সুবীর মহন্ত, বালুরঘাট: এ যেন এক অভিনব রং বদল। এতদিন অভিযোগ ছিল, তৃণমূলের ছত্রছায়ায় থেকে নিজেদের রাজত্ব রমরমিয়ে চালাচ্ছে বালি মাফিয়ারা। এমনকি নির্বাচনকালেও টোটো, ট্র্যাক্টর-ট্রলি তৃণমূলের পতাকা লাগিয়েই দেদার পাচার চলেছে। এর মাঝেই ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে রাজ্যে। নতুন শাসকদল বিজেপি পাচারে প্রশ্রয় দেবে কি না, তাই এখন পাচারকারীদের কাছে লাখ টাকার প্রশ্ন। দোলাচলে পড়ে তাই ধীরে চলো নীতিই সম্বল। অবৈধভাবে বালি তোলা ও পাচারের ব্যবসা কিন্তু বন্ধ হল না। বরং সরকার বদল হতেই রং বদলে গেল পাচারকারীদের গাড়িতে। সরাসরি বিজেপির পতাকা না লাগিয়ে, বরং গেরুয়া ধ্বজা ব্যবহার করা শুরু হয়েছে। কোথাও আবার পতাকায় আঁকা থাকছে পদ্মফুল, এমন অভিযোগও করছেন স্থানীয়রা।
এর মাধ্যমে কি গেরুয়া শিবিরের কাছাকাছি থাকার বার্তা দিচ্ছে বালি পাচারকারীরা? প্রশ্ন উঠছে। আবার বালুরঘাটের (Balurghat) আত্রেয়ী নদীর সমস্ত ঘাটেই পুলিশের পক্ষ থেকে সিভিক মোতায়েন করা হয়েছে। তবুও গেরুয়া ধ্বজা লাগানো ট্র্যাক্টর-ট্রলিগুলির মাধ্যমে দেদার বালি তোলা হচ্ছে। পুলিশের নজরদারি থাকার পরেও গত দুইদিনে অন্তত তিনটি গেরুয়া ধ্বজাযুক্ত ট্র্যাক্টর-ট্রলি আটক করেছে বালুরঘাট ব্লক ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর-এর দল।
এনিয়ে বালুরঘাট ব্লকের বিএলএলআরও রণেন্দ্রনাথ মণ্ডল বলেন, ‘বাইক নিয়ে অভিযান চালিয়ে আমরা ট্র্যাক্টর-ট্রলিগুলিকে আটক করেছি। নিয়মিত আমাদের অভিযান চলছে।’ দিনেরবেলা বালি তোলা বন্ধ থাকলেও, গভীর রাতে নদীর পাড়ে বেশ সক্রিয় মাফিয়ারা। তবে গত ৪ মে ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই অবৈধ কারবারিরা কিছুটা চাপে পড়েছিল। বালুরঘাট ব্লকজুড়ে দুই-তিনদিন পাচার বন্ধ রাখা হয়। পরে ফের তা চালু হয়ে যায়। যদিও এক্ষেত্রে গেরুয়া শিবিরের কোনও নেতার কোনও প্রত্যক্ষ মদতের অভিযোগ সামনে আসেনি। কিন্তু এলাকাবাসীদের অভিযোগ, পাচারকারীরা গেরুয়া ও বিজেপির পতাকা দুই-ই ব্যবহার করে ব্লকের পতিরাম, ডাঙ্গা, ভাটপাড়া, বোয়ালদার, চকভৃগু, জলঘর ও বালুরঘাট শহরে আত্রেয়ীর দু’পাড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
বোয়ালদার এলাকার এক বধূ অনীতা সরকার বলেন, ‘আমাদের স্থানীয়দের বালি মাফিয়াদের বিরুদ্ধে লড়ার চেয়ে প্রশাসন ও তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধেই বেশি লড়তে হয়েছে। প্রচুর টাকার লোভে ওঁরা এলাকার রাস্তাগুলি নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। সেখান দিয়ে চলাচল করা যায় না। নদীর বাঁধ কেটে ফেলেছে বিভিন্ন এলাকায়। এখন সরকার বদলের পর, গেরুয়া পতাকা লাগিয়েই চলছে বালি তোলা। সিভিক, পুলিশদের সামনে দিয়েই তো ওই ট্র্যাক্টরগুলি চলাচল করছে।’ এদিকে, বালি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, ‘একসময় নদীর ঘাটগুলিকে লিজ দেওয়া হত। বহু বছর আগে লিজ ফুরিয়ে গেলেও আর নতুন করে লিজ দেওয়া হয়নি। এর ফলে বালুরঘাটের প্রায় সবক’টি ঘাট থেকেই অবৈধভাবেই বালি তোলার কাজ চলছে। তবে আমরা চাই দ্রুত সরকার ঘাটগুলিকে লিজ দেওয়ার ব্যবস্থা করুক। তাহলে সরকারি রাজস্ব দিয়ে আমরা ব্যবসা করতে পারব।’
অন্যদিকে, পাচারকারীদের পতাকা বদল নিয়ে তৃণমূলের এক পঞ্চায়েত সদস্য বলেন, ‘বালির অবৈধ কারবারিরা আদতে কোনও দলের নয়, তা প্রমাণিত। এতদিন ওরা তৃণমূলে ছত্রছায়ায় থাকার চেষ্টা করলেও এখন গেরুয়া পতাকা লাগিয়ে বিজেপির কাছাকাছি আসতে চাইছে।’ এর পালটা বিজেপির জেলা সাধারণ সম্পাদক বাপি সরকারের বক্তব্য, ‘সমস্ত ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা আনতে চাই আমরা। যারা গেরুয়া পতাকা লাগিয়ে বালি তুলছে, তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা প্রশাসনের কাছে আবেদন জানাচ্ছি।’
