হরিশ্চন্দ্রপুর: বর্ষাকাল সবে শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে শুরু হয়েছে ব্যাপক বৃষ্টি। বৃষ্টিপাতের জেরে জলস্তর বাড়তে শুরু করেছে হরিশ্চন্দ্রপুর (Harishchandrapur) থানা এলাকার ফুলহর নদীতে। জল বাড়ার সঙ্গেই দেখা দিয়েছে নদীভাঙনের সেই চেনা আতঙ্ক।
ফুলহর নদীর অসংরক্ষিত এলাকায় থাকা ইসলামপুর (Islampur) অঞ্চলের রশিদপুর গ্রামে শুরু হয়েছে নদীভাঙন। গত কয়েকদিন ধরে নদীর জল ও স্রোতের গতিবেগ এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে যাওয়ায় নদীর দক্ষিণ তীরবর্তী রশিদপুর এলাকায় ভেঙে পড়ছে নদীর পাড়। বিঘার পর বিঘা জমি নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন রশিদপুর সহ সংলগ্ন একাধিক গ্রামের বাসিন্দারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, রশিদপুর এলাকাতে ফুলহর নদী (Fulahar River) প্রায় ৯০ ডিগ্রি কোণে একটি বাঁক নিয়েছে। ওই কারণে নদীর জল সামান্য বাড়লেই স্রোতের অভিমুখ এসে আঘাত করে রশিদপুরের পাড়ে। ফলে সেখানে ঘূর্ণন তৈরি হয়, যার ফলে মাটির তলার অংশ ক্ষয়ে যায়। বর্তমানে আগ্রাসী ফুলহর প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে আসছে জনবসতির দিকে।
ফুলহরের দক্ষিণ তীরবর্তী এই অসংরক্ষিত অংশে রয়েছে ভাকুরিয়া, কাউয়াডোল, মিরপাড়া এবং তাঁতিপাড়ার মতো একাধিক গ্রাম। নদীর জল বাড়লে যেমন ভাঙন দেখা দেয়, তেমনই জল কমলে পাড় ধসে পড়ে। ফলে প্রায় সারাবছরই ওই এলাকার বাসিন্দাদের নদীভাঙেনর মুখোমুখি হতে হয়। ইতিমধ্যেই বহু কৃষকের চাষের জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে।
স্থানীয় কৃষক কুন্দন যাদব ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘নদীর জল বাড়লেও আমাদের ক্ষতি, আবার জল কমলে ভাঙনে কৃষিজমি শেষ হয়ে যায়। ভাঙনের আতঙ্কে এখন থেকে আমরা সপরিবারে রাত জাগতে শুরু করেছি। আমরা ত্রাণ চাই না, সরকার আমাদের স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করুক।’
নদীভাঙনের কবলে পড়ে ঘরবাড়ি হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটছে রশিদপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ আকাশেরও। তিনি জানান, উত্তরবঙ্গে বৃষ্টির জেরে নদীর জল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনও শুরু হয়েছে। আর মাত্র কিছুটা অংশ ভাঙলেই তাঁর নিজের বাড়িও ফুলহরে মিশে যাবে। পরিবার নিয়ে তিনি আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটােচ্ছন। রাজ্যের নতুন সরকার দুর্গতদের নিয়ে কী ভাবছে, তা এখনও বোঝা যাচ্ছে না।
এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও ভাঙন রোধে কোনও স্থায়ী সমাধান করা হয়নি। নদী ভাঙনে যাঁরা ঘরবাড়ি ও জমি হারিয়েছেন, তাঁদের পুনর্বাসন দেওয়ার আশ্বাস কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। বিগত সরকারের আমলে ভাঙন রোধের জন্য একটি প্রোজেক্ট তৈরি করে ওপরমহলে পাঠানো হলেও সেই কাজ আর এগোয়নি। গত বছর ভাঙন রুখতে তড়িঘড়ি করে নদীর পাড়ে বাঁশ পোঁতা এবং বালির বস্তা ফেলার মতো কিছু অস্থায়ী কাজ করা হয়েছিল, যা ফুলহরের স্রোতের মুখে তাসের ঘরের মতো ভেসে গিয়েছে।
এদিকে সেচ দপ্তরের আধিকারিকদের দাবি, নদীর দক্ষিণ পাড়টি অসংরক্ষিত অঞ্চল এবং বাঁক থাকায় সেখানে প্রাকৃতিক নিয়মে ভাঙন হবেই। তা রোধ করা কঠিন। তবে হরিশ্চন্দ্রপুর-২ ব্লক প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, নদীর বর্তমান পরিস্থিতির ওপর চব্বিশ ঘণ্টা নজর রাখা হচ্ছে এবং সেচ দপ্তরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
এমন একটি সংকটের মুখে এলাকার বিধায়ক মতিবুর রহমান গ্রামবাসীদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘আমি রশিদপুরের এই ভয়াবহ ভাঙনসমস্যার কথা রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে জানিয়েছি। আশা করছি, সরকার ইতিবাচক পদক্ষেপ করবে।’

