অভিজিৎ ঘোষ, আলিপুরদুয়ার: বক্সার জঙ্গলে এনক্লোজারের ভেতরে দৌড়াচ্ছে হরিণ আর পেছনে ধাওয়া করছে বাঘিনী। বন দপ্তরের প্রকাশ করা এমন ভিডিও এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল (Buxa Tigress Video Controversy)। শুক্রবার এনক্লোজারের দরজা খুলে দেওয়ার পর ওই ভিডিও প্রকাশ করা হয়। জেলা, রাজ্যের গণ্ডি পেরিয়ে গোটা দেশ ওই ভিডিও দেখেছে। সেই ভিডিও নিয়েই তৈরি হয়েছে বিতর্ক। কেননা, বন দপ্তরের প্রকাশ করা ওই ভিডিও এডিটেড বলেই মনে করা হচ্ছে।
ভিডিওটি খুব ভালো করে দেখলে নজরে আসবে দুটো আলাদা ফ্রেমের ও সময়ের ভিডিও একসঙ্গে জোড়া হয়েছে। ভিডিওগ্রাফির ভাষায় যাকে বলে ‘কাট শট’। এনক্লোজারের ভেতরে লাগানো সিসি ক্যামেরায় একটি হরিণের দৌড়ে যাওয়ার ভিডিও এবং ওই জায়গায় বাঘিনীর হেঁটে যাওয়ার ভিডিও একসঙ্গে করা হয়েছে বলেই চর্চা। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে বাঘ হরিণের পেছনে আসছে ঠিকই, তবে দুটো প্রাণী এক ফ্রেমে নেই। আর বাঘ হঠাৎ করে ফ্রেমে চলে আসছে। দেখলে বোঝা যায়, দুটো কাট শট একসঙ্গে জোড়া হয়েছে।
বন দপ্তর কি এডিট করা ভিডিও প্রকাশ করেছে? এদিন বিষয়টি জানতে বক্সা ব্যাঘ্র-প্রকল্পের এফডি কুমার বিমলকে কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। উত্তর পাওয়া যায়নি অন্য বনকর্তাদের কাছ থেকেও। তবে এক আধিকারিক জানান, বিভিন্ন সময়ের ভিডিও রেকর্ডিং হচ্ছে। সেগুলো একসঙ্গে করেই ভিডিও শেয়ার করা হচ্ছে। সব ভিডিও দেওয়া সম্ভব নয় দীর্ঘ সময়ের জন্য। তবে আরেকটি মহল মনে করছে, বন দপ্তর বিহারের বাঘিনীকে স্বাভাবিক দেখানোর জন্যই ওই পন্থা অবলম্বন করতে পারে।
বাঘিনী কি স্বাভাবিক ছন্দে ফিরেছে? বন দপ্তর সূত্রে খবর, বাঘিনী এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি। পশু চিকিৎসকরা নজরে নজরে রাখছেন তাকে। কিছুটা ট্রমার মধ্যে রয়েছে সে। শুক্রবার এনক্লোজারের দরজা খুলে দিয়ে পুরো বক্সা জঙ্গল উন্মুক্ত করা হলেও বাঘিনীর কাছে এখনও প্রিয় জায়গা ওই এনক্লোজার। এদিনও সে সেখানেই ছিল। এখনও খোলা জঙ্গলের স্বাদ নেয়নি বাঘিনী। তবে তার নতুন পরিচয় হয়েছে। এতদিন সে বাল্মীকি বাঘিনী টি ১৩৮ নামে পরিচিত ছিল। বক্সায় তার নতুন আইডি নম্বর বিটিআর টিএফ-১।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, গত পাঁচদিন ওই বাঘিনীর ওপর অনেকটা ধকল গিয়েছে। বিহার থেকে আলিপুরদুয়ার পর্যন্ত যাত্রাপথ, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দু’বার ঘুমপাড়ানি গুলির প্রভাব যেমন রয়েছে তেমনই অপরিচিত জঙ্গল চিনতেও সমস্যা হচ্ছে। জঙ্গলের ভেতরে বাঘ বা বাঘিনীরা নিজেদের চিহ্ন দিয়ে রাখে। সেই গন্ধের মাধ্যমে নিজেদের জায়গা দখল করে থাকে। নতুন জায়গায় খাবার বা জলের সন্ধান করে জায়গা চিহ্নিত করার কাজ বাকি বাঘিনীর। বক্সার এক বনকর্তা বলেন, ‘আমরা বাঘিনীকে কোনও কিছুর জন্য চাপ দেব না। মানুষের যেমন কোনও নতুন জায়গায় গেলে ওই জায়গা চিনতে সময় লাগে, ওদের ক্ষেত্রেও তাই। নিজের মতো করে ও জায়গা চিনে নেবে এবং একটি নির্দিষ্ট জায়গায় থাকবে।’
বুধবার এনক্লোজারে ছাড়ার পর শনিবার পর্যন্ত সে এনক্লোজারের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরছে। কখনও ইচ্ছে হলে কৃত্রিম জলাশয়ে গিয়ে শুয়ে থাকছে। কখনও আবার জল খাচ্ছে। আবার এনক্লোজারের ভেতরে যে ঘাসবাগান রয়েছে সেখানে গিয়েও বিশ্রাম নিচ্ছে। আবার কখনও জলকাদায় গিয়ে শুয়ে থাকছে।
বাঘিনী শিকার শুরু করেনি। বন দপ্তর থেকে পাঁঠার মাংস দেওয়া হচ্ছে খাওয়ার জন্য। বনকর্তারা জানাচ্ছেন, এমন খাবারে বাঘিনীর স্বাচ্ছন্দ্য কম। এখন কবে ওই বাঘিনী শিকার শুরু করে, সেটাই দেখার।
রাজ্যের প্রাক্তন বনকর্তা বিমল দেবনাথের কথায়, ‘বাঘ বা বাঘিনী একবার খেলে কয়েকদিন না খেয়ে থাকে। ওরা অনেক শক্তিশালী হয়। তবে শক্তি সবসময় খরচ করে না। ওই বাঘিনীও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে শিকার শুরু করবে।’

