Meals | জিলিপি-শিঙাড়ার জন্য যুদ্ধও বাধাতে পারে বাঙালি

Meals | জিলিপি-শিঙাড়ার জন্য যুদ্ধও বাধাতে পারে বাঙালি

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : ‘ব্যাস অন্দর সে মন আচ্ছা নেহি লগরাহা হে’-  জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ পঞ্চায়েত-এর জগমোহনের মায়ের সেই মন খারাপের ছোঁয়া লেগেছে হুগলির ধনিয়াখালির বাসিন্দা সুদীপ্ত সামন্তর। কর্মসূত্রে কয়েক মাস হল সুদীপ্তর ঠিকানা শিলিগুড়ি শহর। বাকি কাজকর্ম ঠিকঠাক চললেও কিছুতেই মন ভালো হচ্ছে না তাঁর। কারণ, গত কয়েক মাসে তাঁর জিভ চপের স্বাদ পায়নি। তাই সাতপাঁচ না ভেবে ফেসবুকে খাদ্যরসিকদের একটি গ্রুপে শিলিগুড়িতে চপের দোকানের খোঁজ চেয়ে পোস্ট করেছেন তিনি। সেই পোস্ট এখন ভাইরাল।

পাত্র-পাত্রী, শাড়ি-গয়না নয়, সামান্য চপের খোঁজে ফেসবুকে তল্লাশি! চপপ্রেমীদের একাংশ তা দেখে উজ্জীবিত হলেও আর এক অংশ বেজায় খেপেছেন। শহরের অলিগলিতে এত চপের দোকান থাকলেও কেন তার চোখে পড়েনি সেই প্রশ্ন তুলেছেন। সুদীপ্তর পোস্টে শ-তিনেক মানুষ কমেন্ট করেছেন। পৃথিবীতে একমাত্র বাঙালিরাই হয়তো চপ নিয়ে এরকম বিতর্ক করতে পারেন। সুকুমার রায় থাকলে নিশ্চিত লিখতেন, ‘না : একটা চপ না পেলে আর চলছে না। কয়েক মাস আগে শিলিগুড়িতে এসেছি। এখনও চপ খেতে পারলাম না। একটা চপ পাই কোথায় বলতে পারেন?’

বাঙালির বিস্ময়কর পাকযন্ত্র। নিয়মিত মর্নিং ওয়াক, যোগ করেন দেশবন্ধুপাড়ার অমিতাভ বিশ্বাস। চিকিৎসকের পরামর্শে কোলেস্টেরল কমাতে খাদ্যতালিকায় অনেক কাটছাঁট করেছেন। তবুও চপ, শিঙাড়া দেখলেই নাকি তাঁর খিদে পেয়ে যায়। নিজেকে সামলাতে পারেন না। বুধবার সন্ধ্যায় এনটিএস মোড়ের চপের দোকানে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আরে এগুলো দুর্বল হৃদয়ের খাদ্য নয়।’ ব্যস্ত রাস্তার গলিতে নর্দমার পাশে গনগনে আগুনে ধোঁয়া ওঠা চপ, শিঙাড়া দেখলে বাঙালি তুরি মেরে বিখ্যাত চিকিৎসকের সাবধানবাণী উড়িয়ে বলে উঠতে পারেন, ‘ডাক্তাররা টাকা কামাতে ওইসব অনেক কথাই বলে থাকেন।’ যেমনটা শোনালেন বছর পঁয়ষট্টির বিশু সাহা। হাতি মোড়ের তেলেভাজার দোকানে দাঁড়িয়ে একটা শিঙাড়া শেষ করে চপের জন্য হাত বাড়িয়েছিলেন। স্বাস্থ্যর প্রসঙ্গ তুলতেই বললেন, ‘এ তো ঠাকুরের প্রসাদ। স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বরাহনগরের ফাগুলাল শাহের দোকানের তেলেভাজা খেতেন। আমি তো ঠাকুরেরই শিষ্য।’ এটাই মধ্যবিত্ত বাঙালির মেজাজ। চপ, শিঙাড়া জিলিপির প্রশ্নে ঘটি, বাঙালের সুর যে এক, বুধবার সন্ধ্যার শিলিগুড়ির বাজার সেকথা স্পষ্ট করেছে।

অতিরিক্ত তৈলাক্ত ও চিনিযুক্ত খাবারে আসক্তি কমাতে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক চপ, শিঙাড়া, জিলিপির দোকানে বিধিসম্মত সতর্কবার্তা বোর্ড ঝোলানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেমনটা লেখা থাকে সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে, ব্যাপারটা অনেকটা তেমন। সেই বোর্ডের পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছে, ‘অয়েল অ্যান্ড সুগার বোর্ড’। মুখরোচক খাবারে চিনি, লবণ, ফ্যাটের উপস্থিতি কতটা আছে, রোজ কত পরিমাণ সেগুলো খাওয়া যেতে পারে সেসব উল্লেখ থাকবে বোর্ডে। তাঁরা যে সেসবের ধার ধারেন না, তা এদিন ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিয়েছেন শিলিগুড়ির চপশিল্পীরাও।

জংশনের চপ দোকানের মালিক সুব্রত দাসের কথা, ‘ওসব লোকদেখানো। কেউ মানে না। সরকারের পয়সা খরচ করতে হয় তাই করবে।’ চম্পাসারির শিঙাড়া বিক্রেতা আবদুল লতিফ হাসতে হাসতে বললেন, ‘কিছুদিন আগে স্বাস্থ্য দপ্তরের তিনজনের একটা দল এসেছিল। কী তেল ব্যবহার করছি সেটা দেখে সতর্ক করল। তারপর যাওয়ার আগে নিজেরাই একটা করে শিঙাড়া খেয়ে চলে গেল।’

চপ, শিঙাড়ার আলুর গরমে জিভ পোড়ানোর মধ্যেও সুখ খোঁজে বাঙালি। মুখ সুচালো করে মুখের ভেতরের গরম ভাব বের করতেও আনন্দ পায় তাঁরা। জিলিপির টপটপে রস নতুন জামায় পড়ে আঠালো হলেও এতটুকুও রাগ না করা বাঙালিকে ‘ভয়’ দেখানো যে চাট্টিখানি কথা নয় তা এই ক’দিনে বুঝে গিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রকের কর্তারাও। বাঙালির চপ আবেগে আবার যুক্ত হয়েছে রাজনীতি। ‘আমরা কি চা খাব না, খাব না আমরা চা?’- করোনাকালের জনপ্রিয় সেই চা খোর কাকুর ডায়ালগের আদলে সোশ্যাল মিডিয়াতে গত কয়েকদিনে ছড়িয়েছে আর একটি ডায়ালগ, ‘আমরা কি চপ খাব না, খাব না আমরা শিঙাড়া?’

পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন রান্নার বই ‘কিতাব-উল-তাবিখ’ লেখা হয়েছিল দশম শতকের শুরুতে। সেখানে পারস্যের মুহম্মদ বিন হাসান আল-বাগদাদী ‘জুলবিয়া’ নামে একটি বিশেষ পদের উল্লেখ করেন। প্রায় একই সময় সায়ার অল-ওয়ারাকের লেখা একটি আরবের রান্নার বইতেও সেই নামটি পাওয়া যায়। ইতিহাসবিদরা বলছেন, জুলবিয়াই পরবর্তীকালে ভারতে এসে বদলে যায় ‘জালেবি’ বা বাংলায় ‘জিলিপি’-তে। বিধান মার্কেটের জিলিপি-শিঙাড়ার কম্বো প্যাক বিক্রেতা বা ক্রেতারা হয়তো ‘কিতাব-উল-তাবিখ’-এর কথা জানেন না। তাঁরা জানেন, রথের মেলা যেমন বাঙালির মননে মিশে গিয়েছে, ঠিক তেমনি জিলিপিও।

তেলেভাজার দোকানের লম্বা লাইনে কড়াইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে শিঙাড়া খাওয়াদের দলে অফিসের বস, বেকার তরুণ, সদ্য প্রেম হওয়া কপোতী সবাই আছেন। তারই পাশে হয়তো আছে সদ্য ব্রেকআপ হওয়া কেউ, আছে রিকশাওয়ালা, দু’একটা ছিন্নমূল মানুষ ও আরও অনেকে। ধনী-গরিবের কোনও ভেদাভেদ এখানে নেই৷ সবাই একমনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কড়াইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে শিঙাড়া খায়৷ সেই তেলেভাজাকে ‘বাদ’ দিতে হলে হয়তো বাঙালি যুদ্ধও বাধাতে পারে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *