উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: ভারতের সীমান্তবর্তী কালাপানি (Kalapani), লিম্পিয়াধুরা ও লিপুলেখ (Lipulekh) এলাকাকে দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের মানচিত্রভুক্ত করার দাবি তুলে আসছিল নেপাল (NEPAL)। সেই আঞ্চলিক দাবি ঘিরে নয়াদিল্লি ও কাঠমাণ্ডুর কূটনৈতিক সম্পর্কে একাধিকবার টানাপোড়েন ও সংঘাত তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছিল, কাঠমাণ্ডুর এই দাবির সপক্ষে ঐতিহাসিক ও আইনি প্রমাণ কোথায়? ভারতের এই প্রশ্নের মুখে পড়ে এবার চরম ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অস্বস্তিতে পড়েছে নেপাল সরকার। আশ্চর্যজনকভাবে সে দেশের বিদেশমন্ত্রী নিজেই সংসদে দাঁড়িয়ে স্বীকার করেছেন যে, সীমান্ত নির্ধারণকারী মূল চুক্তির নথিপত্রই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
ভারত-নেপাল সীমান্তের লিপুলেখ, লিম্পিয়াধুরা ও কালাপানি কৌশলগত ও রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা। ২০২০ সালের জুন মাসে নেপালের তৎকালীন সরকার একটি নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করে, যেখানে উক্ত এলাকাগুলিকে নেপালের অন্তর্ভুক্ত বলে দেখানো হয়। শুরু থেকেই কাঠমাণ্ডুর এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল নয়াদিল্লি।
সম্প্রতি এই বিতর্ক নতুন করে উসকে দেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ। তিনি লিপুলেখ গিরিপথ ইস্যু নিয়ে চিন ও ব্রিটেনের সঙ্গে আলোচনা শুরুর বার্তা দিয়েছিলেন। এর ফলে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বৃদ্ধি পায়।
বিতর্কের এই চরম মুহূর্তে নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খনালের মন্তব্যে নতুন করে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। নেপালের সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, ঐতিহাসিক সগৌলি চুক্তির আসল কপি নেপাল সরকারের হেফাজতে আদৌ রয়েছে কি না, তা নিয়ে চরম ধোঁয়াশা রয়েছে।
শিশির খনাল বলেন, “চুক্তির মূল নথিপত্র আমাদের কাছে সংরক্ষিত আছে কি না, তা নেপাল সরকার নিশ্চিত নয়। ন্যাশনাল আর্কাইভে সীমান্ত সম্পর্কিত কিছু কাগজপত্র তো রয়েছে, তবে সেগুলো ১৮১৬ সালের সগৌলি চুক্তির আসল ও প্রামাণ্য নথি কি না, তা স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।”
উল্লেখ্য, দুই বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী ইঙ্গ-নেপাল যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে ১৮১৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও নেপাল রাজপরিবারের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক ‘সগৌলি চুক্তি’ (Treaty of Sugauli)। এই চুক্তির প্রধান শর্ত হিসেবে ‘কালী নদী’-কে ভারত ও নেপালের প্রাকৃতিক সীমানা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার সময়েও এই সীমান্তরেখা কার্যকর ছিল এবং পরবর্তীকালে ১৯৫০ সালে ঐতিহাসিক ভারত-নেপাল মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
সমস্যার মূল সূত্রপাত ঘটে কালী নদীর উৎপত্তি স্থান নির্ধারণকে কেন্দ্র করে। কাঠমাণ্ডুর মতে, কালী নদীর প্রকৃত উৎস লিম্পিয়াধুরায় অবস্থিত। সেই যুক্তি ধরে তারা লিম্পিয়াধুরা, কালাপানি ও লিপুলেখ অঞ্চলকে নেপালের ভৌগোলিক একতিয়ারভুক্ত বলে দাবি করে। অন্যদিকে নয়াদিল্লির অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার—লিপুলেখের নিম্নাঞ্চল থেকেই কালী নদীর প্রকৃত সূচনা। ফলে কালাপানি-সহ সংশ্লিষ্ট বিস্তীর্ণ ও কৌশলগত ভূখণ্ড ভারতেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।
১৮১৬ সালের মূল চুক্তিতেই নদীর উৎস সম্পর্কিত কিছুটা অস্পষ্টতা ছিল। তার ওপর এবার সেই চুক্তির আসল মূল নথিই হারিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করায় কাঠমাণ্ডুর আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক দাবি সম্পূর্ণ আইনি ও ঐতিহাসিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। প্রমাণের অভাবে ভারত সীমান্তে নিজেদের ভৌগোলিক দাবি প্রতিষ্ঠা করা নেপালের জন্য এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ল।

