রাহুল মজুমদার, দার্জিলিং: শীতের জামা গায়ে ধোঁয়া ওঠা কাপ ঠোঁটে ঠেকিয়ে দার্জিলিং চায়ে (Darjeeling Tea) চুমুক দিতেই জুড়িয়ে যায় প্রাণ। রোদ ঝলমলে আকাশ। কোনায় কিছুটা মেঘ। বুদ্ধের অবশ্য ঘুম ভাঙেনি। সাদা চাদর মুড়িয়ে তিনি তখন ঘুমিয়ে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে। কেভেন্টার্সের ছাদে বসে কাঞ্চনজঙ্ঘায় যখন চোখ আটকে, তখন ওয়েটার নিয়ে আসেন ইংলিশ ব্রেকফাস্ট প্ল্যাটার। চিকেন সসেজটি কাঁটাচামচে তুলে মুখে পুরতেই… আহা! গ্লেনারিজের (Glenary’s) চকোলেট বা ড্রাইফ্রুট মাফিনের ভক্ত ছড়িয়ে দেশ থেকে বিদেশে। ট্রেনে আসতে আসতে ফোনে দক্ষিণ ভারতের এক বন্ধুকে এসবই বলছিলেন সল্টলেকের অমলিতা মজুমদার। বছরদশেক পর ফের তিনি বেড়াতে এসেছেন শৈলশহরে।
কিন্তু চিরদিন কি কাহারো সমান যায়? নামের খ্যাতির জোরে কি বেশিদিন ভিড় আটকে রাখা সম্ভব হয়? পর্যটন মরশুমেও লম্বা লাইন চোখে পড়ছে শুধুমাত্র ‘আশা’কে ঘিরে। কিছুটা দূরে আরেক বিখ্যাত কাফেটারিয়ার অধিকাংশ বসার জায়গা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মেলে না এখন। অমলিতা সব দেখে, চেখে তাই ভীষণরকম হতাশ।
দার্জিলিংয়ের (Darjeeling) বিখ্যাত সেই কাফেটারিয়া ও ক্যাফে কাম বেকারির একচ্ছত্র আধিপত্যতে ভাগ বসিয়েছে ফ্লুরিস। ভিড় টানতে জোর টক্কর দিচ্ছে ব্রিটিশ আমলে কলকাতায় তৈরি ওই ব্র্যান্ডের নতুন আউটলেট। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে, জানালেন ওই ক্যাফের এক কর্মী। জনপ্রিয়তা বাড়ছে নেহরু রোডে থাকা ছোট ছোট স্থানীয় ক্যাফেগুলিরও।
ভিড় হ্রাস ও বৃদ্ধির অঙ্কে অন্যতম ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে খাবারের মান। বহু লোকের অভিযোগ, আগের তুলনায় অনেকটাই পড়েছে স্বাদ। কফি থেকে সসেজ, মাফিন থেকে অন্যান্য স্ন্যাক্স- সবেতেই বিখ্যাত দুই খাবারের জায়গা যেন ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। সেখানে প্রায় একই বা কিছুক্ষেত্রে কম দামে ভালো মানের খাবার পরিবেশন করে খাদ্রপ্রেমীদের মন জিতছে অন্যরা।
অক্টোবরের এক সন্ধ্যায় কথা হচ্ছিল মহারাষ্ট্রের এক দম্পতির সঙ্গে। বরাবরের মতো ওই দুই জায়গায় প্রাতরাশ সেরেছেন। খাবার নিয়ে তঁারা মোটেই সন্তুষ্ট নন। একটি টেক সংস্থার কর্মী সঞ্জয় আগরওয়ালও বললেন, ‘দুই জায়গায় আগেও খেয়েছি। ইংলিশ প্ল্যাটারে থাকা চিকেন সসেজের স্বাদ বাদে বাকি সব খাবারের মান নীচে নেমেছে। কফি তো সাধারণ দোকানগুলোর থেকেও খারাপ। দেখলাম, কিছু নতুন ক্যাফে খুলেছে। সেখানকার স্বাদ বেশ ভালোই।’
১৯১১ সালে সুইডেনের ব্যবসায়ী এডওয়ার্ড কেভেনটার কাফেটারিয়াটি শুরু করেছিলেন। এরপর ১৯৭০ সালে ‘ঝা’ পরিবারের হাতে হস্তান্তর হয়। বর্তমানে রাহুল ঝা ক্যাফের কর্ণধার। ইংলিশ প্ল্যাটার থেকে চিকেন স্যান্ডউইচ, চিজ অমলেট থেকে কফি- খাবারের প্রচুর বিকল্প। একসময় ভোর থেকে লাইন পড়ত ওই কাফেটারিয়ার সামনে। ভরা মরশুমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেন দেশ-বিদেশের পর্যটকরা। ১৮৮৫ সাল থেকে একইরকমভাবে রাজত্ব করে আসছিল গ্লেনারিজ। ব্রিটিশ ব্যবসায়ীর হাত ধরে পত্তন হলেও এখন এডওয়ার্ড পরিবার দায়িত্ব সামলাচ্ছে।
এই দুই সংস্থাকে এবার টেক্কা দিচ্ছে স্থানীয় ছোট ছোট ক্যাফে। মেনু কার্ডে প্রায় একই খাবার। কফি, স্ন্যাক্সে বৈচিত্র্য। সঙ্গে থাকছে বেকারি আইটেমও। অধিকাংশ জায়গায় তুলনামূলক কম খরচ। স্বাদে মন না ভরায় অনেকেই নতুন ঠিকানায় ঢুঁ মারছেন। সেখানে মন মজলে পরের ট্যুরে ‘টু ডু’র তালিকায় বদল হচ্ছে কাফেটারিয়ার নাম। পরামর্শ যাচ্ছে বন্ধু, স্বজনদের কাছেও।
গত রবিবার ছুটির দিনে পাহাড় ভিড়ে ঠাসা হলেও সকাল দশটায় নেহরু রোডের ক্লাব সাইডের সেই বিখ্যাত ক্যাফে দুটোতে কোনও লাইন চোখে পড়েনি। দার্জিলিং ম্যাল থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে থাকা বেকারির বাইরে দাঁড়িয়ে পর্যটকরা ছবি তুলতে ভিড় করলেও খাবার জায়গায় স্থানীয়দের উপস্থিতি বেশি নজরে এল।
