জয় মণ্ডল, নিউ ইয়র্ক: ডালাস থেকে নিউ ইয়র্কে ফিরেছি। কিন্তু গত কয়েকদিনের চরম ব্যস্ততা আর মাঠের উত্তেজনার রেশ যেন এখনও মন থেকে কাটেনি। আমরা যারা দিনরাত খবরের পেছনে ছুটি, ল্যাপটপের কি-বোর্ডে শব্দ বুনে পাঠকদের কাছে মাঠের ঘাম, রক্ত আর উন্মাদনার গল্প পৌঁছে দিই, তারা সাধারণত খবরের পেছনের মানুষ হয়েই থেকে যাই। কিন্তু ডালাসের মিডিয়া সেন্টারে এমন একজনের মুখোমুখি হলাম, যিনি নিজেই আস্ত এক ইতিহাস (Enrique Macaya Marquez)।
গত ২৭ জুন জর্ডন ম্যাচের আগে আমি যখন আপনাদের জানিয়েছিলাম যে ‘দ্বিতীয়ার্ধে নামবেন মেসি’, সেই খবরের আসল কৃতিত্ব কিন্তু আমার নয়। কৃতিত্বটা এক ৯১ বছরের ‘তরুণ’-এর, যাঁর নাম এনরিকে মাকায়া মার্কেজ। ডালাসের প্রেস কনফারেন্স রুমে তিনি যখন শান্ত গলায় কোচ স্কালোনিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘লিওনেল মেসি কি আগামীকাল প্রথম থেকে খেলবে?’, তখন এক অভাবনীয় দৃশ্যের সাক্ষী থাকল গোটা বিশ্ব। স্কালোনি, যিনি সাধারণত প্রথম একাদশ নিয়ে টুঁ শব্দটি করেন না, তিনি মুহূর্তে যেন এক মুগ্ধ ছাত্রে পরিণত হলেন। প্রোটোকলের তোয়াক্কা না করে বললেন, ‘এই প্রশ্নের উত্তর আমি অন্য কাউকে দিতাম না, কিন্তু যেহেতু আপনি জিজ্ঞেস করেছেন, তাই বলছি… মেসি শুরু থেকে খেলবে না, ওকে দ্বিতীয়ার্ধে নামাব।’ শুধু তাই নয়, সাংবাদিক সম্মেলন শেষে পোডিয়াম থেকে নেমে এসে মাকায়াকে পরম শ্রদ্ধায় জড়িয়ে ধরলেন বিশ্বজয়ী কোচ। আর মাকায়া? তাঁর সেই স্বভাবসিদ্ধ স্নিগ্ধ হাসিতে উত্তর দিলেন, ‘আপনি যে আমার জন্য উত্তর দিয়েছেন, এতেই আমি খুশি।’
কে এই মাকায়া? ১৯৩৪ সালে বুয়েনস আয়ার্সে জন্মানো এই মানুষটি ফুটবল সাংবাদিকতার এক হিমালয়। ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপ দিয়ে তাঁর পথ চলা শুরু। সে এক অন্য যুগ! আজকের মতো বিলাসবহুল চার্টার্ড ফ্লাইট বা হাইস্পিড ইন্টারনেটের সুবিধা তখন ছিল না। ২৩ বছরের এক স্বপ্নাতুর তরুণ সাংবাদিক হিসেবে আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিলেন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ফুটবলারদের সঙ্গে, একই বিমানে বসে। সেই থেকে শুরু। পেলের জাদুকরি উত্থান, দিয়েগো মারাদোনার সেই রূপকথার ‘গোল অফ দ্য সেঞ্চুরি’ থেকে শুরু করে লিওনেল মেসির বিশ্বজয়- সবকিছুরই চাক্ষুষ সাক্ষী তিনি। ২০২৬ সালের এই আসর তাঁর কেরিয়ারের টানা ১৮তম বিশ্বকাপ! ভাবা যায়? ফুটবল ইতিহাসে এমন রেকর্ড আর কারও নেই।
ডালাসের মিডিয়া সেন্টারের লাউঞ্জে কফির কাপ হাতে তাঁর সঙ্গে বেশ কিছুটা সময় কাটানোর এক দুর্লভ সুযোগ আমার হয়েছিল। ৯১ বছর বয়সেও মানুষটার মেরুদণ্ড টানটান, চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। উবালদো ফিলোল বা মারিও কেম্পেসের মতো কিংবদন্তিরা যাঁকে সমকক্ষ হিসেবে সম্মান করেন, সেই মানুষটার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বুঝলাম, সত্যিকারের মহীরুহরা কতটা বিনয়ী হন! আমার ভাঙা ভাঙা স্প্যানিশে যখন তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলাম, মিষ্টি হেসে আমার কাঁধে হাত রেখে ইংরেজিতেই বললেন, ‘আমি তো শুধু ফুটবলকে ভালোবেসেছি।’ এতগুলি দশক ধরে ফুটবলের বিবর্তন দেখেছেন খুব কাছ থেকে। তাঁর মতে, গত সাত দশকে ফুটবলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হল খেলোয়াড়দের গতি আর অ্যাথলেটিসিজম। আশ্চর্যের বিষয় হল, তিনি কাউকে ‘সর্বকালের সেরা’ তকমা দিতে চান না। পেলে, মারাদোনা না মেসি- এই চিরন্তন তর্কে না গিয়ে তিনি মনে করেন, ভিন্ন যুগের ভিন্ন প্রেক্ষাপটকে এক মাপকাঠিতে মাপা নিতান্তই বোকামি।
ডালাসের সেই মিডিয়া সেন্টারে স্কালোনির ওই উষ্ণ আলিঙ্গন আর মাকায়ার সেই স্নিগ্ধ হাসিটা আমাকে একটা বড় শিক্ষা দিয়ে গেল। খবরের এই অবিরাম ইঁদুরদৌড়ে আমরা অনেক সময় ভুলে যাই যে, পেশার প্রতি সততা, গভীর জ্ঞান আর অসীম বিনয় থাকলে খবর নিজেই এসে ধরা দেয়। ৯১ বছরের মাকায়া মার্কেজ শুধু ১৮টি বিশ্বকাপ কভার করা এক রেকর্ডধারী সাংবাদিক নন, তিনি আমাদের পেশার এক ধ্রুবতারা, এক সত্যিকারের ফুটবল রোমান্টিক।

