ডঃ সৌরাদিত্য চক্রবর্তী
একসময় সন্ধ্যা নামলেই বাড়ির উঠোন, পুকুরপাড় কিংবা ঝোপঝাড়ের অন্ধকারে জ্বলে উঠত অজস্র ঝিকিমিকি আলোকবিন্দু। নিকষ কালো সন্ধ্যায় জোনাকির মিটিমিটি আলোয় মিশে থাকত শৈশবের বিস্ময়, মুগ্ধতা আর অনাবিল আনন্দ। শরৎ এলেই বাড়ির আলো কিংবা রাস্তার বাতির চারপাশে উড়ে বেড়াত শ্যামাপোকা বা কালীপোকা। আজকের প্রজন্মের কাছে সেই দৃশ্য ক্রমশ রূপকথার গল্প হয়ে উঠছে। প্রকৃতির ক্যানভাস থেকে নীরবে মুছে যাচ্ছে তারই আঁকা কিছু চেনা ছবি। রাতের আকাশে আলো বেড়েছে, অথচ কমছে অন্ধকারের ছোট ছোট প্রাণীদের দেখা পাওয়ার সুযোগ। জোনাকি ও নিশাচর পতঙ্গকে কম দেখা যাওয়া তাই শুধু শৈশবের স্মৃতিবিলাস নয়, পরিবেশের বদলে যাওয়ারও ইঙ্গিত।
জোনাকি আসলে গুবরে পোকার অন্তর্গত এক ধরনের পতঙ্গ। এদের দেহে ‘বায়োলুমিনেসেন্স’ বা জৈব আলো উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আলো তৈরি হয়। লুসিফেরিন নামের রাসায়নিক, লুসিফেরেজ উৎসেচক, অক্সিজেন ও এটিপির অংশগ্রহণে এই আলো জ্বলে ওঠে। অনেক প্রজাতির জোনাকি সেই আলো ব্যবহার করে সঙ্গীকে আকর্ষণ করতে এবং নিজেদের মধ্যে সংকেত বিনিময় করতে। অর্থাৎ, অন্ধকারে জ্বলে ওঠা আলো যেন প্রকৃতির লেখা এক প্রেমপত্র। অন্যদিকে, ‘শ্যামাপোকা’ বা ‘কালীপোকা’ নামগুলি স্থানীয় পরিচিতি। এই নামে দেখা সব পতঙ্গকে একটিমাত্র বৈজ্ঞানিক গোষ্ঠীর বলে চিহ্নিত করা যায় না। ধান ও ঘাসে দেখা গ্রিন লিফহপার বা সবুজ পাতাফড়িং সিকাডেলিডি পরিবারের অন্তর্গত। নেফোটেটিক্স ভাইরেসেন্স ও নেফোটেটিক্স নিগ্রোপিক্টাস তার উল্লেখযোগ্য প্রজাতি। এদের জীবনও উদ্ভিদ ও কৃষিজ পরিবেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। গ্রিন লিফহপার ধানের রস শোষণ করে এবং কিছু ভাইরাসজনিত রোগের বাহক হিসেবেও পরিচিত।
জোনাকির মতো নিশাচর পতঙ্গের জীবনযাপনে রাতের স্বাভাবিক অন্ধকার গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, কিছু পাতাফড়িং আলোর ফাঁদে আকৃষ্ট হয়, যদিও তাদের ক্ষেত্রে আলোর প্রভাব জোনাকির মতো নয়। রাস্তার এলইডি বাতি, বহুতলের আলোকসজ্জা, বিজ্ঞাপনী হোর্ডিং এবং সারা রাতের বাণিজ্যিক আলো অন্ধকার কমিয়ে দিচ্ছে। বিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম ‘আলোক দূষণ’। কৃত্রিম আলো জোনাকির আলোকসংকেত আড়াল করতে পারে, ফলে সঙ্গী খোঁজা, প্রজনন ও পারস্পরিক যোগাযোগ ব্যাহত হয়। প্রজাতিভেদে এর প্রভাবের ধরন ও মাত্রা আলাদা হতে পারে। ওয়েন্স ও লুইস–এর ২০১৮ সালের পর্যালোচনায় নিশাচর পতঙ্গের আচরণের ওপর রাতের কৃত্রিম আলোর নানা প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। লুইস ও তাঁর সহকর্মীদের ২০২০ সালের গবেষণায় জোনাকির অস্তিত্বের প্রধান হুমকি হিসেবে আবাসস্থল ধ্বংস, আলোকদূষণ ও কীটনাশকের কথা উঠে এসেছে। রাতকে দিনের মতো আলোকিত করার মানুষের আকাঙ্ক্ষা তাই বহু নিশাচর প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা হয়ে উঠতে পারে।
জোনাকি ও অন্যান্য পতঙ্গের সংখ্যা বা উপস্থিতি কমে যাওয়া নিছক স্মৃতিবিলাসের বিষয় নয়; এটি নগরবাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন সম্পর্কেও সতর্ক করে। পতঙ্গেরা পরাগায়ন, পুষ্টিচক্র এবং খাদ্যজালের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের হ্রাস বৃহত্তর পরিবেশগত ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে এর সমাধানে জটিল প্রযুক্তির চেয়ে সচেতন আচরণই বেশি জরুরি। অপ্রয়োজনীয় আলো নিভিয়ে রাখা, আলো নীচের দিকে সীমাবদ্ধ করা, কম তীব্রতার উষ্ণ বর্ণের আলো ব্যবহার, জলাভূমি ও ঝোপঝাড় সংরক্ষণ এবং নির্বিচারে কীটনাশক প্রয়োগ নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। বিশেষত জোনাকির আবাসস্থলে রাতের কৃত্রিম আলো যতটা সম্ভব কমানো জরুরি। উৎসবের আলো থাকুক, কিন্তু সারা রাত অকারণ আলোর কি সত্যিই প্রয়োজন? আলো ব্যবহারে বাস্তুতন্ত্রের কথাও ভাবতে হবে।
আমরা কি এমন এক সভ্যতার দিকে এগোচ্ছি, যেখানে রাত থাকবে, আলো থাকবে, অথচ রাতের প্রাণীরা থাকবে না? মনে রাখা দরকার, অন্ধকার মানেই অজ্ঞতা নয়; প্রকৃতির কাছে অন্ধকারও জীবনের এক অপরিহার্য শর্ত। শহরের প্রতিটি কোণ আলোকিত করার আগে তাই ভাবতে হবে, সেই আলোয় কারা পথ হারাচ্ছে। জোনাকির আলো ম্লান হয়ে যাওয়া মানে প্রকৃতির একটুকরো বিস্ময় হারিয়ে যাওয়া। আর সেই বিস্ময়, সেই স্বাভাবিক রাতের পরিবেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদেরই।
The put up Light Pollution | অন্ধকারেরও আছে নিজস্ব বাঁচার অধিকার appeared first on Uttarbanga Sambad.
