টতা, ব্যথা এবং গুরুতর কিছু ক্ষেত্রে আলসার হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ফাইব্রোমায়ালজিয়া – সারা শরীরে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া, ঘুমে ব্যাঘাত এবং ঠান্ডা ও মেঘলা আবহাওয়ায় ব্যথার অনুভূতি বেড়ে যেতে পারে।
ধারণা এবং বাস্তব
ধারণা– শীতকালে বয়স্কদের ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক।
বাস্তব – দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা মোটেও স্বাভাবিক নয় এবং সেক্ষেত্রে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
ধারণা – শরীরচর্চা করলে ব্যথা বাড়ে।
বাস্তব – সঠিক ও উপযুক্ত শরীরচর্চায় ব্যথা ও আড়ষ্টতা কমে।
ধারণা – শীতে ব্যথা মোকাবিলায় পেইনকিলারই যথেষ্ট।
বাস্তব – নিজের মতো করে ওষুধ খেলে পরবর্তীতে জটিলতা বাড়তে পারে।
প্রতিরোধের উপায়
থার্মাল সুরক্ষা – গ্লাভস, মোজা, নি ক্যাপস ও স্কার্ফ পরুন। হাত ও পায়ে সরাসরি যাতে ঠান্ডা না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখুন। স্নানের সময় অবশ্যই ঈষদুষ্ণ জল (খুব গরম নয়) ব্যবহার করুন।
সক্রিয় থাকুন – সকালে অন্তত ১০-১৫ মিনিট স্ট্রেচিং করুন। বাড়ির ভেতরেই হাঁটা, যোগব্যায়াম ও তাই চি করতে পারেন। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সম্পূর্ণ বিশ্রাম এড়িয়ে চলুন। মনে রাখবেন, যত নড়াচড়া করবেন তত জয়েন্টগুলো পুষ্টি পাবে।
পুষ্টি জরুরি – পর্যাপ্ত প্রোটিন পেশিক্ষয় রোধ করে। এজন্য ভিটামিন-ডি অবশ্যই জরুরি। সবসময় ঈষদুষ্ণ জল খান কারণ, ডিহাইড্রেশন ক্লান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়।
ওষুধ খেতে হবে নিয়মিত – ডিএমএআরডিএস (DMARDs) এবং প্রেসক্রাইব করা অন্যান্য ওষুধ নিয়মিত খান। ঋতুভেদে আরাম পাচ্ছেন বলে ওষুধ কখনও বন্ধ করে দেবেন না। অতিরিক্ত পেইনকিলার খাওয়া এড়িয়ে চলুন।
মানসিক সুস্থতা জরুরি – শীতকালীন বিষণ্ণতা ও হতাশা ব্যথা বাড়িয়ে তোলে। সেক্ষেত্রে রুটিন ঘুমোনো আপনাকে সাহায্য করতে পারে। সেইসঙ্গে সামাজিক ও মানসিকভাবে সক্রিয় থাকুন।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
- জয়েন্ট ফুলে গিয়ে লাল হলে
- সকালে অাড়ষ্টতা ৩০ মিনিটের বেশি হলে
- ঠান্ডায় হাত নীল বা সাদা হলে বা হাতের আঙুলে ঘা হলে
- জ্বর, ওজন কমে যাওয়া এবং অস্বাভাবিক ক্লান্ত লাগলে
- হঠাৎ শারীরিক কার্যক্ষমতা কমে গেলে (যেমন, হাঁটতে, হাত মুঠো করতে অসুবিধা)
কাদের বেশি যত্নের প্রয়োজন
- প্রত্যেক বয়স্কের
- যাঁদের অটোইমিউন ডিজিজ রয়েছে
- যাঁরা স্টেরয়েড বা ইমিউনোসাপ্রেসেন্ট ব্যবহার করেন
- যাঁদের ডায়াবিটিস রয়েছে বা যাঁদের রক্ত সঞ্চালনে সমস্যা রয়েছে
- যাঁদের জয়েন্টে অস্ত্রোপচার হয়েছে বা আঘাত রয়েছে
