প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান: তৃণমূল (TMC) পার্টি অফিস বা প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়কের কার্যালয় থেকে সরকারী ত্রাণ সামগ্রী উদ্ধার হওয়া নিয়ে এখন সরগরম গোটা রাজ্য। সেই আবহে বৃহস্পতিবার এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটল পূর্ব বর্ধমানের (Bardhaman) জামালপুরে। পুলিশ ও প্রশাসনের যৌথ তল্লাশিতে এখানকার তৃণমূলের ব্লক সভাপতি মেহেমুদ খাঁনের নিজস্ব খাঁন বস্ত্রালয় থেকে পাওয়া গেল না একখানাও বস্ত্র। পরিবর্তে ওই খাঁন বস্ত্রালয় থেকে মিলল সরকারী ত্রাণের হাজার দেড়েক ত্রিপল। একই দিনে জেলার পূর্বস্থলী দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের প্রাক্তন বিধায়ক তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী স্বপন দেবনাথের পার্টি অফিস থেকেও প্রচুর সরকারী ত্রাণ সামগ্রী উদ্ধার করেছে প্রশাসন। এহেন ঘটনা সামনে আসতেই সুর চড়িয়েছে বিজেপি নেতৃত্ব।
জামালপুর (Jamalpur) বিডিও অফিসের অদূরে পুলমাথা এলাকায় রয়েছে তৃণমূল নেতা মেহেমুদ খাঁনের দলীয় কার্যালয়। ওই কার্যালয়ের সামনেই রয়েছে খাঁন বস্ত্রালয়।বাম আমলে এই খাঁন বস্ত্রালয়টি ছিল মেহেমুদ খাঁনের রোজগারের একমাত্র অবলম্বন। সূত্রের খবর, ২০১১ সালে রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পর মেহেমুদ খাঁন তার এই দোকানে তালা মেরে দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। সেই থেকে নাকি তাকে খাঁন বস্ত্রালয়ের ঝাঁপ খুলতে কেউ দেখেনি। এলাকার মানুষের দাবি, বস্ত্র ব্যবসা লাটে তুলে দিয়ে রাজনীতি করে ‘ধনকুবের’ হওয়ার লক্ষ্যে মেহেমুদ খাঁন পূরণ করে ফেলেছেন। তবে ২০২৬ বিধানসভা ভোটে রাজ্যের অন্যান্য অনেক বিধানসভার মতো জামালপুর বিধানসভা আসনেও তৃণমূলের পরাজয় ঘটে। তারপর থেকেই মেহেমুদ খাঁন গা ঢাকা দিয়ে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে নানা অপকর্মের একাধিক অভিযোগ ইতিমধ্যে জামালপুর থানায় জমা পড়েছে। পুলিশ এখন হন্যে হয়ে তার খোঁজ চালাচ্ছে।
এমন পতিস্থিতিতে এদিন কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে বিশাল পুলিশ বাহিনী মেহেমুদ খাঁনের পার্টি অফিস ও বস্ত্রালয়ের সামনে পৌঁছায়। এর খানিক পরেই জামালপুর ব্লকের বিডিও এবং এলাকার বিজেপি বিধায়ক অরুণ হালদার সেখানে উপস্থিত হন। পুলিশ ও প্রশাসন যৌথভাবে মেহেমুদ খাঁনের পার্টি অফিস এবং খাঁন বস্ত্রালয়ের তালা খুলিয়ে তল্লাশি চালায়। তখনই চোখ কপাল ওঠে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্তাদের। এই অভিযানের দরুন দেখা যায়, খাঁন বস্ত্রালয়ে একটাও বস্ত্র নেই। গোটা বস্ত্রালয়ে শুধু থরে থরে সাজানো রয়েছে সরকারী ত্রাণের ত্রিপল। সেগুলি সব উদ্ধার করার পর পুলিশ ও প্রশাসনের লোকজন মেহেমুদ খানের পার্টি অফিসে চিরুনি তল্লাশি শুরু করেন।
সেই তল্লাশিতে পার্টি অফিস থেকে একাধিক বাণ্ডিলে বাঁধা ত্রাণের কম্বল সহ বিছানার চাদর উদ্ধার হয়। উদ্ধার হওয়া এই সব সামগ্রী রাজেয়াপ্ত করেছে প্রশাসন। পুলিশ ও প্রশাসনের এই তল্লাশি অভিযান দেখতে এদিন মেহেমুদ খাঁনের পার্টি অফিসের সামনের রাস্তায় মানুষের ভিড় উপচে পড়েছিল।
এদিকে সরকারী ত্রাণ সামগ্রী এই ভাবে তৃণমূলের পার্টি অফিস ও তৃণমূল নেতার বস্ত্র প্রতিষ্ঠানে মজুত করে রাখা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন বিজেপি বিধায়ক অরুণ হালদার। তিনি বলেন, “সরকারী ত্রাণ গরিব মানুষজনকে দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি। গরিব মানুষকে বঞ্চিত করে সেগুলি তৃণমূল পার্টি অফিস ও তৃণমূল নেতার বস্ত্র প্রতিষ্ঠানে এতদিন লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। এমন কাণ্ড ঘটিয়ে ধরা পড়লে পূর্বস্থলী উত্তরের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক তপন চট্টোপাধ্যায়ের মতো পরিণতি যে হতে পারে সেটা বুঝতে পারেন জামালপুরের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক অলক মাঝি। তাই কয়েক দিন আগে তিনি জেলাশাসককে চিঠি লিখে ত্রাণ বিলি বন্টন করতে না পারার কথা জানান। সেইসব ত্রাণ সামগ্রী এদিন উদ্ধার করা হল।” তৃণমূল রাজত্বে হওয়া যাবতীয় অপকীর্তির মধ্যে এটাও একটা অপকীর্তি বলে দাবি করেছেন অরুণ হালদার।
এই প্রসঙ্গে মেহেমুদ খাঁনের সঙ্গে যোগাযোগের বহু চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। তবে জামালপুরের প্রাক্তন বিধায়ক অলোক কুমার মাঝির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি আগেই জেলাশাসক, মহকুমাশাসক এবং বিডিওকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলাম,বিলি বন্টন না হওয়া ত্রাণ সামগ্রি মজুত করে রাখা রয়েছে। সেই সামগ্রী প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার আবেদনও করেছিলাম। আজ প্রশাসন সেই বিষয়ে পদক্ষেপ করেছে।”
জামালপুরের মতোই এদিন হেমাতপুরে থাকা পূর্বস্থলী দক্ষিণ বিধানসভার প্রাক্তন বিধায়ক তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী স্বপন দেবনাথের তৃণমূল পার্টি অফিসে পুলিশ ও প্রশাসনের তরফে তল্লাশি চলে। তল্লাশিতে এই পার্টি অফিস থেকেও বিপুল পরিমাণ সরকারী ত্রান সামগ্রী উদ্ধার হয়। জানা গিয়েছে, বন্টন করতে না পারা ত্রাণ সামগ্রী উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্বপন দেবনাথও পূর্বস্থলী ১ নম্বর ব্লকের বিডিওর কাছে আবেদন জানিয়ে রেখেছিলেন। যদিও পূর্বস্থলী দক্ষিণের বর্তমান বিজেপি বিধায়ক প্রাণকৃষ্ণ তপাদার এদিন তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “প্রাক্তন মন্ত্রীকে বাঁচাতে আমাকে অন্ধকারে রেখে নাদনঘাট থানার আইসি ওই ত্রাণ সামগ্রী উদ্ধার করেছে।” ঘটনার দরুন তিনি আইসি-র গ্রেপ্তারির দাবিও তুলেছেন।
