একদিন যে নদীখাত শুকিয়ে গিয়েছিল, ফিরেছে তার জল। বদলেছে গঙ্গার স্রোতও। তিন নদী আর এক মরা নদীপথের টানে ক্রমশ সরে যাচ্ছে ভূতনির মাটি। নদী কি এবার মুছে দেবে আস্ত একটি জনপদ? আজ প্রথম পর্ব।
শুভঙ্কর চক্রবর্তী
মালদার (Malda) মানিকচকের (Manikchak) ভূতনিকে (Bhutni) দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এ যেন নদীর মাঝখানে আটকে থাকা একটি দ্বীপ। কিন্তু ভূতনির গল্প তার চেয়েও জটিল। চারপাশে শুধু একটি নদী নয়- গঙ্গা, ফুলহর এবং বহু পুরোনো এক নদীপথ মিলিয়ে ভূতনিতে তৈরি হয়েছে এমন এক জলভূগোল, যেখানে নদী প্রতিনিয়ত তার পথ বদলে ভূতনির অস্তিত্বই বিপন্ন করে তুলেছে। ভবিষ্যতে মালদার মানচিত্রে তিন গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে তৈরি ভূতনি আদৌ থাকবে কি না তা নিয়েই তৈরি হয়েছে আশঙ্কা।
নদী যখন বয়ে যায়, তখন তার সঙ্গে আসা বালি, পলি ও কাদা কোথাও জমে নতুন জমি তৈরি করে। সেই নদীবাহিত নতুন বা নীচু জমিকে বাংলায় দিয়াড়া বলা হয়। নদীর গতিপথ বদলালে এই জমিও বদলে যায়। কোথাও নতুন চর ওঠে, কোথাও পুরোনো জমি নদীতে চলে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূতনি আদতে সেই ধরনেরই একটি নদী-গড়া ভূখণ্ড বা দিয়াড়া।
ভূতনি রয়েছে মালদহের মানিকচক ব্লকে। পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে গঙ্গা, পূর্ব দিকে ফুলহর। উত্তরের দিকে রয়েছে কোশী নামের আর একটি নদীপথ। তবে সেই কোশী বিহার দিয়ে বয়ে যাওয়া মূল কোশী নদী নয়। সেটি আসলে কোশীর বহু পুরোনো একটি নদীখাত। কোনও নদী বহু শতাব্দী ধরে তার গতিপথ বদলাতে বদলাতে অন্য পথে চলে যাওয়ার পরে পুরোনো যে পথটি পড়ে থাকে, তাকে নদীবিজ্ঞানের ভাষায় ‘প্যালিও-চ্যানেল’ বা প্রাচীন নদীখাত বলা হয়। স্থানীয় ও সরকারি নথিতে এই পুরোনো পথটিকে ‘মরা কোশী’ নামেও উল্লেখ করা হয়েছে। নদী গবেষকরা বলছেন, ভাঙনে বিপন্ন ভূতনির আসল ভিলেন সেই মরা কোশীই।
কেন এমন বলছেন গবেষকরা? পশ্চিমবঙ্গের সেচ ও জলপথ দপ্তরের ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বরের একটি নথিতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের বন্যার পর সেই পুরোনো কোশী নদীখাত আবার সক্রিয় হয়েছে। এখন সেটি গঙ্গা ও ফুলহরের মধ্যে সংযোগকারী জলপথ হিসেবে কাজ করছে। অর্থাৎ, বহুদিনের পুরোনো নদীপথ আবার জল বহন শুরু করেছে। ২০২৫-এর বন্যায় গঙ্গা ও এই কোশী-খাতের সংযোগস্থলের কাছে নদীর তলদেশের প্রবল ক্ষয়ের কারণে নতুন তৈরি রিংবাঁধ ভেঙে যায় বলেও ওই নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এই তথ্যটি ভূতনির বর্তমান বিপদ বোঝার চাবিকাঠি।
নদী গবেষক দিবাকর দত্তের কথা, ‘ভূতনির চারপাশের জলপ্রবাহকে যদি একটি ছবিতে ভাবা যায়, তাহলে একদিকে রয়েছে গঙ্গার মূলস্রোত। অন্যদিকে রয়েছে ফুলহর। আর মাঝখানে বা সংলগ্ন এলাকায় পুরোনো কোশীর নদীপথ। বহুদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পরে সেই পুরোনো পথ আবার জলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় নদীর জল চলাচলের ধরনও বদলে যাচ্ছে। ফলে ভাঙনের চাপ আর শুধু একটি পাড়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। নদীর বিভিন্ন শাখা ও পুরোনো খাতের অবস্থার উপর নির্ভর করে নতুন নতুন জায়গায় ব্যাপক ভাঙন শুরু হবে।’
এই বদলের সরকারি প্রমাণও রয়েছে। সেচ ও জলপথ দপ্তরের ওই নথিতে বলা হয়েছে, ভূতনি দিয়াড়া এলাকায় গঙ্গার গতিপথ ধীরে ধীরে ফুলহরের দিকে সরে আসছে। গঙ্গার উচ্চ বন্যার জল থেকে ভূতনিকে রক্ষা করার জন্য ১৯৭৬–’৭৭ সালে তৈরি হয়েছিল ভূতনি দিয়াড়া সার্কিট বাঁধ। গত দু’বছরে ভয়াবহ ভাঙনে বাঁধের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নদীগর্ভে চলে গিয়েছে। যে বাঁধ একসময় ভূতনির সুরক্ষা কবচের মতো ছিল, তারই অংশ এখন নদীর গ্রাসে।
২০২৫ সালে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়েছে। সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, গঙ্গার বাম পাড়ের ভাঙনে ভূতনিতে বিপুল জমি হারিয়েছে। এতদিন যে ধরনের পাথর, বস্তা, বাঁশের কাঠামো এবং অন্যান্য নদী-রক্ষা ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তাতেও ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। কেন্দ্রীয় জল কমিশন বা সিডব্লিউসি-র ২০২৪ সালের গঙ্গা-পদ্মা নদী ব্যবস্থার উপর তৈরি বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদনে ভূতনির ঝুঁকি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, গঙ্গা ও ফুলহরের জটিল জলপ্রবাহের কারণে এই অঞ্চলে ভাঙন ও বন্যার পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে ভূতনি দিয়াড়া প্রায় ৫১ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত এবং প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ নদীভাঙন ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জল কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ওই এলাকায় গঙ্গার স্রোতের মূল গভীর পথ, যাকে নদীবিজ্ঞানের ভাষায় ‘থ্যালওয়েগ’ বলা হয় তা ক্রমাগত বাম দিকে সরে আসছে।
এই পরিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ২০১৬ সালে গৌড়বঙ্গ ও ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন গবেষকের একটি যৌথ গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। সেখানে ১৯৭৩ থেকে ২০১১ সালের উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করা হয়। তাঁদের গবেষণায় মানিকচক দিয়াড়া অঞ্চলে গঙ্গার ব্যাপক স্থানান্তর ধরা পড়ে। কিছু অংশে পাড়ের সর্বাধিক সরে যাওয়ার দূরত্ব প্রায় ৪.৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পাওয়া যায়। গবেষকরা দেখিয়েছেন, নদীর পাড় সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষিজমি, বসতি এবং মানুষের জীবনযাত্রাও বিপন্ন হয়েছে। এর পরের গবেষণাও ছবিটিকে আরও পরিষ্কার করে। ২০১৮ সালে গবেষণাপত্র স্পেশাল ইনফরমেশন রিসার্চ-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে দেখানো হয় মানিকচক দিয়াড়া অঞ্চলে প্রায় ৩৮.৬ বর্গকিলোমিটার জমি নদীভাঙনে হারিয়েছে। অর্থাৎ ভূতনির বিপদ কোনও এক বছরের বন্যার ফল নয়, এর পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের নদী-পরিবর্তনের ইতিহাস।
গঙ্গা গবেষক অনিরুদ্ধ বসাকের বক্তব্য, ‘জটিল নদীপথের সমীকরণের কারণেই ভূতনিকে নিয়ে আলোচনা জরুরি। নদী এখানে শুধু মাটি কাটছে না। নদী পুরোনো পথ ছেড়ে নতুন পথ তৈরি করছে, আবার পুরোনো পথেও জল ফিরিয়ে আনছে। আর যে ভূখণ্ডের জন্মই নদীর পলি জমে, সেই ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎও শেষপর্যন্ত নির্ভর করছে নদীর এই পরিবর্তনশীল আচরণের উপর। ফলে উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি তৈরি করে পদক্ষেপ না করলে ভূতনিকে বাঁচানো বাস্তবে সম্ভব নয়।’

