অমৃতা দে, দিনহাটা: বাড়ি থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে কাঁটাতারের বেড়া। সীমান্তের কোলেই বেড়ে উঠেছেন পাকিস্তানি গুপ্তচর (Pakistani spy) সন্দেহে ধৃত রশিদুল হক। দিনহাটা (Dinhata)-২ ব্লকের শুকারুকুটি গ্রাম পঞ্চায়েতের থরাইখানা গ্রামের এই তরুণের কাছে সীমান্তের ভূগোল হাতের তালুর মতো চেনা। ছোট থেকে পাচারচক্রের কার্যকলাপ দেখেছেন রশিদুল। ফলে অন্ধকার জগতের প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হওয়াটা তাঁর জন্য খুব অস্বাভাবিক নয়, এমনটাই বলছেন পাড়াপড়শিরা। এমনকি রশিদুলের গ্রেপ্তারিতে তাঁরা খুব একটা অবাক নন। আগেও গাঁজা ও গোরু পাচারে তাঁর নাম জড়িয়েছে বলে পড়শিরা জানালেন। যদিও পরিবারের দাবি, রশিদুল সম্পূর্ণ নির্দোষ। তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে বলে অভিযোগ।
রবিবার থরাইখানা গ্রামের সরু গলি পেরিয়ে রশিদুলদের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, অভাবের ছাপ চতুর্দিকে। মাটির মেঝে। টিনের দেওয়াল। টিনের ছাউনি। বাড়ির চারপাশে পাটকাঠির বেড়া। বাড়িতে পুলিশের তল্লাশির নিদর্শন স্পষ্ট। জিনিসপত্র এখনও লন্ডভন্ড রয়েছে। রশিদুলের মা রহিমা বিবি জানালেন, তাঁর ছেলে কুর্শাহাট উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। এরপর তিনি পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে বেঙ্গালুরু চলে যান। এক বছর আগে পুরোপুরি গ্রামে ফেরেন। এর মাঝে অবশ্য রশিদুল বিয়ে করেন। তাঁর এক মেয়ে রয়েছে। গ্রামে ফিরে রশিদুল কখনও কৃষিকাজ, কখনও রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন।
পরিবারের দাবি, গত বৃহস্পতিবার নয়ারহাট বাজার থেকে সাহেবগঞ্জ (Sahebganj) থানার পুলিশ রশিদুলকে গ্রেপ্তার করে। কেন তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল, সে বিষয়ে তখন কিছুই তাঁরা জানতেন না। এমনকি গ্রামের মানুষের থেকে তাঁরা জানতে পারেন, রশিদুলকে পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়েছে। এরপর শুক্রবার গভীর রাতে পুলিশ যখন হানা দেয়, তখন বাড়িতে ছিলেন রশিদুলের বাবা-মা, স্ত্রী, ছোট সন্তান, দিদি-জামাইবাবু এবং দুই দাদা ও তাঁদের স্ত্রী। পুলিশ রশিদুলের স্ত্রী নুরবানু খাতুনকে শনাক্ত করে বাড়ির মহিলাদের এক ঘরে এবং পুরুষদের অন্যত্র রাখে। তল্লাশির পর বাড়ি থেকে পাঁচটি ফোন বাজেয়াপ্ত করা হয়।
রশিদুলের বাবা ওয়াহেদ আলি কৃষিকাজ করেন। দুই দাদা দীর্ঘদিন ভিনরাজ্যে কাজ করছেন। পরিবারের প্রত্যেকের দাবি, রশিদুল অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন এবং গুপ্তচর বৃত্তির সঙ্গে তাঁর যোগ নেই। তবে বাড়ির বাইরে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে অন্য কথা। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, আগে ট্রেনে গাঁজা পাচারের অভিযোগে রশিদুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। গোরু পাচারচক্রের সঙ্গেও তাঁর যোগ ছিল বলে গুঞ্জন রয়েছে। রশিদুলের বাড়িতে বাইরের ব্যক্তিদের যাতায়াত ছিল কি না, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। যদিও নুরবানু সেই দাবিকে নস্যাৎ করে বলেছেন, ‘কারও যাতায়াত ছিল না। আমার স্বামী কৃষিকাজ ছাড়া কিছু করতেন না। অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।’ এদিকে, রশিদুলের নামে মোট ছয়টি সিমকার্ডের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। যার মধ্যে দুটি সিম পাকিস্তানে সক্রিয় বলে অভিযোগ। এছাড়া আরও কিছু সিমের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিটি সিমের ব্যবহার এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয় খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তদন্তকারীদের অনুমান, সিম তোলার জন্য যাঁদের নথি ব্যবহার করা হত, তাঁরা স্বেচ্ছায় নিজেদের নথি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দিতেন। ফলে তাঁরাও তদন্তের বাইরে নন। ইতিমধ্যে ওই সমস্ত ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে।

