বালুরঘাট: কেন্দ্রীয় সরকারের ‘জ্ঞান ভারতম’ প্রকল্পে মূল্যবান পাণ্ডুলিপি, ঐতিহাসিক নথি, ছবি চিহ্নিত করে ডিজিটাইজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ দিনাজপুর (Dakshin Dinajpur) জেলা প্রশাসন সেসব নথির সন্ধানে বিশেষ সমীক্ষা শুরু করল। এজন্য জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি আধিকারিক, বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষ এবং ইতিহাস গবেষকদের নিয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ২৫টি পুঁথি ডিজিটাইজ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের দাবি, কারও কাছ থেকে সেসব নথি সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়া হবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে গিয়ে স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে ডিজিটাল প্রতিলিপি তৈরি করে তা কেন্দ্র সরকারের কেন্দ্রীয় ডেটাবেসে সংরক্ষণ করা হবে। ইতিহাসবিদদের মতে, দক্ষিণ দিনাজপুরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। অতীতে জেলার নানা প্রান্ত থেকে বহু প্রাচীন মূর্তি, পাণ্ডুলিপি ও ঐতিহাসিক ছবি উদ্ধার হয়েছে। সেই ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করতেই এবার জেলাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা পুঁথিগুলির তথ্য একত্র করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে পুঁথি সংক্রান্ত তথ্য জমা দেওয়ার আবেদন জানিয়েছে প্রশাসন। বালুরঘাটের ইতিহাস গবেষকদের কাছ থেকেও একাধিক পাণ্ডুলিপির নথি সংগ্রহ করা হয়েছে।
জেলায় প্রধানত দুই ধরনের পুঁথি পাওয়া যায়— তালপাতার পুঁথি এবং হাতে তৈরি কাগজ বা তুলোট কাগজের পুঁথি। বালুরঘাট জাদুঘরে এ ধরনের বহু পুঁথি রয়েছে পুরাণ, আয়ুর্বেদ, স্তোত্র, কবচ, তান্ত্রিক পূজাপদ্ধতি সহ নানা বিষয়ক। উদ্ধার হওয়া অধিকাংশ পুঁথির বয়স ১৫০ থেকে ২০০ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে একটি ভাগবত পুরাণের পাণ্ডুলিপির লিপিকাল ১৭২৮ খ্রিস্টাব্দ। এছাড়াও ব্রহ্মকৈবর্ত পুরাণ, রঘুনন্দন ভট্টাচার্যের দুর্গাপূজা পদ্ধতি, কালীপূজা পদ্ধতি, কপিলামঙ্গল, চৈতন্যচরিতামৃত, গৌড়শতকম, পাণ্ডুবদলন, প্রেমভক্তিচন্দ্রিকা ও রসমঞ্জরীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পুঁথি জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে।
বালুরঘাটের ইতিহাস গবেষক সমিত ঘোষ জানান, তাঁর কাছে অষ্টাদশ থেকে ঊনবিংশ শতকের মধ্যে রচিত একটি পূজাপদ্ধতির পাণ্ডুলিপি রয়েছে। যার তথ্য ইতিমধ্যে জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের মাধ্যমে নথিভুক্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দেশজুড়ে লক্ষ লক্ষ পুঁথি এখনও অযত্নে পড়ে রয়েছে। এগুলিকে রক্ষা করতে ২০০২ সালে ভারত সরকারের সংস্কৃতিমন্ত্রক রাষ্ট্রীয় পাণ্ডুলিপি মিশন গঠন করেছিল। তখন পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বে থাকা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ রত্না বসুর নেতৃত্বে মিশনের একটি দল ২০০৬ সালে বালুরঘাট কলেজ জাদুঘরে আসে। তাঁদের তরফে পুঁথি সংরক্ষণের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।’
বালুরঘাট কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সমিতকুমার সাহা জানান, তিনি মনসামঙ্গল কাব্যের ‘পদ্মামঙ্গল’ পুঁথির প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো একটি প্রতিলিপি আবিষ্কার করেছিলেন। প্রায় ৪০০ বছর আগে কবি জগজ্জীবনের রচিত মনসা বিষয়ক পুঁথির ওই প্রতিলিপি লিপিবদ্ধ করেছিলেন কবি মুকুন্দ। সেই পাণ্ডুলিপি সহ তাঁর কাছে সংরক্ষিত আরও কয়েকটি পুঁথির তথ্য ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে।
এই দুই গবেষকের মতো জেলার বহু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছেই মূল্যবান পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে বলে মনে করছে প্রশাসন। সেই সব পুঁথির সন্ধানেই এখন জেলাজুড়ে সমীক্ষা চালানো হচ্ছে। এ বিষয়ে জেলা শাসক বালা সুব্রহ্মণিয়ান টি বলেন, ‘দক্ষিণ দিনাজপুর ইতিহাসসমৃদ্ধ জেলা। তাই যাঁদের কাছে পুঁথি রয়েছে, তাঁদের তথ্য প্রশাসনের কাছে জানানোর অনুরোধ করছি।’
