সৌরভ রায় ও নীতেশ বর্মন, ফাঁসিদেওয়া ও শিলিগুড়ি: মন্ত্রীসভার প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার জন্য জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরুর অনুমোদন দিয়েছেন। আর তারপরই ফাঁসিদেওয়ার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত (Indo-Bangla Border) লাগোয়া এলাকার বাসিন্দাদের একাংশ অনুপ্রবেশ আর চোরাকারবার বন্ধের আশা দেখছেন। তবে কেউ কেউ উচ্ছেদের আশঙ্কায় ভুগছেন। কারণ সীমান্তে কাঁটাতারের জন্য জমি দিতে হলে সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের সরাতে হবে। ফলে অনেকদিন ধরে পুনর্বাসনের দাবি তুলছিলেন ফাঁসিদেওয়া (Phansidewa fencing replace) সদর বাজার এবং ধনিয়া মোড় এলাকার বাসিন্দাদের অনেকে। এবিষয়ে দার্জিলিংয়ের জেলা শাসক হরিশংকর পানিক্কর বলেছেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনও ভারতীয় বাসিন্দার সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’
ফুলবাড়ি সংলগ্ন লালদাসজোত থেকে হাপতিয়াগছ পর্যন্ত ফাঁসিদেওয়া ব্লকে প্রায় ২১ কিলোমিটার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত রয়েছে। তার প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার কাঁটাতারহীন। এর মধ্যে ধনিয়া মোড় এলাকায় প্রায় আড়াই কিলোমিটার উন্মুক্ত সীমান্তে ২০২৪ সালের অগাস্টে অস্থায়ীভাবে ৫ ফুটের লোহার পিলার দিয়ে সিঙ্গল লেয়ার কাঁটাতার বসানো শুরু হয়। আবার মুড়িখাওয়া এলাকায় দেড় কিলোমিটার জায়গায় কাঁটাতার বসানোর জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। এই এলাকা দিয়েই গোরু পাচারের রমরমা কারবার চলত বলে অভিযোগ। সেই সমস্যা মেটাতেই শুরু হয় কাঁটাতার বসানোর কাজ। বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় এই কাজ শুরু হলেও মাঝে কাজ থমকে যায়। এনিয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর আপত্তি উপেক্ষা করে ধনিয়া মোড়ের একাংশে মহানন্দা নদীর বাঁধ ধরে একস্তরবিশিষ্ট কাঁটাতার দেওয়া শুরু করেছিল বিএসএফ। বিএসএফের এক আধিকারিকের কথায়, ‘জমি নিয়ে জটিলতা থাকায় সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়ার কাজ কিছুটা থমকে ছিল। আগামীদিনে হয়তো সমাধান হবে।’ তবে পুলিশের দাবি, মুড়িখাওয়াতে ১ কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতার নেই। বাকি অংশে কাঁটাতার বসেছে।
সোমবার মন্ত্রীসভার বৈঠক থেকে আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফ (BSF)-এর প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তর করতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ভূমি ও রাজস্ব সচিব এবং মুখ্য সচিবকে। এই খবরে খুশির আবহ ফাঁসিদেওয়া ব্লকের সীমান্ত গ্রামগুলিতে। ফাঁসিদেওয়ার ঠাকুরপাড়ার বাসিন্দা দিব্যেন্দু ভৌমিকের কৃষিজমি রয়েছে ধনিয়া মোড় এলাকায়। তাঁর কথায়, ‘কাঁটাতার না থাকায় বাঁধাকপি, ফুলকপি, করলা, শসা চাষ করতে গিয়ে ওপারের দুষ্কৃতীদের হানাদারিতে অনেকবার ফসল নষ্ট হয়েছে। অস্থায়ী কাঁটাতার বসার পর সমস্যা মিটেছে। স্থায়ীভাবে কাঁটাতার বসলে গ্রামের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হবে।’
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে গোরু পাচার মামলায় ফাঁসিদেওয়া পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য তথা চটহাট অঞ্চল তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি মহম্মদ সামসুল হকের জামাই মহম্মদ তৈয়বকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। ২০২২ সালের ১৪ অক্টোবর ভোরে বিএসএফের গুলিতে ১৯ বছরের মহম্মদ ইমরান নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়। ২০২০ সালের ১৯ নভেম্বর কাঁটাতারের ভিতর থেকে গ্রামের মহম্মদ জমিরুল আক্তারের (৪০) গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ উদ্ধার হয়। ২০১৯ সালের ২৩ অগাস্ট মহম্মদ আখতার নামে আরেক তরুণ সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলিতে জখম হয়েছিলেন। এই গ্রামে গোরু পাচার ঠেকাতে গিয়ে এমন নানা বিক্ষিপ্ত ঘটনা চলতই। গ্রামের কৃষিজমি নষ্ট করে বাংলাদেশে গোরু পাচারের ঘটনাও কৃষকদের চোখের জলের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মুড়িখাওয়ার উন্মুক্ত সীমান্তে কাঁটাতার বসলে, ফাঁসিদেওয়ার মতো গ্রামেও পাচার বন্ধ হবে, এমনটাই মত অনেকের।
চটহাট মুড়িখাওয়ার পশ্চিম বান্দরজুলির বাসিন্দা তথা প্রাক্তন পঞ্চায়েত মহম্মদ সামিরুলেরও জমি রয়েছে সীমান্তে। জমি অধিগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অনেকের জমি ইতিমধ্যেই বিএসএফ নিয়েছে। অনেকের আবার এখনও নেয়নি। আমারও জমি যাবে। তবে কাঁটাতার হলে, মানুষের মৃত্যু আর দেখতে হবে না।’ আরেক বাসিন্দা মহম্মদ খমিজ বললেন, ‘এই কাঁটাতার হলে গ্রামে বাংলাদেশি প্রবেশের ঝুঁকি আর থাকবে না।’
