শুভদীপ শর্মা, লাটাগুড়ি : কোনও গতির ধরাবাঁধা সর্বোচ্চ সীমা নেই। ডুয়ার্সের জঙ্গলের বুক চিরে হুহু করে ছুটছে গাড়ি। কিন্তু তাতে কোনও বন্যপ্রাণের ক্ষতি হওয়ার বিন্দুমাত্র আশঙ্কা নেই। কারণ মাটির সমতলে নয়, গাড়ি ছুটছে একেবারে দোতলা রাস্তার উপর দিয়ে।
স্বপ্ন মনে হচ্ছে? নীচে অটুট সবুজ বন, মাথার উপর দিয়ে ছুটছে দূরপাল্লার যান- এমন দিন হয়তো আর বেশি দূরে নেই। লাটাগুড়িতে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এমনই রাস্তা বানাবার চিন্তাভাবনা শুরু হয়ে গিয়েছে। লক্ষ্য একটাই-গতিও থাকবে, প্রকৃতিও থাকবে। কেবল বুনো বাঁচাবার কথা তো নয়, চার লেনের জাতীয় সড়ক বানাতে গিয়ে যাতে হাজার হাজার গাছ কাটতে না হয়, তার বিকল্প হিসেবেই ৭১৭ নম্বর জাতীয় সড়কের জঙ্গল অংশে ডাবল ডেকার লেন তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও গোটা বিষয়টি এখনও প্রাথমিক পরিকল্পনার স্তরেই রয়েছে।
সম্প্রতি চালসা গোলাই থেকে চ্যাংরাবান্ধা ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট পর্যন্ত ৭১৭ নম্বর জাতীয় সড়কের দায়িত্ব জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের হাত থেকে ন্যাশনাল হাইওয়ে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড (এনএইচআইডিসিএল)-এর হাতে এসেছে। বর্তমানে প্রকল্পের ডিপিআর (ডিটেলড প্রোজেক্ট রিপোর্ট) তৈরির কাজ চলছে। এনএইচআইডিসিএল-এর জেনারেল ম্যানেজার রাহুল গুপ্তা বলেন, ‘ডাবল ডেকার রোড প্রকল্পের ডিপিআর তৈরির কাজ চলছে। পরিবেশ ও বনাঞ্চলের ক্ষতি যতটা সম্ভব এড়িয়ে কীভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়, সেই বিষয়টিকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
প্রশাসন সূত্রের দাবি, বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য, উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য এই জাতীয় সড়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই তাই এই রাস্তাকে চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু সেই কাজে সবচেয়ে বড় বাধা লাটাগুড়ি ও গরুমারা জাতীয় উদ্যানের প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বনাঞ্চল। সেখানে সাধারণ নিয়মে চার লেনের রাস্তা তৈরি করতে গেলে বিপুল সংখ্যক গাছ কাটার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিকল্প হিসেবে ডাবল ডেকার লেনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই ব্যবস্থায় বর্তমান রাস্তার উপরে আরও একটি উঁচু রাস্তা বা ফ্লাইওভার তৈরি করা হবে। নীচের রাস্তা দিয়ে স্থানীয় যানবাহন চলবে, আর উপরের রাস্তা ব্যবহার করবে দ্রুতগতির ও দূরপাল্লার যানবাহন। ফলে নতুন করে রাস্তা চওড়া করার প্রয়োজন অনেকটাই কমবে। বনভূমির উপর চাপও কমবে।
এই মুহূর্তে ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দীর্ঘ পূর্ণাঙ্গ ডাবল ডেকার হাইওয়ে চালু রয়েছে, ভারতে এমন উদাহরণ নেই। তবে কাজিরাঙ্গা জাতীয় উদ্যানের মধ্যে দিয়ে যাওয়া জাতীয় সড়কের উপর প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড করিডর নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য, নীচ দিয়ে নির্বিঘ্নে হাতি, গন্ডার, হরিণ সহ বন্যপ্রাণী চলাচল করবে, আর উপরে যানবাহন চলবে। সেখানে কিন্তু নীচের রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলবে না। আর পেঞ্চ টাইগার রিজার্ভেও এনএইচ-৪৪’এর কিছু অংশে এলিভেটেড সেকশন ও আন্ডারপাস তৈরি করা হয়েছে, যাতে বাঘ সহ অন্যান্য প্রাণীর চলাচল বাধাগ্রস্ত না হয়। সেখানেও দোতলা রাস্তার দুটিতেই গাড়ি চলার উদাহরণ নেই। যদি শেষপর্যন্ত ডুয়ার্সে জঙ্গল বাঁচিয়ে ডাবল ডেকার লেন নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়, তবে তা উত্তরবঙ্গের পাশাপাশি গোটা দেশেই পরিবেশবান্ধব পরিকাঠামো নির্মাণের এক নতুন দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। ডুয়ার্স ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ফোরামের যুগ্ম সম্পাদক দিব্যেন্দু দেব বলেন, ‘এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু একটি জাতীয় সড়কই থাকবে না, বরং ডুয়ার্সের অন্যতম দর্শনীয় আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।’
এর আগে লাটাগুড়িতে রেল ওভারব্রিজ নির্মাণের সময় বহু গাছ কাটা হয়েছিল। তখন লাগাতার আন্দোলন করেও তা রোখা যায়নি। এবার রাস্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রশাসনের এমন ইতিবাচক ভূমিকার প্রশংসা করেছেন পরিবেশপ্রেমীরা। উত্তরবঙ্গ পরিবেশ সংগঠনের যৌথ মঞ্চের আহ্বায়ক অনির্বাণ মজুমদার বলেন, ‘পরিবেশ রক্ষা করে যদি ডাবল ডেকার লেনের মতো বিকল্প কোনও উপায় বের করা যায়, সেটিকে অবশ্যই ইতিবাচকভাবে দেখা হবে।’

