সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, মায়ামি: ‘আমরা ঐক্যবদ্ধ,’ নকআউটে পৌঁছেই বার্তা দিলেন লিওনেল মেসি (FIFA World Cup 2026)।
সামাজিক মাধ্যমে কমই থাকেন তিনি। আসলে নিজের তৈরি করা বৃত্তই বোধহয় পছন্দ তাঁর। এমনকি তাঁকে এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে নিয়ে যে দড়ি টানাটানি, সমর্থকদের মধ্যে, সেই বিষয়েও খুব বেশি প্রতিক্রিয়া কখনও পাওয়া যায়নি মেসির কাছ থেকে। না, এবারও যখন তিনি একের পর এক গোল করছেন, রেকর্ড গড়ছেন আর অন্যদিকে তাঁর প্রতি বিরক্তি দেখিয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর পর্যন্ত দিতে অস্বীকার করেছেন রোনাল্ডো তখনও কোনও প্রতিক্রিয়া নেই মেসির দিক থেকে। এবারই বোধহয় প্রথম কোনও বিশ্বকাপে এত হালকা মেজাজে দেখা যাচ্ছে তাঁকে। এর আগে কী বিশ্বকাপ, কী কোপা আমেরিকা, প্রতিটি টুর্নামেন্টে যেন বোঝার পাহাড় মাথায় নিয়ে নামতে দেখা যেত তাঁকে। যাই করুন না কেন, দেশকে ট্রফি দিতে পারেননি, আপনি কীসের সেরা, এই ভূত তাড়া করে বেড়াত তাঁকে। কিন্তু দেশকে ইতিমধ্যেই কোপা আমেরিকা এবং বিশ্বকাপ উপহার দেওয়ার পর আর সেই ভার নিয়ে চলতে হয় না তাঁকে। এখন তিনি নির্ভার, শুধু উপভোগ করতেই সম্ভবত মাঠে নামেন। তবু তিনি অধিনায়ক এবং এমন একটা দেশের, যে দেশটা ফুটবলে বাঁচে। যে দেশ প্রতি দশকে একজন করে সেরা উপহার দেয়। তাই কিছু দায় তো থেকেই যায়। সেই কারণেই জর্ডনকে হারিয়ে নকআউটে পৌঁছে সামাজিক মাধ্যমে মেসির বার্তা, ‘আরও একটা জয় দিয়ে গ্রুপ পর্যায় শেষ হল। আমরা এখনও ঐক্যবদ্ধ।’ অর্থাৎ পরবর্তী পর্যায়ের জন্য একইরকম ক্ষুধার্ত।
গ্রুপ লিগের তিন ম্যাচেই জয়। ইতিমধ্যেই গোল করে মেসি গোল্ডেন বুটের দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে গেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি গড়ে ফেলেছেন একাধিক রেকর্ডও। ১৯ গোল করে সর্বাধিক গোলদাতার তালিকায় অনেকটাই এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তিনিই প্রথম ফুটবলার হিসাবে টানা সাত ম্যাচে গোল করার মাইলস্টোন ছুঁয়ে ফেললেন। ১৯৯৮ সালে নতুন ফর্ম্যাট হওয়ার পর থেকে তিনি বিশ্বের চার নম্বর ফুটবলার যে একটা বিশ্বকাপের গ্রুপ লিগের সব ম্যাচে গোল পেলেন। এর আগে ফার্নান্দো টোরেস ও দাভিদ ভিয়া ২০১০ সালে ও রোনাল্ডো ২০১৮ সালে একইভাবে গ্রুপ লিগের তিন ম্যাচেই গোল করেন। আর শুধু কি মেসি? আর্জেন্টিনাও যে ব্রাজিল ও জার্মানির পর তৃতীয় দেশ হিসাবে বিশ্বকাপে ৫০ ম্যাচ জেতার কৃতিত্ব অর্জন করল। কিন্তু এত কিছুর পরেও স্বস্তিতে নেই লিওনেল স্কালোনি। এই প্রথমবার বিশ্বকাপের আঙিনায় আসা কেপ ভার্দের মতো দলের বিপক্ষে মাঠে নামার আগেও রীতিমতো সতর্ক আর্জেন্টিনা হেড কোচ। বিশ্বকাপে সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশু হলেও কেপ ভের্দে ছোট করে দেখছেন না তিনি। গ্রুপে স্পেনের পরেই দ্বিতীয় হয়ে নকআউটে এই দল। ছিটকে দেয় দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়েকে। তাই স্কালোনি বলেই দেন, ‘কেপ ভের্দের নকআউটে ওঠা আমাকে একেবারেই অবাক করেনি। কারণ দলটা সত্যিই ভালো।’ তিনি যোগ করেছেন, ‘খুবই কঠিন প্রতিপক্ষ। যার বিশ্বকাপ জেতার অন্যতম দাবিদার স্পেনকে বেগ দিয়েছে এবং একইসঙ্গে উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের মতো দলকে পিছনে ফেলে উঠে এসেছে। প্রতিভার সঙ্গে গতি আছে দলটার।’ স্কালোনি নিজের কাজ শুরু করে দিলেও ফুটবলাররা অবশ্য এখন নিজেদের খেলাতেই ফোকাস ঠিক রাখতে চান। গুইলিয়ানো সিমিওনে যেমন জর্ডন ম্যাচের পর বলেছেন, ‘আমরা নিজেদের খেলায় ফোকাস রাখছি। কারণ জানি প্রতিপক্ষ খুবই চ্যালেঞ্জিং। নিজেদের সেরা অস্ত্রে শান দিয়ে প্রতিপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।’ জর্ডন ম্যাচের অন্যতম গোলস্কোরার লওটারো মার্টিনেজ বলেছেন, ‘আমরা প্রথম লক্ষ্য পূরণ করে ফেলেছি। এবার দ্বিতীয় রাউন্ড এবং আরও সামনের দিকে তাকাতে হবে। আর কাল থেকেই এই পরবর্তী লক্ষ্যের জন্য তৈরি হতে হবে। কেপ ভার্দেকে ছোট করে দেখার কোনও কারণ নেই।’ ৩ তারিখ মায়ামিতেই খেলবে এই দুই দল। তবে তার আগে ডালাস থেকে নিজেদের বেস ক্যাম্প কানসাসেই ফিরে গেল আর্জেন্টিনা।
৬ লক্ষের কম মানুষের দেশ এই কেপ ভের্দে। তারপরেও তাদের এই উত্থান অবাক করেছে সারা বিশ্বকে। তবে আপাতত বিশ্বকাপের নকআউটে ওঠায় সে দেশে খুশির জোয়ার। ওদেশে এখন প্রায় রূপকথার নায়কে পরিণত ৪০ বছরের গোলকিপার ভোজিনহা। তাঁর হাত ধরেই বিশ্বকাপ থেকে মেসিদের বিদায়ের স্বপ্ন দেখছেন কেপ ভের্দের মানুষ। ভোজিনহা নিজেই বলছেন, ‘আমাদের কেউই কখনও এই স্বপ্ন দেখেছিল বলে আমার মনে হয় না। কিন্তু এটাও ঠিক যে আমাদের ক্ষমতা আছে। পরের রাউন্ডে যাওয়াটা আমাদের কাছে স্বপ্নের মতো। আর যে কোনও ফুটবলারের আর্জেন্টিনা ও মেসির বিপক্ষে খেলা একটা স্বপ্ন।’ উরুগুয়েকে ছিটকে দিয়ে ওঁরা যখন সত্যিই নিজেদের স্বপ্নের দরজা খুলে ফেলেছেন তখন দলের হাডলে দাঁড়িয়ে নাকি অনেকেই কেঁদে ফেলেন। যে কান্না সুখের, স্বপ্ন সত্যি করার।

