কল্লোল মজুমদার, মালদা: অপরাধ একটাই। সামর্থ্য নেই উঁচু এলাকায় বাড়ি বানানোর। তাই কখনও ভারী আবার কখনও রাতভর বৃষ্টিতে পাহাড়ি মহানন্দার জলোচ্ছ্বাস যেন সহাবস্থান করতে চায় তাদের সঙ্গে (Mahananda River Flooding)। কখনও সেই জলোচ্ছ্বাস নিজের অধিকার জাহিরে মনে করিয়ে দেয় আরেকটু জল বাড়লেই ছাড়তে হবে ঘর। সোমবার রাতভর বৃষ্টির পরিণতিও ব্যতিক্রম নয় তার। ভোর হতেই কালো মেঘের আস্তরণ যেন দুশ্চিন্তার পাহাড় হয়ে জায়গা করেছে শহরের মহানন্দা তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকার স্থানীয়দের মনে। তবে এই দুর্ভোগের চিরাচরিত দৃশ্যে জীবনকে উপভোগ করে ব্যতিক্রমী ছবিও আঁকা যায়, বোঝাল কয়েকজন। না, তারা বিশেষ কেউ নয়। মহানন্দা তীরবর্তী ওই জলমগ্ন পরিবারেরই কয়েকজন খুদে। এই অনিশ্চয়তার মাঝেও নিশ্চিন্তে পাড়ি দিচ্ছে তাদের কাগজের নৌকা। এই দৃশ্যেই ক্ষণিকের জন্য ভেসে যাচ্ছে ‘এরপর কী হবে!’-র দুশ্চিন্তা।
মহানন্দার পাড়ে দাঁড়ালে বোঝা যায়, পাহাড় থেকে নেমে আসা জল কতটা বদলে দিয়েছে মানুষের জীবন। নদী যেন নিঃশব্দে এগিয়ে এসে কড়া নাড়ছে ঘরের দরজায়। মৌসুমি মান, মমতা দাঁ, চুমকি সিং, তারাম মালি কিংবা গীতা সাহাদের মতো বহু পরিবারের মাথা গোঁজার একমাত্র আশ্রয় আজ উদ্বেগের মুখে। কেউ বাঁশের মাচায় জিনিসপত্র তুলে রাখছেন, কেউ আবার গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র গুছিয়ে স্থান দিচ্ছেন নিরাপদে। প্রত্যেকের চোখে একটাই প্রশ্ন—আর কতক্ষণ?
কিন্তু এই একই জল অন্য এক গল্পও বলছে। বড়দের চোখে যেখানে উদ্বেগ, সেখানে ছোটদের চোখে এক অন্য আমেজ। শুধু কাগজের নৌকা ভাসানোই নয়, পিংকি, বাসন্তী, তুলিকা, মনোজরা গামছা হাতে নেমে পড়েছে জলে। কেউ ছিটিয়ে দিচ্ছে জল, কেউ আবার সাঁতার কাটার ভঙ্গি করছে। তুলিকার হাতে ভাঁজ করা সাদা কাগজের নৌকাটি জলে ছেড়ে দিতেই সেটি স্রোতের টানে ধীরে ধীরে দূরে ভেসে যায়। তুলিকার কোলে বসে থাকা ছোট্ট বোন বিস্মিত চোখে সেই নৌকার দিকে তাকিয়ে থাকে। নৌকাটি যত দূরে সরে যায়, ততই তার মুখে ফুটে ওঠে নির্মল হাসি। চারপাশের দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা কিংবা বন্যার ভয়—এসবের কিছুই যেন স্পর্শ করতে পারে না তাদের শৈশবকে। বছর সাতেকের তুলিকা বলে ওঠে, ‘বড়রা বলছে জল আরও বাড়লে ঘর ছাড়তে হতে পারে। জানি না কী হবে। কিন্তু এই জলে বন্ধুদের সঙ্গে নৌকা ভাসিয়ে বেশ মজাই লাগছে।’ ছোট্ট পিংকির কথায়, ‘বাবা বলেছে বাড়িতে জল ঢুকলে, স্কুলে গিয়ে থাকতে হবে।’
আবার ওই হাসির আড়ালে জমে রয়েছে বড়দের দীর্ঘশ্বাস। ছেলেমেয়েদের শৈশবকে আঁকড়ে থাকার কাণ্ডকারখানার মধ্যে চোখ আটকে থাকছে ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়া জলের দিকে। চুমকি আঙুল দেখিয়ে বললেন, ‘সোমবার থেকে এদিন পর্যন্ত চার আঙুলেরও বেশি জল বেড়েছে। এইভাবে জল বাড়তে থাকলে আর দু’একদিনের মধ্যেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হবে।’ একই আশঙ্কা চুমকির প্রতিবেশীদেরও। তারামের দাবি, ‘প্রতি ঘণ্টায় জলের উচ্চতা বাড়ছে। বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তাই এখন থেকেই অনেক পরিবার বিকল্প আশ্রয়ের কথা ভাবতে শুরু করেছে।’
মঙ্গলবার শহরের ৮, ৯, ১২ কিংবা ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে বালুচরের বন্যাকবলিত এলাকায় স্থানীয় কাউন্সিলার পলি সরকার নিজেই দাঁড়িয়ে থেকে ভেঙে যাওয়া পানীয় জলের পাইপ ঠিক করাচ্ছিলেন। প্রশ্ন করতেই তিনি বলে ওঠেন, ‘এই গরিব মানুষগুলোকে ফি বছর বন্যার জলে ডুবতে হয়। করবেই বা কী? উঁচু এলাকায় জমি কিনে বাড়ি করার সামর্থ্য নেই ওদের। অগত্যা বছরের পর বছর ধরে ওদের এইভাবেই জলের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে হয়। যতটুকু পারি পাশে থাকার চেষ্টা করি।’

