শুভঙ্কর চক্রবর্তী
স্বর্ণ কারিগর স্বপন কামিল্যা খুনের মামলার তদন্তকারী আধিকারিকের নাকের ডগায় নিউটাউনের বাড়িতে বহালতবিয়তে থাকলেও প্রশান্ত বর্মনকে (Prasanta Barman) গ্রেপ্তার করেনি পুলিশ। সব জেনেও ‘ফেরার’ দেখিয়েই দায় সেরেছিলেন তাঁরা। ‘পলাতক’ প্রশান্তকে আটক করে পুলিশের দায়িত্ব পালন করেন এক সাধারণ নাগরিক। তারপরও রাজগঞ্জের অপসারিত বিডিওর বিরুদ্ধে আইন মেনে পদক্ষেপ হল না। পুলিশের ভূমিকায় হতভম্ভ গোটা রাজ্য। আর এক্ষেত্রে আইনজীবীদের বক্তব্য খুব স্পষ্ট। তাঁদের মতে, রীতিমতো ছক কষে এবং সুপরিকল্পিতভাবেই খুনের প্রধান আসামি প্রশান্তকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে পুলিশ। কোটি কোটি টাকায় সেটিং করে প্রশান্তকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে পুলিশ- মঙ্গলবার প্রশান্তর জামিনের পর তেমন অভিযোগই তুলেছিলেন স্বপন খুনের মামলাকারী দেবাশিস কামিল্যা। এদিন তিনি বলেন, ‘পুলিশের সঙ্গে সঙ্গে অনেক নেতা, আমলা, আইনজীবীও প্রশান্তর কাছে বিক্রি হয়ে গিয়েছেন।’
প্রশান্তর বিরুদ্ধে আগেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ছিল। সোমবার রাতে তাঁকে মদ্যপ অবস্থায় বেপরোয়া গাড়ি চালানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। সেই মামলায় তিনি জামিনও পেয়ে যান। কেন পুরোনো মামলায় প্রশান্তকে গ্রেপ্তার করা হল না সেই প্রশ্ন উঠছে সর্বত্র। কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যর বক্তব্য, ‘সরকারের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু পুলিশের হয়নি। পুলিশ শুধু জামা বদলেছে। আইনে যাবতীয় সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমার ধারণা, ইচ্ছে করেই পুলিশ খুনের মামলায় প্রশান্তকে গ্রেপ্তার করেনি। যা হচ্ছে তা সংগঠিত অপরাধ।’
আইনের ভাষায় বিষয়টি সহজভাবে বোঝা জরুরি। কোনও মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকা বা পলাতক কোনও আসামিকে অন্য কোনও মামলায় গ্রেপ্তার করার পর কী করা উচিত পুলিশের? কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী নারায়ণ দেবনাথের কথায়, ‘পুলিশের উচিত ছিল খুনের মামলায় প্রশান্তকে শোন অ্যারেস্ট করে হেপাজতে নেওয়া। কিন্তু পুলিশ ইচ্ছে করেই সেটা করেনি তা স্পষ্ট।’ কী এই শোন অ্যারেস্ট? এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলে তাকে একটি মামলায় গ্রেপ্তার করে আদালতে তোলার পর অন্য মামলাতেও গ্রেপ্তার করা।
প্রশান্তর জামিন নিয়ে হাজারো সমালোচনা হলেও এখন পর্যন্ত সরকার বা পুলিশের পক্ষ থেকে সেবিষয়ে কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। সরকারিভাবে পুলিশের কোনও আধিকারিক বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে চাইছেন না৷ তবে তাঁদের একটি অংশ বলছে, চলতি বছর জানুয়ারিতেই আদালতে স্বপন হত্যাকাণ্ডের চার্জশিট জমা দিয়েছে পুলিশ। তাতে যে কয়েকজনের নাম আছে তাঁদের প্রত্যেকেই বর্তমানে বিচার বিভাগীয় হেপাজতে আছেন। চার্জশিটে প্রশান্তকে ‘পলাতক’ হিসাবেই দেখানো হয়েছে। নারায়ণ বলেন, ‘একটি চার্জশিটের বেশ কয়েকটি অংশ থাকে। তার একটি অংশে প্রশান্তর নাম আছে৷ অন্য অংশে হেপাজতে থাকা আসামিদের নাম আছে। হেপাজতে থাকা আসামিদের নামের সঙ্গে প্রশান্তর নাম না থাকা মানেই এই নয় যে, চার্জশিটে তাঁর নাম নেই। পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ পরবর্তীতে সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিটও দিতে পারে। তাতে কোনও আইনি বাধা নেই। চার্জশিটের নাম নিয়ে আইনের অতিসরলীকরণ করে ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে।’
২০২৫-এর ৩১ অক্টোবর দেবাশিস বিধাননগর দক্ষিণ থানায় স্বপনকে অপহরণ করে খুনের যে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন তাতে একমাত্র নাম ছিল প্রশান্ত বর্মনের। কিন্তু অভিযোগ দায়ের হওয়ার সাত মাস পরেও প্রশান্তকে একদিনের জন্যও জিজ্ঞাসাবাদ করেননি তদন্তকারীরা। বাড়ি, কর্মস্থল বা থানায় ডেকে এনে- কোনওভাবেই প্রশান্তকে জেরা করা হয়নি৷ আইনজীবীরা বলছেন, কোনও অবস্থাতেই প্রধান অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ না করে তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করা যায় না। নারায়ণের কথা, ‘তদন্তকারীরা অন্তর্যামী নন যে, চোখ বন্ধ করলেই কী ঘটেছিল তা জেনে যাবেন এবং চার্জশিটে তা লিখবেন। জিজ্ঞাসাবাদ এবং তথ্য যাচাইয়ের মধ্য দিয়েই তাঁকে এগিয়ে যেতে হবে।’ সেক্ষেত্রে যে চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে তার সত্যতা নিয়েই উঠেছে বড়সড়ো প্রশ্ন৷ কলকাতা হাইকোর্টের জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চের আইনজীবী সন্দীপ মণ্ডলের বক্তব্য, ‘খুনের মামলার ছত্রে ছত্রে পুলিশের গাফিলতি স্পষ্ট। যেভাবে আইনি পদ্ধতি উপেক্ষা করে চার্জশিট তৈরি করা হয়েছে তাতে ওই চার্জশিটকে কেউ মনগড়া বললেও ভুল কিছু বলা হবে না। বোঝাই যাচ্ছে প্রশান্তকে আড়াল করার জন্যই চার্জশিট তৈরি করা হয়েছে।’
আবার প্রশান্ত যেহেতু ডব্লিউবিসিএস আধিকারিক তাই এই আইনি প্রক্রিয়ায় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে প্রশাসনিক দিকটিও। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়া আসামির বিরুদ্ধে পদ্ধতি মেনে প্রশাসনিক কোনও পদক্ষেপই আজ পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। বর্তমানে প্রশান্তর কর্মস্থল কোথায়? তিনি কি এখনও কর্মস্থলে যাচ্ছেন? তিনি কি বেতন পাচ্ছেন? বর্তমানে তাঁর চাকরির স্ট্যাটাস কী? এইসব কোনও প্রশ্নেরই উত্তর মিলছে না৷ প্রশাসনিক আধিকারিকরা এবিষয়ে কুলুপ এঁটেছেন। আবার একজন সরকারি আমলা দিনের পর দিন কর্মস্থলে না এলে তাঁর উচ্চপদস্থ কর্তাদের উচিত তাঁর নামে থানায় মিসিং ডায়েরি বা অভিযোগ দায়ের করা এবং বিভাগীয় তদন্ত করা। সেসব কিছুই হয়নি। কেন হয়নি কেউ জানেন না। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পর পলাতক আসামির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং তিনি যাতে পালিয়ে যেতে না পারেন তার জন্য তাঁর নামে লুক আউট নোটিশ জারি করাটাও আইনি পদ্ধতির মধ্যেই পড়ে৷ সেসবের ধার দিয়েও হাঁটেনি পুলিশ৷ অর্থাৎ যতভাবে সম্ভব আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রশান্তকে বাঁচিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সন্দীপ বলেন, ‘তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া যায় তৃণমূল আমলে প্রশান্তকে বাঁচানোর চেষ্টা হয়েছে। তাই চার্জশিটে প্রশান্তর নাম নেই। তবুও পদক্ষেপ করতে পারত পুলিশ। আরও তদন্ত জরুরি বলে আদালতে কেস ডায়েরি (সিডি) জমা দিয়ে প্রশান্তকে হেপাজতে নিতে পারত, সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট দিতে পারত। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের যে সেটাও করা হয়নি। তাই চার্জশিটে নাম নেই বলে পুলিশ কিছু করতে পারেনি বলে যাঁরা বাজার গরম করতে চাইছেন তাঁরা আইন না বুঝেই মনগড়া কথা বলছেন।’
আর এই যাবতীয় কুকীর্তির জন্য স্বপন হত্যাকাণ্ডের তদন্তকারী আধিকারিক, মামলার তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক সহ বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের কর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করে কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপের দাবি তুলেছেন সন্দীপ। মামলার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত সব ধরনের আধিকারিকের বিরুদ্ধে তদন্ত দাবি করেছেন নারায়ণ এবং বিকাশও। দেবাশিসের কথা, ‘আমি চাই যারা যারা টাকা খেয়ে প্রশান্তকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে, প্রত্যেকের কঠোর শাস্তি হোক।’
