উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: অনেক সময় দেখা যায়, বাড়ির বয়স্ক ব্যক্তিরা আঘাত লাগলে ঠিকমতো বুঝতে পারছেন না। কখনও বা তাঁদের হাত থেকে পড়ে যাচ্ছে জিনিসপত্র, কখনও বা এটা-ওটা ভুলে যাচ্ছেন। এই ধরনের ঘটনা পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি নামক স্নায়ুর রোগের ইঙ্গিত হতে পারে (Diabetic Peripheral Neuropathy)। বিশেষ করে ডায়াবিটিকদের এই রোগের ঝুঁকি বেশি। লিখেছেন নেওটিয়া গেটওয়েল মাল্টিস্পেশালিটি হসপিটালের নিউরোলজি কনসালট্যান্ট ডাঃ মায়াঙ্ক প্রিয়রঞ্জন।
মানবশরীরে বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম পেরিফেরাল নার্ভ। এটি মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের মধ্যে এবং বাকি অঙ্গে সিগন্যাল পাঠায়। সময়ের সঙ্গে হাই ব্লাড সুগার (হাইপারগ্লাইসেমিয়া) স্নায়ুতন্ত্রে ধীরগতির বিষ হিসেবে কাজ করে, যা ডায়াবিটিক পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি (ডিপিএন)-এর জন্য দায়ী। এটা ডায়াবিটিসের অতি পরিচিত জটিলতা। টাইপ-১ এবং টাইপ-২ ডায়াবিটিস রয়েছে এমন রোগীর প্রায় ৫০ শতাংশকে প্রভাবিত করে ডিপিএন।
ক্ষতির প্রক্রিয়াঃ শর্করা কেন নার্ভকে আঘাত করে
হাই ব্লাড সুগার ও নার্ভের ক্ষতির মধ্যেকার যোগসূত্রে বিপাকীয় এবং রক্ত সংবহনতন্ত্র সম্পর্কিত উভয় কারণই যুক্ত।
১) বিপাকীয় বিষাক্ততা (কেমিক্যাল হিট)
গ্লুকোজ শোষণ করতে নার্ভের ইনসুলিন প্রয়োজন হয় না। অর্থাৎ রক্তে শর্করা যখন উচ্চমাত্রায় থাকে তখন নার্ভ এমনিতেই শর্করায় ভরে থাকে। এই অতিরিক্ত গ্লুকোজ বিভিন্ন ক্ষতিকারক পথ তৈরি করে।
পলিওল পাথওয়ে – অতিরিক্ত গ্লুকোজ সরবিটল ও ফ্রুকটোজে রূপান্তরিত হয়। সরবিটল স্নায়ুকোষের মধ্যে জমা হয় ও জল টেনে নেয়। ফলে কোষ ফুলে যায় এবং ক্ষতি হয়।
অক্সিডেটিভ স্ট্রেস – হাই সুগার ফ্রি র্যাডিক্যালসের উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। ফলে অস্থির অণু ডিএনএ এবং কোষের কাঠামোর ক্ষতি করে।
অ্যাডভান্সড গ্লাইকেশন এন্ড–প্রোডাক্টস (এজিইএস) – প্রোটিন ও লিপিডকে একসঙ্গে বঁাধে গ্লুকোজ, যা আঠালো অণুর রূপ নেয়। এতে স্নায়ুর প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে এবং প্রদাহ হয়।
২) মাইক্রোভাসকুলার ইনজুরি (ইসকেমিক হিট) – পেরিফেরাল নার্ভের নিজস্ব রক্ত সরবরাহের প্রয়োজন হয়, যা ভাসা নার্ভোরাম নামে ক্ষুদ্র রক্তনালি দিয়ে সরবরাহ হয়। ডায়াবিটিস এই ছোট্ট রক্তনালির ক্ষতি করে। ক্রমে রক্তনালি পুরু হয়ে গিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। এতে নার্ভগুলি অক্সিজেন ও পুষ্টি (ইসকেমিয়া) থেকে বঞ্চিত হয়। সেইসঙ্গে কার্যকরভাবে স্নায়ুতন্তুর শ্বাসরোধ করে দেয় যতক্ষণ না সেগুলো মারা যায়।
ডায়াবিটিক নিউরোপ্যাথির ধরন
ডায়াবিটিক নিউরোপ্যাথি কোনও একটা অবস্থা নয়, বরং বেশকিছু রোগের সমষ্টি।
ডিস্টাল সিম্মেট্রিক পলিনিউরোপ্যাথি (ডিএসপিএন) – এটা সবথেকে পরিচিত রূপ। এটা প্রথমে শরীরের দীর্ঘতম নার্ভে প্রভাব পেলে। ‘স্টকিং-গ্লাভ’ ডিস্ট্রিবিউশন পদ্ধতিতে বিশেষ করে পায়ের আঙুল ও পাতা দিয়ে শুরু হয়, তারপর পায়ে ছড়ায় এবং পরে হাতে ছড়ায়।
লক্ষণ – অসাড়তা, ঝিনঝিন ধরা, জ্বালাপোড়া ব্যথা বা সম্পূর্ণ বোধ হারিয়ে ফেলা।
ক্ষতির দিক – বোধ বা সংবেদন হারিয়ে ফেললে বিভিন্ন আঘাত যেমন কাটাছেঁড়া, ফুসকুড়ি প্রভৃতির দিকে নজর থাকে না। ক্রমে এগুলো সংক্রামিত হয়ে যায় এবং রক্ত সঞ্চালনের অভাবে আলসার এমনকি অঙ্গচ্ছেদের প্রয়োজন হতে পাের।
অটোনমিক নিউরোপ্যাথি – এটি সেই নার্ভে প্রভাব ফেলে যা শরীরের অনৈচ্ছিক ফাংশনকে নিয়ন্ত্রণ করে।
কার্ডিওভাসকুলার – অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ। এক্ষেত্রে দঁাড়িয়ে থাকলে মাথা ঘোরাতে পারে।
গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল – গ্যাস্ট্রোপেরেসিস এমন এক অবস্থা যা পেটের নিজেই খালি করার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। ফলে বমিবমি ভাব, পেট ফোলা এবং ব্লাড সুগার অস্বাভবিক ওঠানামা করে।
ইউরোজেনিটাল – এক্ষেত্রে মূত্রাশয় ধরে রাখা এবং ইরেক্টাইল ডিসফাংশনের সমস্যা হতে পারে।
প্রক্সিমাল নিউরোপ্যাথি (ডায়াবিটিক অ্যামিওট্রফি) – এটি সাধারণত উরু ও নিতম্বের একদিকে প্রভাব ফেলে। যেসব বয়স্ক মানুষের টাইপ-২ ডায়াবিটিস রয়েছে তঁাদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। এক্ষেত্রে তীব্র ব্যথার পর পেশিতে দুর্বলতা ও অ্যাট্রফি (কোনও অঙ্গ বা টিস্যুর আকার কমে যাওয়া বা ক্ষয় হওয়াকে বোঝায়) হতে পারে।
ফোকাল নিউরোপ্যাথি (মনোনিউরোপ্যাথি) – এক্ষেত্রে প্রায়ই মুখ, পা বা ধড়ের বিশেষ কোনও একটি নার্ভের ক্ষতি হয়। এটি হঠাৎ দুর্বলতা (যেমন, বেলস পালসি) বা ব্যথার কারণ হতে পাের। তবে কয়েক সপ্তাহ বা মাস পড়ে নিজে থেেকই সেরে যায়।
ঝুঁকির কারণ
হাই ব্লাড সুগার প্রধান কারণ হলেও অন্যান্য কারণও নার্ভের ক্ষতিকে ত্বরান্বিত করে। এরমধ্যে রয়েছে –
ডায়াবিটিসের সময়কাল – আপনার যত সময় ধরে ডায়াবিটিস থাকবে ঝঁুকি তত বেশি হবে।
গ্লাইসেমিক নিয়ন্ত্রণে না থাকা – উচ্চতর HbA1c মাত্রা রোগের তীব্রতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
কার্ডিওভাসকুলার ঝঁুকি – উচ্চ কোলেস্টেরল, ওবেসিটি এবং উচ্চ রক্তচাপ – ভাসকুলারের ক্ষতির জন্য দায়ী, যা নার্ভের ক্ষতি করে।
ধূমপান – ধূমপানের ফলে ধমনী সংকুচিত হয়ে যায়। এতে নার্ভে রক্ত প্রবাহের অভাব আরও বেড়ে যায়।
প্রতিরোধের উপায়
- স্নায়ুকোষ একবার মারা গেলে আর তৈরি হয় না। তখন চিকিৎসার লক্ষ্য হয় প্রতিরোধ এবং ধীর অগ্রগতি।
- রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখাই নিউরোপ্যাথির অগ্রগতি রোধের একমাত্র প্রমাণিত পদ্ধতি।
- যাঁদের বোধশক্তি কমে গিয়েছে তঁাদের কোথাও কাটাছেঁড়া বা ঘা হয়েছে কি না তা নিয়মিত পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- যে ক্ষতি হয়ে গিয়েছে সেটার কিছু করা না গেলেও নির্দিষ্ট ওষুধের সাহায্যে ব্যথা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। তবে স্ট্যান্ডার্ড পেইনকিলার প্রায়শই কোনও কাজে দেয় না।
- ধূমপান ছাড়ুন, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন, যাতে বাকি স্বাস্থ্যকর নার্ভে রক্ত সঞ্চালন যথাযথ হয়।
ডায়াবিটিক নিউরোপ্যাথির ফলে ডায়াবিটিস রক্তে শর্করার মাত্রা প্রভাবিত করে এবং রোগীর সংবেদনশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে শুরু করে, যাতে রোগীর পৃথিবী সম্পর্কে অনুভূতি এবং চলাফেরার পদ্ধতি বদলে যায়। জীবনের মান বজায় রাখতে নিয়মিত পায়ের পরীক্ষা ও নিউরোলজিক্যাল স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক শনাক্তকরণ অপরিহার্য।
