হরষিত সিংহ, মালদা: মালদার (Malda) ভূতনির (Bhutni) চরের নাম তো জানেন। গত কয়েক দিন ধরে সংবাদমাধ্যমে বহুল চর্চিত নাম। আচ্ছা, নারায়ণপুর (Narayanpur) চরের নাম শুনেছেন? ভূতনির বানভাসিদের দুর্দশার কথা সকলের জানা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে ত্রাণশিবির খোলা হয়েছে। নিয়মিত সেই ত্রাণশিবির পরিদর্শনও করা হয়েছে।
দিন দুয়েক আগেই রাজ্যের একাধিক মন্ত্রী সহ প্রশাসনের কর্তারা সেখানে পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভূতনি নিয়ে এত হইচইয়ের মাঝে অন্ধকারেই রয়ে গেল মানিকচকের আরও একটি গঙ্গার চর, যার নাম নারায়ণপুর চর।
ধারে ও ভারে, কোনওটাতেই অবশ্য নারায়ণপুর ভূতনির সমকক্ষ নয়। ভূতনি চরের জনসংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। আর নারায়ণপুর চরে বসবাস করেন এক হাজারের কিছু বেশি মানুষ। সেখানকার বাসিন্দাদের প্রধান জীবিকা মাছ ধরা। ভূতনির মতো এই চরটিও এবার গঙ্গার জলে প্লাবিত হয়েছিল। এখনও গোটা চরে জমে রয়েছে গঙ্গার জল আর কাদামাটি। সে সবের মধ্যেই কোনওক্রমে দিন গুজরান করছেন গ্রামের আট থেকে আশি সকলেই। ঘরে ঘুমোতে পারছেন না, তাই উঁচু উঁচু বাঁশের মাচা বেঁধে সেখানেই শিশুদের নিয়ে থাকছে পরিবারগুলি। গবাদিপশু আর মানুষ সমস্ত কিছুই এক জায়গায় গাদাগাদি করে রয়েছে। গোটা গ্রাম গঙ্গার জলে তলিয়ে গেলেও নারায়ণপুরে কিন্তু নিয়মিত কোনও ত্রাণের ব্যবস্থা করা হয়নি। কোনও ত্রাণশিবির খোলা হয়নি এখানকার বানভাসিদের জন্য। এ পর্যন্ত মাত্র চারবার গ্রামে পৌঁছেছে সরকারি ত্রাণ। প্রশাসনিক কর্তারা মুখ ঘুরিয়ে তাকানও না এই চরের দিকে।
এই চর মানিকচক ব্লকের মানিকচক পঞ্চায়েতের অধীনে। মানিকচক গঙ্গার ঘাট থেকে রাজমহল ঘাট যাওয়ার পথেই এই চর পড়ে। মানিকচক ঘাট থেকে নৌকায় যেতে সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা। তবে যদি গঙ্গায় প্রচণ্ড স্রোত আর ঢেউ থাকে, তাহলে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লেগে যায় নারায়ণপুর চরে পৌঁছাতে। চরের বাসিন্দারা খুব প্রয়োজন না হলে গঙ্গা পেরোতে খুব একটা রাজি হন না। কারণ পারাপার করতেই তো সারা দিন চলে যায়। আবার সন্ধ্যা হলে ভরা গঙ্গায় পারাপার করা বিপজ্জনক। মহিলারা তো বেরোনই না। গ্রামের কিছু তরুণ ও মৎস্যজীবীরা অবশ্য পেটের দায়ে নৌকায় চেপে এদিক-ওদিক বের হন। ভূতনির পাশাপাশি এই চরও এবার গঙ্গার জলে তলিয়ে গিয়েছিল। এখনও চরম সমস্যায় দিন কাটছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
বর্তমানে গ্রামের প্রায় ২০০ জন অসুস্থ। কারও জ্বর, আবার কারও পেটের অসুখ। গ্রামের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের হাত-পায়ে জলে থেকে ইনফেকশন হয়েছে। হাত-পা ফুলে গিয়েছে, ব্যথা করছে। স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য ফুলমতি চৌধুরী বলেন, ‘এতদিন জল থাকায় এখানে মেডিকেল ক্যাম্প করা যায়নি। এখন জল কমেছে। চরে মেডিকেল ক্যাম্প করা হবে। এ ছাড়া সরকারি প্রতিনিধিদল আসবে গ্রামে সার্ভে করতে।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, নারায়ণপুর চরে বসবাসকারী প্রায় ২৫০টি পরিবারই দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাস করেন। খড়কুটো দিয়ে তৈরি কুঁড়েঘরেই থাকতে হয়। বন্যার জল গ্রামে ঢুকে পড়ায় সকলের বাড়ি কাদায় ভরে গিয়েছে। তাই এখনও গ্রামের বাসিন্দারা থাকছেন উঁচু বাঁশের মাচা বেঁধে। গ্রামে একবার ত্রিপল দেওয়া হয়েছে। আর একবার বাসন, একবার চাল ও একবার শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে সরকারের তরফে। প্রশাসনের কোনও আধিকারিক এখন পর্যন্ত এই চরের মানুষের সঙ্গে দেখা করতে বা এলাকা পরিদর্শনে যাননি।
এদিকে, চরে গঙ্গার জল নেমে যাওয়ার পর থেকে মশামাছির উপদ্রব বেড়েছে। অনেকে রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাই অভিভাবকরা শিশুদের মশারির ভিতরে রাখছেন অধিকাংশ সময়। স্থানীয় রাকিয়া চৌধুরী বলেন, ‘সরকারি কোনও সাহায্য আমরা পাচ্ছি না। একবার শুধু চাল পেয়েছিলাম।’
মানিকচকের বিধায়ক গৌরচন্দ্র মণ্ডল বলেন, ‘নারায়ণপুর চর নীচু এলাকা। প্রতি বছর বন্যা হয়। বিগত সরকার এদের জন্য কিছুই করেনি। ইতিমধ্যে বর্তমান সরকার মডেল ভিলেজ তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছে। ওই এলাকায় সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার সমস্যা রয়েছে। তাই আগামীতে আমরা তাঁদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছি।’ তাঁর অবশ্য দাবি, বর্তমানে পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
গ্রামেরই বাসিন্দা ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী অবশ্য এই জলবন্দি পরিস্থিতিতেও ‘আশার আলো’ খুঁজে পেয়েছেন। বলেন, ‘বর্তমানে ভাঙন হচ্ছে না, তাই রক্ষা। ভাঙন ও প্লাবন একসঙ্গে হলে বিপদ বেশি।’

