কোচবিহার: কোচবিহারে (Cooch Behar) রাজপরিবারের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য ও আবহমানকালের রীতিনীতি বজায় রেখে পালিত হলো রাধাষ্টমী (Radhashtami) তিথি। এই পবিত্র দিনটিকে কেন্দ্র করে কোচবিহারের ঐতিহ্যবাহী বড়দেবীর মন্দিরে সম্পন্ন হলো বিশেষ পূজা (Boro Devi Puja), যার হাত ধরে শারদোৎসবের মূল প্রস্তুতি পর্ব আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে গেল। প্রাচীন প্রথা মেনে ভোরবেলায় মদনমোহন মন্দির থেকে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে ময়না কাঠকে বড়দেবীর মন্দিরে নিয়ে আসা হয়। এরপর দুধ, ঘি, মধু ও হলুদ সহ বিভিন্ন পবিত্র উপাদানের সাহায্যে ওই ময়না কাঠের মহাস্নান ও বিশেষ পূজা সম্পন্ন করা হয়। সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর পবিত্র কাঠটিকে একটি বিশেষ ট্রলির ওপর স্থাপন করা হয়। একই দিনে সকালে মদনমোহন মন্দির থেকে হনুমান দণ্ডও বড় দেবী মন্দিরে স্থানান্তরিত করা হয়। রাজ আমলের এই ঐতিহ্যবাহী পুজোয় বলি প্রথার নিয়ম রয়েছে। রাধাষ্টমীর দিন বিশেষ পূজা ও পায়রা বলির পর পরবর্তী তিন দিন কাঠামোকে হাওয়া লাগানোর নিয়ম পালন করা হয়। এরপর বংশপরম্পরায় কোচবিহার দেবত্র ট্রাস্ট বোর্ডের মূর্তি প্রস্তুতকারক চিত্রকর পরিবারের সদস্য প্রভাত চিত্রকর নাটাবাড়ির চামটা থেকে সংগৃহীত বিশেষ মাটি ও খড় দিয়ে বড়দেবীর মৃন্ময়ী মূর্তি গড়ার কাজ শুরু করবেন। আগামী মহালয়ার দিন এই প্রতিমা নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি মায়ের চক্ষুদান সম্পন্ন হবে এবং তারপরই শুরু হবে দেবীর মূল আরাধনা।
কোচবিহারের মহারাজাদের প্রতিষ্ঠিত দেবীবাড়িতে প্রায় পাঁচশো বছরেরও বেশি সময় ধরে এই বড় দেবীর দুর্গাপূজা হয়ে আসছে, যা অন্যান্য সাধারণ দুর্গোৎসবের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও অনন্য। প্রতি বছর শ্রাবণ মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে কোচবিহার শহরের গুঞ্জবাড়ির ডাঙরাই মন্দিরে ময়না কাঠের পূজার মধ্য দিয়ে এই পূজার শুভ সূচনা হয়। এই পবিত্র ময়না কাঠকেই মূলত দেবীর প্রতিমার মেরুদণ্ড বা মূলদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়। শ্রাবণের সেই শুক্লা অষ্টমীতে গুঞ্জবাড়ির ডাঙরাই মন্দিরে ময়না কাঠের পূজার পর সন্ধ্যায় রাজপরিবারের দুয়ারবক্সী অজয় কুমার দে বক্সীর তত্ত্বাবধানে বাদ্যযন্ত্রের সমারোহে মাতৃরূপী ময়না কাঠকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে এবং কাপড় পরিয়ে স্থানীয় মদনমোহন বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটানা প্রায় এক মাস ধরে নিত্যপূজার আচার চলে। এরপর কৃষ্ণ অষ্টমীতে বড় দেবী মন্দিরে গৃহ পূজা সম্পন্ন হয় এবং রাধা অষ্টমীর ভোরে মাতৃরূপী ময়না কাঠকে বড়দেবীবাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়।
বড় দেবীর এই মৃন্ময়ী প্রতিমার রূপ দেবী দুর্গার অন্যান্য প্রতিমার তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা। এই প্রতিমার গায়ের রং লাল এবং দেবীর বাহন সিংহ নয়, বরং বাঘ। এছাড়া দেবীর সঙ্গে জয়া ও বিজয়াও উপস্থিত থাকেন। কোচবিহারের মহারাজাদের পাওয়া স্বপ্নাদেশের ওপর ভিত্তি করে দেবী দুর্গার এই বিশেষ ‘বড়দেবী’ রূপ বিগত পাঁচ শতাব্দী ধরে ঐতিহ্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে পুজিত হয়ে আসছে। কোচবিহার জেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী নিম্ন আসাম ও বিভিন্ন এলাকার মানুষের কাছে বড় দেবী পুজোকে ঘিরে গভীর আবেগ ও অনুভূতি জড়িয়ে রয়েছে।

