শুভময় মুখোপাধ্যায়
বিশ্ব রাজনীতির খাতায় ২০২৬ একটা বড় মোড় ঘোরানো বছর হয়ে থেকে যাবে। হাঙ্গেরি, ব্রাজিল আর ইজরায়েলের পর এবার খোদ আমেরিকায় সাধারণ মানুষ যেভাবে গণতন্ত্রকে বাঁচানোর জন্য ব্যালট বাক্সকে হাতিয়ার করলেন, তা এককথায় অভাবনীয়। যে দেশটাকে সারা পৃথিবীর মানুষ স্বপ্নপূরণের জায়গা বলে চেনে, যেখানে নতুন কিছু করার আর ব্যবসার এত সুযোগ, গত দু’বছর ধরে সেই আমেরিকাই এক দমবন্ধ করা দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের ভয়াবহ রূপ সাধারণ মানুষকে এতটাই বিরক্ত করে তুলেছিল যে, কট্টর রিপাবলিকান সমর্থকরাও এবার বাধ্য হয়েছেন পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিতে। এই রায় শুধু আমেরিকার ঘরোয়া রাজনীতির পালাবদল নয়, বরং বিশ্বজুড়ে যে সমস্ত নেতা ক্ষমতার দম্ভে গণতন্ত্র আর সংবিধানের গলা টিপে মারার খেলায় মেতেছেন, তাঁদের সবার জন্য এক চরম অশনিসংকেত।
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই ফলাফল আসলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের চরম ব্যর্থতা আর উদ্ধত আচরণের বিরুদ্ধে গোটা দেশের একটা গণভোট। বাজারদর আগুন, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ওপর ইচ্ছেমতো শুল্ক বা ট্যাক্স বসানো, আর সর্বোপরি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তেলের দাম আকাশছোঁয়া করে দেওয়ার মতো যে সর্বনাশা নীতি ট্রাম্প প্রশাসন নিয়েছিল, তার চরম মাশুল গুনতে হল রিপাবলিকান শিবিরকে। সমর্থন তলানিতে গিয়ে ঠেকলেও ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার যে আগ্রাসী কৌশল ট্রাম্প নিয়েছিলেন, আমেরিকার সাধারণ মানুষ তাকে সোজাসুজি ছুড়ে ফেলেছেন।
ভোটের হিসাব দেখলেই বোঝা যায়, মানুষের রাগটা ঠিক কতটা ছিল। সেনেটে বাহান্ন বনাম আটচল্লিশ আসনের যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের কথা ভাবা হয়েছিল, ডেমোক্র্যাটরা তেপ্পান্নটি আসন জিতে সেই হিসাব পুরোপুরি পালটে দিয়েছে। অন্যদিকে নিম্নকক্ষ বা হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস-এও ডেমোক্র্যাটদের নীল-ঝড় আছড়ে পড়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য যেখানে ২১৮টি আসন দরকার, সেখানে ডেমোক্র্যাটরা অনায়াসেই ২২০ আসন পেরিয়ে গেছে। নিম্নকক্ষ হাতছাড়া হওয়ার মানে হল, আগামী দু’বছর ট্রাম্পের কোনও খামখেয়ালি আইনি প্রস্তাবই আর সহজে পাশ হবে না। শুধু তাই নয়, গত দু’বছরে তাঁর প্রশাসনের সমস্ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবার কোমর বেঁধে তদন্ত শুরু করতে পারবে বিরোধীরা। আর সেনেটে হারের ফলে সুপ্রিম কোর্টে নিজেদের পছন্দের কট্টরপন্থী বিচারপতি বসানোর যে স্বপ্ন ট্রাম্প শিবির দেখেছিল, তাও পুরোপুরি ভেস্তে গেল।
পরাজয় নিশ্চিত জেনেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের দম্ভ অবশ্য একটুও কমেনি। তিনি আগেই হুমকি দিয়ে রেখেছেন যে, বিরোধীদের সমস্ত পদক্ষেপে তিনি তাঁর বিশেষ ক্ষমতা বা ভেটো প্রয়োগ করবেন। সমাজমাধ্যমে তিনি ‘ভেটো’ লেখা একটা লাল টুপির ছবি পোস্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, আগামী দু’বছর তিনি দেশের প্রশাসনিক কাজকর্ম পুরোপুরি অচল করে দেওয়ার রাস্তায় হাঁটবেন। এমনকি এক সাক্ষাৎকারে নিজের দলের প্রার্থীদের হারের দায় পুরোপুরি তাঁদের ঘাড়েই চাপিয়ে দিয়ে নিজে ধোয়া তুলসীপাতা সাজার চেষ্টাও তিনি করেছেন। কিন্তু বাস্তবের মাটিতে সাধারণ মানুষ যে তাঁর প্রশাসনের আকাশছোঁয়া দাম আর বিভাজনের নীতিকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে, তা জনমত সমীক্ষায় একেবারে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।
তবে এই নির্বাচনের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হল আমেরিকার বৈচিত্র্য আর সব ধর্মের মানুষের জয়। এই প্রথমবার সেনেট এবং নিম্নকক্ষের ভোটে এমন কিছু মুখ উঠে এসেছে, যা আমেরিকার দীর্ঘদিনের বিদ্বেষ ও ঘৃণার রাজনীতিতে একটা বড়সড়ো ধাক্কা দিয়েছে। টেক্সাস, কানসাস এবং সাউথ ক্যারোলিনার মতো রাজ্যগুলো গত কয়েক দশক ধরে কট্টর রক্ষণশীলদের গড় হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানেও এবার ডেমোক্র্যাটরা জিতেছেন। নর্থ ক্যারোলিনা আর ওহাইওর মতো রাজ্যেও ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে।
এই জয়ের পেছনে থাকা মুখগুলো আমাদের নতুন করে আশার আলো দেখায়। এই প্রথমবার কোনও মুসলিম আমেরিকান, আবদুল সায়েদ, সেনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। জর্জিয়ার মতো রাজ্যে গভর্নর হিসেবে জয়লাভ করেছেন এক কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা, কেইশা ল্যান্স বটমস। নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে প্রথমবার এক সমকামী মানুষ, ক্রিস প্যাপাস সেনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। টেক্সাসে গভর্নর হয়েছেন ল্যাটিনো সম্প্রদায়ের জিনা হিনোজোসা। এর পাশাপাশি ওহাইওতে অ্যামি অ্যাক্টন এবং আইওয়াতে রড স্যান্ডের জয় প্রমাণ করে যে, আমেরিকার মানুষ আর পুরোনো বিভাজনের তত্ত্বে বিশ্বাস করে না। ইন্ডিয়ানার পঞ্চম ডিস্ট্রিক্টে জে ডি ফোর্ডের জয় এক অভূতপূর্ব ঘটনা। যে এলাকায় দু’বছর আগে ট্রাম্প সতেরো শতাংশের বেশি ব্যবধানে জিতেছিলেন, সেখানে ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূত তিনবারের রিপাবলিকান নেত্রী ভিক্টোরিয়া স্পার্টজকে হারিয়ে দিয়েছেন একজন সমকামী প্রতিনিধি। অন্যদিকে, মেইন রাজ্যে টানা ষষ্ঠবার সেনেটর হওয়ার যে স্বপ্ন সুজান কলিন্স দেখছিলেন, তা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন ট্রয় জ্যাকসন। এই প্রত্যেকটি জয় আসলে গত কয়েক বছরের জমানো ঘৃণার গালে এক-একটা সপাট থাপ্পড়।
আমেরিকার এই পটপরিবর্তন বিশ্ব রাজনীতির জন্য এক বিরাট শিক্ষার জায়গা। ডানপন্থী এবং স্বৈরাচারী নেতাদের কাজের ধরন সারা বিশ্বেই কমবেশি এক। তাঁরা প্রথমে মানুষের মনে মেকি জাতীয়তাবাদের বিষ ঢুকিয়ে দেন, তারপর দেশের সমস্ত স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের হাতের পুতুলে পরিণত করেন এবং শেষমেশ বিরোধীদের মুখ বন্ধ করে একনায়কতন্ত্র কায়েম করেন। কিন্তু তাঁরা ভুলে যান যে, অর্থনীতি যখন মুখ থুবড়ে পড়ে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যখন নাভিশ্বাস ওঠে, তখন কোনও ধর্মীয় বা জাতীয়তাবাদী সুড়সুড়ি দিয়েই আর পেট ভরে না। ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছে। আমাদের দেহাতে একটা কথা খুব চালু আছে, ‘কুরসি কো প্রণাম, লেকিন জনতা জনার্দন।’ সত্যিই তো, ক্ষমতার চেয়ারকে মানুষ সম্মান করতে পারে, কিন্তু শাসকের অহংকার যখন আকাশ ছোঁয়, তখন সেই জনতাই ভগবান হয়ে শাসকের পতন ডেকে আনে। আমেরিকার নির্বাচন আজ তারই সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
আমেরিকার এই বিপুল রাজনৈতিক পালাবদল ভারতের কূটনীতির জন্যও ভীষণ জরুরি একটা শিক্ষা। ডেমোক্র্যাটদের এই অভাবনীয় উত্থান চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, নয়াদিল্লিকে এবার আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কটা নতুন করে সাজাতে হবে। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা বাণিজ্য চুক্তিগুলো দ্রুত সেরে ফেলা এবং জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়াটা এখন ভারতের প্রথম কাজ। আমেরিকার রাজনীতি চিরকালই একটা জোয়ার-ভাটার খেলা। ডেমোক্র্যাটদের এই জয় মানেই যে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তারা জিতবে, এমন কোনও কথা নেই। তাই আমেরিকার সাধারণ মানুষের মেজাজ পরিবর্তনের ওপর অতিরিক্ত নজর না দিয়ে, ভারতের উচিত আমেরিকার আসল রাজনৈতিক বৈচিত্র্যকে নতুন করে চেনা এবং সেই দ্রুত বদলাতে থাকা রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা।
শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্প নন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ক্লিন্টন, ওবামা এবং বাইডেনের মতো পরিচিত ডেমোক্র্যাট নেতারাও বিদায় নেবেন এবং তাঁদের জায়গায় উঠে আসবে আমেরিকার সম্পূর্ণ নতুন এক প্রজন্ম। রিপাবলিকানদের আগ্রাসী জাতীয়তাবাদের উত্থানে ভারত যেমন অবাক হয়েছিল, তেমনই ডেমোক্র্যাট শিবিরের ভেতরে প্রগতিশীল শক্তিগুলোর দ্রুত উত্থান নিয়েও ভারতের এবার তৈরি থাকা উচিত।
ভারতীয় রাজনৈতিক মহলের সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, আমেরিকাকে শুধুমাত্র ‘রিপাবলিকানরা ভালো আর ডেমোক্র্যাটরা খারাপ’—এই ধরনের সহজ ও একপেশে চোখে দেখা বন্ধ করতে হবে। আমেরিকার ভেতরে যে বদলগুলো হচ্ছে, সেগুলো ভালোভাবে বুঝতে হবে। রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট—কোনও দলেরই একটা নির্দিষ্ট বা বাঁধাধরা আদর্শ নেই; তাদের দলের ভেতরের বিভাজন দুটো দলের মধ্যেকার বিভাজনের মতোই গভীর। দ্বিতীয়ত, ‘ভারতের চেয়ে আমেরিকারই ভারতকে বেশি প্রয়োজন’—এই ভুল ধারণা থেকে অবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ বুঝিয়ে দিয়েছে যে এই আত্মতুষ্টির কোনও জায়গা নেই। তৃতীয়ত, নব্বইয়ের দশক এবং এই শতকের প্রথম দশকে যে কূটনীতি ভারত ও আমেরিকার সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল, সেই পুরোনো ও পরীক্ষিত রাস্তায় আবার ফিরে যেতে হবে। ২০০৮ সালের ঐতিহাসিক অসামরিক পরমাণু চুক্তি কেবল দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের হাত মেলানোর ফসল ছিল না; এর পেছনে ছিল কংগ্রেস, ব্যবসায়ী মহল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং আমেরিকায় বসবাসকারী ভারতীয়দের টানা চেষ্টা ও সমর্থন।
আজকের দিনে এই শিক্ষাটা অত্যন্ত জরুরি। আমেরিকার রাজনীতিতে আইনসভা, বড় বড় কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ নাগরিক সমাজের বিশাল প্রভাব রয়েছে। শুধু রিপাবলিকান আর ডেমোক্র্যাটদের লড়াই নয়, সেখানকার রাজনীতি আসলে অর্থনীতি, আঞ্চলিক পরিচয় আর আদর্শের এক নিরন্তর দরাদরি।
নয়াদিল্লি আর শুধু পুরোনো পরিচিত মহলের ওপর ভরসা করে বসে থাকতে পারে না। যারা ভারতের সমালোচনা করে, বিশেষ করে বাণিজ্য, অভিবাসন বা মানবাধিকার নিয়ে, তাদের সঙ্গেও এখন কথা বলা জরুরি। আমেরিকার প্রগতিশীলদের মধ্যে ভারতের অনেক পুরোনো বন্ধু হারিয়ে গেছে, তাদের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। এই কাজটা শুধু সরকার একা করতে পারে না; রাজনৈতিক দল, সাধারণ সমাজ এবং ব্যবসায়ী মহলকেও এগিয়ে আসতে হবে। শুধু বিদেশে থাকা ভারতীয়দের মধ্যে আটকে না থেকে, আমেরিকার মূল সমাজের সঙ্গে ভারতের গভীর যোগাযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন। অর্থনীতি, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার সঙ্গে ভারতের এই বন্ধুত্ব জরুরি। কিন্তু শুধু দুই দেশের নেতার ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের ওপর ভরসা করে থাকলে চলবে না; দরকার এমন এক মজবুত সম্পর্ক, যা আমেরিকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমাদের সরাসরি জুড়ে রাখবে।
(লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক)

