শতবর্ষের প্রাচীনতা পেরিয়ে মালদার হবিবপুরের তিলাসনে আজও স্বমহিমায় টিকে রয়েছে রায় পরিবারের ঐতিহ্যমণ্ডিত দুর্গাপুজো। জমিদারি ফুরোলেও শিকড়ের টানে প্রথা মেনে পালিত হয় এই পুজো।
স্বপনকুমার চক্রবর্তী, হবিবপুর: জমিদারি প্রথা নেই, নেই সেই প্রভাব-প্রতিপত্তিও। সময়ের স্রোতে বদলে গিয়েছে চারপাশের জীবনযাত্রা। কিন্তু বদলায়নি একটি পরিবারের বিশ্বাস, শিকড়ের টান আর দুশো বছরেরও বেশি পুরোনো দুর্গাপুজোর (Durga Puja 2026) পরম্পরা। মালদার (Malda) হবিবপুর (Habibpur) ব্লকের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ১০০ মিটারের মধ্যে তিলাসনে আজও ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে রায় পরিবারের প্রাচীন জমিদারবাড়ি ও ঠাকুরদালান। এখানেই হয় দুর্গাপুজো। চলতি বছরে ২২৬ বছরে পা দিল এই পুজো।
পুরোনো জমিদার পরিবারের নবম বংশধর রাকেশকুমার রায় বলেন, ‘পরিবারের পূর্বপুরুষ অবোধনারায়ণ রায় তিলাসনে জমিদারবাড়ি প্রতিষ্ঠার সময়ই দুর্গাপুজোর সূচনা করেছিলেন। সেই শুরু। এরপর প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়েছে, বিলুপ্ত হয়েছে জমিদারি প্রথা, কিন্তু থামেনি দেবীর আরাধনা। পরিবারের বংশধর হিসেবে আমি দীর্ঘ বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো পরিচালনা করে ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছি।’
এই পুজোর আকর্ষণ শুধু প্রাচীনত্বে নয়, জড়িয়ে থাকা একাধিক ব্যতিক্রমী রীতিতেও। মহাসপ্তমীর সকালে পূর্ণভবা নদী থেকে ঘট ভরে জল আনার পর পুরোনো প্রথা মেনে বন্দুক থেকে পাঁচ রাউন্ড গুলি ছুড়েই পুজোর আনুষ্ঠানিকতার সূচনা হয়। রায় পরিবারের রাজকীয় অতীতের স্মৃতিবাহী প্রাচীন অস্ত্রশস্ত্রেরও পুজো হয় এই সময়। আরও একটি বিরল রীতি আজও সকলের নজর কাড়ে। মা দুর্গার কাছে থাকা গণেশের দুই পা কাপড় দিয়ে বেঁধে রেখে পুজো করা হয়। সিদ্ধিদাতা গণেশ যাতে মায়ের কাছ থেকে কোথাও চলে না যান, তাই এই ব্যবস্থা। বাড়িতে রাধাকৃষ্ণের মন্দির থাকায় পুরোনো জমিদারবাড়ির এই দুর্গাপুজোয় বলিপ্রথা নেই। তবে নিষ্ঠার সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় কুমারীপুজো। নেই আধুনিক থিমের চাকচিক্য, নেই চোখধাঁধানো মণ্ডপ। আছে পুরোনো জমিদারবাড়ির আবহ, ধূপধুনোর গন্ধ আর ঐতিহ্যের স্পর্শ। একসময় এই পুজো রায় পরিবারের হলেও এখন তা সর্বজনীন। তবে প্রাচীন রীতি মেনে তিলাসনের প্রতিটি ঘরে ঘরে নিমন্ত্রণ পৌঁছে যায়। সব ভেদাভেদ ভুলে গ্রামবাসীরাও শামিল হন উৎসবে। পুজোর কয়েকটি দিন সকলের মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়ে ওঠে রায় পরিবারের পুজোর আঙিনা। বিজয়া দশমীতে পূর্ণভবা নদীর জলেই প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় উৎসব। জমিদারি নেই, রাজকীয় জৌলুসও নেই, তবু ২২৬ বছর পরেও তিলাসনের পুজো প্রমাণ করে, ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তরাধিকার সম্পত্তি নয়, পরম্পরা।

